ফেসবুকে পোস্ট করে এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক মামলায় সাবেক আইন উপদেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ১২ হাজার কোটি টাকার লেনদেন করেছেন। সেই ব্যক্তিকে হাজির করা হয় ট্রাইব্যুনালে এবং বলা হয় ‘১২ হাজার কোটি’ অঙ্কে লিখে দেখাতে। তিনি তা লিখতে ব্যর্থ হন। এরপর তাকে বলা হয় শুধু ১২ হাজার লিখতে। তাতেও তিনি ব্যর্থ হন; লেখেন ১ লাখ ২০ হাজার!
বিজ্ঞাপন
গতকাল ১২ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ এমন ঘটনা ঘটে।
এদিন ট্রাইব্যুনালে আরেকটি ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটান সরকার পক্ষের চিফ প্রসিকিউটর। তিনি আসামির পক্ষে দাঁড়িয়ে যান এবং তাকে ক্ষমা করে দিতে ট্রাইব্যুনালের প্রতি আবেদন জানান!
ফেসবুকে পোস্টকারী ব্যক্তির নাম এমএইচ পাটোয়ারী বাবু। একসময় নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ছিলেন তিনি। এখন যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। পেশায় ঠিকাদার। পরিবার নিয়ে থাকেন রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বরের সেনপাড়া পর্বতায়।
তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে শেখ হাসিনার একটি মামলা ঘিরে ১২ হাজার কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ তোলা হয়। পোস্টটি নজরে এলে আদালত অবমাননার দায়ে তার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল।
বিজ্ঞাপন
পরোয়ানা জারির পর ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর আইটি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহার নেতৃত্বে গত ৭ এপ্রিল রাতে বাবুর বাসায় অভিযান চালানো হয়। তখন বাবুকে পাওয়া যায়নি। তবে তার মোবাইল ফোনটি জব্দ করা হয়। পরদিন বাবুর স্ত্রী ইসমাত জেরিনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তিনি স্বামীকে চারদিনের মধ্যে হাজির করার লিখিত অঙ্গীকার করেন।
কথামতো চারদিন পর গতকাল রোববার স্বামী বাবুকে নিয়ে ট্রাইব্যুনালে আসেন ইসমাত জেরিন। সঙ্গে তাদের দুই মেয়েসহ অন্য স্বজনরা ছিলেন। বাবুর পরনে ছিল সাদা ফতুয়া, জিন্স প্যান্ট আর মুখে মাস্ক।
এদিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর কার্যতালিকায় চারটি মামলা ছিল। দুপুরের আগে তিন বিচারপতির মধ্যে দুজনের বেঞ্চে একটি মামলার বিচারকাজ শেষে বিরতি দেওয়া হয়। এক ঘণ্টার বিরতি শেষে পৌনে ৩টা থেকে পুনরায় বিচারকার্যক্রম শুরু হয়। মিনিট ত্রিশেক যেতেই আদালত অবমাননার এই বিশেষ ঘটনাটির ডাক আসে।
বিজ্ঞাপন
অভিযুক্ত বাবুকে কাঠগড়ায় তোলার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন—বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
কিছুক্ষণের মধ্যে হাজির হন প্রসিকিউটর ও বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা। আসামি বাবু তার হেফাজতে রয়েছেন বলে ট্রাইব্যুনালকে জানান তিনি। চিফ প্রসিকিউটর আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও জানান তিনি। এরপর আসামিকে এনে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় তুলতে পুলিশকে নির্দেশ দেন আদালত। মিনিট দুয়েকের মধ্যেই বাবুর সঙ্গে একে একে এজলাসে ঢোকেন স্ত্রী ইসমাত জেরিন, তার পক্ষের আইনজীবীসহ অন্যরা।
বাবুকে রাখা হয় ট্রাইব্যুনালের কাঁচঘেরা কাঠগড়ায়। আর ইসমাত জেরিনকে সাক্ষীর ডায়াসে ওঠার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যেই ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া বাবুর পোস্টের কিছু অংশ পড়ে শোনান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। এরপর শুরু হয় বাবুর স্ত্রীর জবানবন্দি। চারদিন আগে দেওয়া লিখিত অঙ্গীকারনামা বা বক্তব্যটিই জবানবন্দি হিসেবে উপস্থাপন করেন তিনি।
