নারী মনোনয়নে ন্যূনতম প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করেনি রাজনৈতিক দলগুলো

নির্বাচনে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ন্যূনতম প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করেনি বলে অভিযোগ করেছে নারী রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম। সংগঠনটির দাবি, দলগুলো ঘোষিত ৫ শতাংশ নারী মনোনয়নও বাস্তবায়ন করেনি, যা নারী নেতৃত্বের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহারই প্রমাণ। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দাকারী ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টি কোন নারী প্রার্থী নেই।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন ফোরামের নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের প্রতিনিধি শিল্পি ও নির্মাতা ঋতু সাত্তার।
এসময় নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরামভুক্ত সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সংগঠনগুলো হচ্ছে– ক্ষুব্ধ নারী সমাজ, গণসাক্ষরতা অভিযান, দুর্বার নেটওয়ার্ক ফাউন্ডেশন, নাগরিক কোয়ালিশন, নারী উদ্যোগ কেন্দ্র (নউক), নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা, নারী সংহতি, নারীপক্ষ, নারীর ডাকে রাজনীতি, ফেমিনিস্ট অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশ (ফ্যাব), বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্র ও ভয়েস ফর রিফর্ম।
ঋতু সাত্তার বলেন, নারীরা রাজনৈতিক দল থেকে মনোনয়ন চেয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, মনোনয়ন ৫ শতাংশও দিতে পারেনি কোন রাজনৈতিক দল। যৌথ নারী প্রার্থী থাকার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। জুলাই সনদে দেওয়া প্রতিশ্রুতিকেও রাজনৈতিক দলগুলো গুরুত্ব দেয়নি।
তিনি বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে শক্তিশালী ও যোগ্য নারী নেতৃত্ব থাকা সত্ত্বেও তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় রাখা হচ্ছে না।
ঋতু সাত্তার অভিযোগ করে বলেন, নারীদের কেবল কমিটিতে রাখা হয়, কিন্তু ডিসিশন মেকিং প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয় না, এটাই বাস্তবতা।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, শেষ মুহূর্তে কিছু স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিলেও সামগ্রিকভাবে নারীদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত হতাশাজনক। ফোরামের দাবি, নির্বাচন কমিশন ‘জেন্ডার ইনক্লুসিভ ইলেকশন’-এর কথা বললেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
বক্তারা বলেন, জুলাই আন্দোলনে নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। নারীদের হল থেকে প্রথম বেরিয়ে আসার মাধ্যমেই আন্দোলন গতি পায়। অথচ সেই নারীরাই আজ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় উপেক্ষিত।
তারা অভিযোগ করেন, পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক যোগ্য নারী শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন। নির্বাচনী মাঠে নারী ও পুরুষের জন্য সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নেই বলেও দাবি করেন তারা।
নারী রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম স্পষ্টভাবে জানায়, তারা সংরক্ষিত আসনের বিপক্ষে। ‘আমরা চাই না নারীদের জন্য আলাদা সংরক্ষিত আসন থাকুক। নারীরা নিজেদের যোগ্যতায় সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করুক, বলেন বক্তারা।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, ৫৪ বছর পর এমন একটি নির্বাচন হচ্ছে যেখানে নারীদের অংশগ্রহণ সবচেয়ে কম। এটি শুধু নারীদের নয়, পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য লজ্জাজনক। রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিজেদের ঘোষণাপত্র ও প্রতিশ্রুতি নিজেরাই রক্ষা না করে, তাহলে ভবিষ্যতে নারীরা কেন তাদের ওপর আস্থা রাখবে- এই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৯৭২ সালে যখন রাষ্ট্রের কাঠামো তৈরি হচ্ছিল, তখনও সময়টা ছিল ভীষণ টালমাটাল। তবু সে সময়ও এমন অনেক নারী ছিলেন, যারা চাইলে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে পারতেন। পরবর্তী সময়ে আমরা তার বাস্তব প্রমাণও পেয়েছি। সুতরাং বিষয়টি কেবল নারীর জন্য নয়—পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যই রাজনৈতিক স্তরে সমানভাবে জায়গা করে দেওয়ার প্রয়োজন আছে। রাজনীতি কোনো একক লিঙ্গের বিষয় নয়; এটি সকলের অংশগ্রহণের মাধ্যমেই শক্তিশালী হয়।
একটি কথা আমাদের কখনো ভুলে গেলে চলবে না- যেভাবে নারী একটি পরিবারের বীজ সংরক্ষণ করে, সন্তানকে বড় করে তোলে এবং পরিবারকে ধরে রাখে, ঠিক তেমনি রাষ্ট্র পরিচালনাতেও নারীর ভূমিকা অপরিহার্য। নারী যদি দেশ চালাতে না পারে, তাহলে পুরুষ একা কখনোই রাষ্ট্রকে সামনে এগিয়ে নিতে পারবে না- এটা বাস্তবসম্মত নয়।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন ইউপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অ্যাকটিভিস্ট মাহরুখ মহিউদ্দীন, বহ্নি শিখার পরিচালক সামিনা ইয়াসমিন এবং ফোরামের নির্বাহী পরিষদের সদস্য সাদাফ সায।
এমএমএইচ/এমএসএ