দুই মাসেও সন্ধান মেলেনি বিইউবিটি শিক্ষার্থী ইফাজের

Dhaka Post Desk

জসীম উদ্দীন, জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

২৭ জুন ২০২২, ০৩:৩৬ পিএম


দুই মাসেও সন্ধান মেলেনি বিইউবিটি শিক্ষার্থী ইফাজের

নিখোঁজ শিক্ষার্থী ইফাজ আহমেদ চৌধুরী/ ছবি : সংগৃহীত

‘রাজধানী থেকে একটা সুস্থ স্বাভাবিক ছেলে দিনে-দুপুরে হাওয়া হয়ে যেতে পারে না। আমরা কার কাছে যাইনি! স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ডিবি, র‌্যাব ও সিআইডি সবার কাছে গিয়েছি। কিন্তু দুই মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও আমার নিরপরাধ সন্তান ইফাজ আহমেদ চৌধুরীর সন্ধান কেউ দিতে পারেনি।’

‘অপহরণকারী কেউ ফোন করে অর্থও দাবি করেনি। নিশ্চয়ই তাকে কেউ না কেউ জোরপূর্বক আটকে রেখেছে। তাহলে কি তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চেয়েও বেশি শক্তিশালী? আমি আমার সন্তানকে ফেরত চাই।’

সোমবার দুপুরে রাজধানীর সেগুন বাগিচার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নিখোঁজ ইফাজ আহমেদ চৌধুরীর মা জান্নাতুল ফেরদৌস এসব কথা বলেন।

তবে থানা পুলিশের দাবি, ইফাজের নিখোঁজ হওয়ার ধরন ও প্রি-একটিভিটিস সন্দেহজনক। হয়ত তিনি কোনো কারণে আত্মগোপনে রয়েছেন। ফেসবুক প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে ইফাজকে এক্সট্রিম ধার্মিক হিসেবে মনে হয়েছে পুলিশের।

নিখোঁজের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ইফাজদের বাসা মিরপুর-২ ৭/৮ বড়বাগে। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজিতে (বিইউবিটি) কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন তিনি। গত ১১ এপ্রিল দুপুর পৌনে ১টার দিকে জোহরের নামাজ পড়ার জন্য বাসা থেকে বের হয়েছিলেন ইফাজ। এ সময় তিনি তার ছোট বোনকে পড়ার জন্য বলে যান এবং নামাজ পড়ে বাসায় এসে তাকে পড়াবেন বলেও জানান। এরপর আর ফিরে আসেননি ইফাজ।

dhakapost

সংবাদ সম্মেলনে ইফাজের মা বলেন, ‘১১ এপ্রিল দুপুর ২ টা ২৬ মিনিটে ইফাজের স্ত্রী তাকে তার নম্বরে ফোন দেয়। কিন্তু সে ফোন রিসিভ করেনি। এরপর থেকে তাকে ফোন দিলে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। বিকেল পার হয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার সন্ধান না পেয়ে রাত ৮টার দিকে মিরপুর মডেল থানায় গিয়ে নিখোঁজের ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করি। জিডি নম্বর ৭৭৫২। পরবর্তীতে স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হলে আমরা দেখতে পাই, আমার ছেলে মিরপুর-১ এর পাও লাইফ কেয়ার নামে একটি প্রাণী হাসপাতালে যায়। যেখানে আমার ছেলে ৩৮ মিনিট অবস্থান করে।’

মা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘ইফাজ যে পথ দিয়ে যায়, একই পথ দিয়েই বাসায় ফিরছিল। সেখানে আমরা একটা কালো মাইক্রোবাস দেখতে পাই। আমাদের সন্দেহ ওই কালো মাইক্রোবাস আমার ছেলেকে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। এদিকে থানা থেকে আমাদের জানানো হয়, ২ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ইফাজের কল লিস্ট পাওয়া যায়নি। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে পরিবারের সদস্য ও তার বন্ধুদের সঙ্গে একাধিকবার কথা হয়েছে যার প্রমাণ আমাদের কাছে আছে।’

‘সেদিন রাতেই আমরা জিডির কপি নিয়ে র‌্যাব-৪ এ যোগাযোগ করি। আমাদের আশ্বস্ত করা হয় যে, আগামীকাল ১২টার মধ্যে আমরা একটা সংবাদ পাব। কিন্তু তারা এখন পর্যন্ত কোনো সন্ধান দিতে পারেনি। ১৩ এপ্রিল সকালে আমার বাবা কাজী মোমিন উদ্দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ করেন। এসময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মিরপুর থানা এবং র‌্যাব-৪ কে গুরুত্ব সহকারে তদন্তের জন্য মৌখিকভাবে নির্দেশ দেন।’