ইসমাত জেরিন বলেন, নিজের মোবাইল থেকে কয়েক দিন আগে ‘দেশ ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর নিকট থেকে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা পেয়েছে’ মর্মে বিচারপতিসহ অন্যান্যদের জড়িয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন আমার স্বামী পাটোয়ারী বাবু। পোস্টটি পুরোপুরি মিথ্যা। আমি এ নিয়ে প্রতিবাদের পাশাপাশি পোস্টটি প্রত্যাহার করে ক্ষমা চাওয়ার জন্য বলেছি। কিন্তু সে প্রত্যাহার না করলে তার মোবাইলটি লুকিয়ে নিজের কাছে রাখি। ৭ এপ্রিল ওই মোবাইলটি উদ্ধার করা হয়। তবে আমার স্বামী আরও একটি মোবাইল ব্যবহার করেন।
তিনি বলেন, চারদিনের মধ্যে আমার স্বামীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার অঙ্গীকার করেছিলাম। সেই হিসেবে তাকে আজ আনা হয়েছে। এছাড়া মিথ্যা পোস্টের ব্যাপারে জানা সত্ত্বেও মোবাইলটি নিজ হেফাজতে রেখে অপরাধ করেছি। আমি নিঃশর্ত ক্ষমা চাই। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ করব না। আমার স্বামীও যেন এমন কোনো কাজ না করে সেজন্য সতর্ক করব। আমি ক্ষমাপ্রার্থী।
স্ত্রীর জবানবন্দি শেষ হওয়ার পর একই ডায়াসে ওঠেন অভিযুক্ত সাবেক ছাত্রলীগ নেতা পাটোয়ারী বাবু। জবানবন্দির শুরুতে নিজের পরিচয় দেন তিনি। এরপর নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া পোস্টটির কথা স্বীকার করেন এবং সেটি পড়ে শোনান।
ফেসবুক পোস্টটিতে লেখা ছিল- ‘দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে সাজানো মামলায় মৃত্যুদণ্ড দিতে বিভিন্ন দেশ ও গোষ্ঠীর নিকট থেকে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা খেয়েছে আসিফ নজরুল, শিশির মনির, তাজুল ইসলাম, বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব করে কম্পিউটারের হার্ডড্রাইভ পরিবর্তন করে ইতোমধ্যে অবৈধ ক্যাঙ্গারু কোর্টের অবৈধ প্রসিকিউটর তাজুল পালিয়েছে! যেকোনো সময় অন্যরাও পালিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।’
আরও লেখ ছিল- ‘ভদ্রবেশী উচ্চশিক্ষিত এই সকল ধুরন্ধর জালিয়াতচক্র যদি বিনা বিচারে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, তার দায়-দায়িত্ব সম্পূর্ণ বর্তমান সরকারকে নিতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী কেউ আইন ও বিচারের ঊর্ধ্বে নয়। গত ২০ মাস অবৈধ সরকারের অবৈধ আইন উপদেষ্টা মিথ্যাবাদী আসিফ নজরুল, আইনজীবী শিশির মনির, প্রতারক অবৈধ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ও বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার, এরা বাংলাদেশের বিচার-আইন-আদালত নিয়ে যে তামাশা করেছে অবশ্যই তারা শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।’
পোস্টটি হুবহু পড়া শেষে প্রসিকিউশনের দাখিলকৃত স্ক্রিনশটটিও নিজের অ্যাকাউন্টের বলে শনাক্ত করেন পাটোয়ারী বাবু। পোস্টে অনেক লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার হওয়ায় মোবাইলটি তার স্ত্রী সরিয়ে নিয়েছিলেন বলে স্বীকার করেন তিনি।
এ সময় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আপনি মারাত্মক অপরাধ করেছেন।’
ট্রাইব্যুনালকে কালিমাযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেন আরেক বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ।
জবাবে মিথ্যা পোস্টের মাধ্যমে গুরুতর অপরাধ করেছেন বলে স্বীকার করেন পাটোয়ারী বাবু।
এ সময় আসামিকে ‘১২ হাজার কোটি টাকা’ অঙ্কে লিখতে কাগজ-কলম দেওয়ার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। নির্দেশ শুনে তিনি থতমত খেয়ে যান। ট্রাইব্যুনাল এ পর্যায়ে তার পড়াশোনা সম্পর্কে জানতে চান।
জবাবে তিনি জানান, ঢাকা কলেজর সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স সম্পন্ন করেছেন। আদালত তাকে আবার ১২ হাজার কোটি লিখতে বলেন। তিনি তা কথায় লিখে দেন। এরপর শুধু ‘১২ হাজার’ লিখতে বলেন আদালত। তিনি ১২ হাজার লিখতে গিয়ে ১ লাখ ২০ হাজার লেখেন! অর্থাৎ তিনটি শূন্যের জায়গায় চারটি শূন্য দিয়ে দেন।
