সংস্কার ও স্বচ্ছ নির্বাচন, অগ্নিপরীক্ষায় নতুন কমিশন

একাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি ক্ষমতার পরিবর্তনই ছিল না, বরং তা ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের এক মহাপ্রাণ। সেই অভ্যুত্থানের পথ ধরে দীর্ঘ ১৬ বছরের আওয়ামী শাসনের অবসান এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার অধীনে ২০২৫ সালটি দাঁড়িয়েছিল এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে। একদিকে রাজনৈতিক শুদ্ধিকরণ, অন্যদিকে একটি অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষা– এই দুইয়ের দোলাচলে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) পার করেছে ইতিহাসের ব্যস্ততম সময়।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত নতুন কমিশন কেবল ব্যালট পেপার আর ভোটকেন্দ্রের প্রস্তুতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত থেকে শুরু করে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিতের মতো যুগান্তকারী সিদ্ধান্তে আমূল বদলে দিয়েছে নির্বাচনী ভূচিত্র। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের ব্যাপক কর্মযজ্ঞ, সংস্কারের রোডম্যাপ এবং মাঠপর্যায়ে আস্থার পরিবেশ ফেরাতে যৌথ বাহিনীর কঠোর অবস্থান– প্রভৃতি কাজের মধ্যে ২০২৫ সালটি পার করতে হয়েছে নতুন নির্বাচন কমিশনকে।
নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন
২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর সাবেক সচিব এ এম এম নাসির উদ্দিনকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) করে নতুন কমিশন গঠন করা হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ম্যান্ডেট নিয়ে এই কমিশন দায়িত্ব গ্রহণ করে। সার্চ কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ হওয়ায় তা জনমনে ইতিবাচক সাড়া ফেলে।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন
২০২৫ সালের শুরুতে ড. বদিউল আলম মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ‘নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন’ তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে নির্বাচনী আইন সংশোধন, প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং ‘না’ ভোটের বিধান পুনরায় চালুর মতো গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়। ইসি সরকারের পরামর্শে এসব সুপারিশের অনেকগুলোই বাস্তবায়ন করেছে।
আরও পড়ুন
আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত
২০২৫ সালের ১২ মে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নির্দেশনা ও ছাত্র-জনতার দাবির মুখে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। জুলাই-আগস্টের গণহত্যায় দলটির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ বিচারাধীন থাকায় এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
নির্বাচনী রোডম্যাপ ও গণভোট
ইসি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিস্তারিত রোডম্যাপ প্রকাশ করে। ভোটার তালিকা হালনাগাদ শেষে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। একই দিনে সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা ‘জুলাই চার্টার’-এর ওপর জনগণের সম্মতি নিতে গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়। এতে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপ
বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী এবং নির্বাচনের দিন দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তাদের ভোটদান সহজ করতে ১৮ নভেম্বর ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ নামক অ্যাপ উদ্বোধন করা হয়। ১৯ নভেম্বরের প্রথম প্রহর থেকে নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়ে ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই অ্যাপের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া চলে। ডিজিটাল নির্বাচনী ব্যবস্থার দিকে এটি একটি বড় পদক্ষেপ।
অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের উদ্যোগ
আগস্ট মাসে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) ও সাইটসেভার্সের সহযোগিতায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যায়ে পরামর্শ সভা আয়োজন করে ইসি। এতে ‘ব্যালট’ (BALLOT) প্রকল্পের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের ওপর জোর দেওয়া হয়।
সীমানা পুনর্নির্ধারণ ও উচ্চ আদালতের রায়
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রত্যেক কমিশনই সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত সেপ্টেম্বরের মধ্যে সারাদেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজ শেষ করে নাসির উদ্দিন কমিশন। সর্বশেষ জনশুমারির তথ্যের ভিত্তিতে এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রেখে এই সীমানা চূড়ান্ত করা হয়।
নাসির উদ্দিন কমিশন ৪৬টি সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে। বাগেরহাট থেকে একটি আসন কমিয়ে গাজীপুরে একটি বাড়ানো হয়েছিল। এর প্রতিবাদে বাগেরহাটের জনগণ উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হলে আদালত তফসিল ঘোষণার আগের দিন ইসির সিদ্ধান্ত অবৈধ বলে রায় দেন এবং তফসিলের দিন বাগেরহাটের চারটি এবং গাজীপুরের একটি আসন বাদ দিয়ে নতুন করে গেজেট প্রকাশ করে বিজি প্রেস।
ভোটার সংখ্যার চিত্র
২০২৫ সালে ভোটার তালিকা হালনাগাদে বড় সাফল্য দেখায় ইসি। প্রায় ৪৫ লাখ নতুন ভোটার যুক্ত এবং ২১ লাখ মৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়। ১৮ নভেম্বর প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী দেশের বর্তমান ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। এবারই প্রথম ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত যোগ্য তরুণদের ভোটার হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
ভোটার তালিকায় তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন
দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২৭ ডিসেম্বর সশরীরে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি সংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন করেন। এর মাধ্যমে তার আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া ও ভোট দেওয়ার আইনি বাধা দূর হলো।
আরও পড়ুন
যৌথ বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান
নির্বাচনী মাঠে আস্থার পরিবেশ তৈরি ও পেশিশক্তির প্রভাবমুক্ত ভোট নিশ্চিত করতে ২০২৫ সালের শেষার্ধ থেকে দেশজুড়ে যৌথ বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসারের সমন্বয়ে গঠিত এই বিশেষ টিম অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে কাজ করছে। ইসি সচিবালয়ের তত্ত্বাবধানে এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের উপস্থিতিতে ‘ব্লক রেইড’ ও বিশেষ তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
মূলত পেশিশক্তির প্রভাবমুক্ত একটি নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিতে এবং সাধারণ ভোটাররা যেন নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেই লক্ষ্যে কমিশন এই কঠোর নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করেছে।
এসআর/বিআরইউ/এমএআর