‘এরপর আমরা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য নির্দেশনাও দেওয়া হয়। প্রায় দেড় মাস পরে তারা জানায়, ইফাজকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এরপর থেকে আমি পুনরায় থানা পুলিশ, র‌্যাবসহ বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করি।’

‘আমার বাবা দ্বিতীয়বার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে যান, সেখানে তিনি র‌্যাব হেড কোয়ার্টারকে তদন্তের জন্য বলেন। এরপর পুনরায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে গেলে তিনি সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি ইমাম হোসেনকে নিখোঁজের ব্যাপারটি তদন্তের নির্দেশ দেন। কিন্তু তিনিও ছেলেকে পেয়ে যাব বলে আশ্বস্ত করলেও আজ পর্যন্ত ইফাজের কোনো সন্ধান দিতে পারেননি।’

ইফাজের সঙ্গে কারোও কোন প্রকার শত্রুতাও ছিল না উল্লেখ করে মা জান্নাতুল ফেরদৌসের দাবি, ‘ইফাজ নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে কোন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আমাদের কাছে অর্থ দাবি করেনি। আমাদের জানা মতে ইফাজ কোন ধরনের অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না। তারপরও আমার ছেলে যদি কোনো অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে থাকে তাকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হোক। কিন্তু গত দুই মাসের অধিক সময় ধরে আমার একমাত্র ছেলে নিখোঁজ রয়েছে। রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তার কোন সন্ধান দিতে পারছে না, নাকি দিচ্ছে না! সেটাই আমার প্রশ্ন। একটা সুস্থ স্বাভাবিক ছেলে রাজধানী থেকে দিনে দুপুরে হাওয়া হয়ে যেতে পারে নাং! নিশ্চয়ই তাকে কেউ না কেউ জোরপূর্বক আটকে রেখেছে।’

তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমার ইফাজকে দয়া করে আমার কোলে ফিরিয়ে দিন। আপনি মমতাময়ী মা, পিতা-মাতা, ভাই-বোনহারা একজন মানুষ। আপনার কাছে একটাই অনুরোধ দয়া করে আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দিন।’

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে গোয়েন্দা মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মানস কুমার পোদ্দার ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছিল। আমরা নিখোঁজের জিডি আমলে নিয়ে তদন্ত করছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত নিখোঁজ বিইউবিটির ওই শিক্ষার্থীর সন্ধান আমরা পাইনি।’

dhakapost

মিরপুর মডেল থানার ওসি মোস্তাজিজুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তার অবস্থান জানার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমাদের মনে হয়েছে কেউ যদি নিজে থেকে নিখোঁজ থাকতে চান তাহলে তার অবস্থান খুঁজে বের করা কঠিন।’

তিনি বলেন, তার নিখোঁজ হওয়াটা অস্বাভাবিক। তার ফেসবুক প্রোফাইল আমরা ঘেঁটেছি। দেখেছি এক্সট্রিম ধার্মিক। তার নিখোঁজ হওয়ার পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে। আমরা তার মোবাইলের কললিস্ট চেক করতে দিয়ে নিখোঁজের দিন থেকে সাত দিন আগ পর্যন্ত কোনো ডাটা পাচ্ছিলাম না। পরিবার বলছে নিয়মিত কথা ও যোগাযোগ করতো ইফাজ। হয়ত তিনি ফোন নম্বর ডাইভার্ট করে কথা বলতেন। নিখোঁজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ইফাজের সন্ধানে থানা পুলিশ এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছে। 

পুলিশের এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে যোগাযোগ করা হলে জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ওর নম্বরে কল দিলে প্রায়ই দেখতাম ওর ছোটবোনের নম্বরে কল চলে যেত। পরে এটা নিয়ে ইফাজের কাছে জানতে চাওয়ার পর ঠিকও করা হয়েছে। কিন্তু ওর ফোনে সিম একটাই দেখেছি। মোবাইলও ছিল একটাই। আমাদের সন্দেহ কোনো কারণে রাষ্ট্রের কোনো গোয়েন্দা সংস্থা জোরপূর্বক তাকে আটকে রেখেছে। 

জেইউ/এনআই/এসকেডি

Link copied