এ পর্যায়ে আসামিকে জিজ্ঞেস করা হয়, এই অপরাধের শাস্তি যে কঠিন তা তিনি জানতেন কি না।
পাটোয়ারী বাবু জানান, তিনি তা জানতেন না এবং এজন্য তিনি ক্ষমাপ্রার্থী।
এ সময় আসামির হয়ে কিছু বলতে চান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তবে আইনের বিধান অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল তখন বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার বক্তব্য শোনেন।
জোহা জানান, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীরা ‘সাইবার স্কোয়াড’ নামে ফেসবুকে একটি গোপন গ্রুপ চালান। পাটোয়ারী বাবু সেই গ্রুপের একজন সক্রিয় সদস্য। গ্রুপটি ৬৪ জেলায় সক্রিয় আছে। এই গ্রুপের মূল কাজই হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার চালানো।
এরপর আবার আসামিকে ডায়াসে তোলা হয়। এ সময় তিনি দাবি করেন, অন্য একটি অ্যাকাউন্ট থেকে লেখাটি কপি করে নিজের ফেসবুকে দিয়েছিলেন। এজন্য তিনি ক্ষমা চান এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ না করার অঙ্গীকার করেন।
তবে তথ্য যাচাই করলে বেরিয়ে আসে, আসামির পোস্টটি দেওয়া হয়েছিল ৪ এপ্রিল, আর অন্য অ্যাকাউন্টে দেওয়া হয় ৫ এপ্রিল। অর্থাৎ লেখাটি তিনি অন্য কোথাও থেকে সংগ্রহ করেননি।
এ সময় চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আমাদের ট্রাইব্যুনাল নিয়ে অনেকেই বিভিন্ন ধরনের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তা সত্ত্বেও মানবিক দিক বিবেচনা করে আমরা এই আসামির জন্য নিঃশর্ত ক্ষমার আবেদন জানাচ্ছি।’
আসামিপক্ষেও একই প্রার্থনা করেন আইনজীবী এমএ নোমান। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীর চেয়েও বাবু পাটোয়ারীকে বেশি সহায়তা করতে দেখা যায় চিফ প্রসিকিউটরকে। জবানবন্দির সময় ফেসবুক পোস্টটি দেখে দেখে পড়ার সময় তিনি নিজের আসন থেকে ডায়াসের সামনে দাঁড়িয়ে সহায়তা করেন। একপর্যায়ে আসামিপক্ষের আইনজীবীকে এ কাজটি করার পরামর্শ দেন আদালত।
উভয়পক্ষের শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করেন। শুরুতে ট্রাইব্যুনাল বলেন, আসামি শুধু একজন সচেতন নাগরিকই নন, তিনি একজন রাজনৈতিক নেতাও। তার অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় আমরা প্রথমে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তবে প্রসিকিউশনসহ সবাই তার নিঃশর্ত মুক্তি চাইছেন, তাই সাজা কিছুটা কমানো হলো।
আদালত আরও বলেন, ‘তার অপরাধ অত্যন্ত গুরুতর। এ ধরনের অপরাধের সাজা না দিলে সমাজে ভুল বার্তা যাবে। আমরা চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি যে, আমরা সম্পূর্ণ স্বচ্ছ আছি। আমাদের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে দেশি-বিদেশি কেউই প্রশ্ন তুলতে পারবেন না। যেহেতু এই পোস্টটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, তাই তার ন্যূনতম হলেও সাজা হওয়া উচিত, যেন অন্যরা সতর্ক হন। আমরা তাকে তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দিলাম।’
এই পর্যায়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর মিজানুল এগিয়ে যান এবং সাজা কমিয়ে এক মাসে আনার অনুরোধ করেন। পরে আরও এক মাস কমিয়ে দুই মাসের দণ্ড দিয়ে আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এছাড়া পাটোয়ারীর স্ত্রীকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি ওই ফেসবুক পোস্টে যারা লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করেছেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে তাদের নাম-পরিচয় আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং পোস্টটি সরিয়ে নিতে বলা হয়।
শেষদিকে আসামির উদ্দেশে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আপনি সমালোচনা করতে পারবেন। দেশের নাগরিক হিসেবে যে কারও বিরুদ্ধেই গঠনমূলক সমালোচনা করা যায়। কিন্তু বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো অপরাধ।’
এমআরআর/এমএসএ
