জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনায় রপ্তানি চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ২৫ বছর মেয়াদি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (ইপিএসএমপি ২০২৫)-এর খসড়া মহাপরিকল্পনা বাতিলের জোর দাবি জানিয়েছে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন প্রতিনিধি সংগঠন। এ খসড়া মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত চরমভাবে বাঁধাগ্রস্ত হবে বলে মনে করেন তারা। তাই তড়িঘড়ি করে এটি বাস্তবায়ন না করে, নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সরকারের অধীনে বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে এ মহাপলিকল্পনা গ্রহণের দাবি সংগঠনগুলোর।
রোববার (১৭ জানুয়ারি) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে ইপিএসএমপি-২০২৫ এর খসড়া মহাপরিকল্পনার বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ জানান নাগরিক সমাজের বিভিন্ন প্রতিনিধি সংগঠন।
বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোটের (বিডব্লিউজিইডি) উদ্যোগে এবং উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন), আমরাই আগামী, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্চ (সিইপিআর), ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ (ইটিআই বাংলাদেশ), জেট-নেট বিডি, লয়ার্স ফর এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (লিড), মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ), রি-গ্লোবাল, সৌহার্দ ইয়ুথ ফাউন্ডেশন, সেইফটি অ্যান্ড রাইটস (এসআরএস), ওয়াটারকিপার্স ও শ্রমিক-নেতৃত্বাধীন ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ওয়ার্কার ক্যান) সহ-আয়োজনে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনাটি (২০২৬–২০৫০) গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করেই তৈরি করা হয়েছে। এতে পরিবেশ ও সমাজের প্রভাব পর্যাপ্তভাবে বিবেচনা করা হয়নি এবং জনগণের অংশগ্রহণকে উপেক্ষা করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ক্লিনের এডভাইজার মনোয়ার মোস্তফা। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল কেবল নিয়মিত রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই সীমা অতিক্রম করে একটি দীর্ঘমেয়াদি, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও বহুমাত্রিক প্রভাবসম্পন্ন জ্বালানি পরিকল্পনা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এমনকি উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কোনো অর্থবহ অংশগ্রহণমূলক পরামর্শ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
অভিযোগ করে তিনি বলেন, যেভাবে অতীতে দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ব্যবহার করে বিতর্কিত প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, ইপিএসএমপি-২০২৫ সেই একই পথে ভবিষ্যতেও জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর প্রকল্পকে বৈধতা দেওয়ার কাঠামো তৈরি করছে। বাংলাদেশের বিদ্যুতের চাহিদা ৪০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হবার কথাই না।
মনোয়ার মোস্তফা বলেন, মহাপরিকল্পনায় ‘এনার্জি ট্রানজিশন’-কে ব্যাপক প্রচার করা হলেও বাস্তবে প্রকৃত নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ সেখানে মাত্র ১৭ শতাংশ, যেখানে কাগজে দেখানো হয়েছে ৪৪ শতাংশ। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১৫ দশমিক ৮০ গিগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ২৫ দশমিক ২০ গিগাওয়াট করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ২৫ বছর পরও এলএনজি, কয়লা ও তেলের ওপর নির্ভরতা ৫০ শতাংশ থাকবে; যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি।
তিনি আরও বলেন, খসড়ায় হাইড্রোজেন, অ্যামোনিয়া কো-ফায়ারিং ও কার্বন ক্যাপচারের (সিসিএস) মতো ব্যয়বহুল ও পরীক্ষামূলক প্রযুক্তিকে সমাধান হিসেবে দেখানো হয়েছে; যা বাস্তবসম্মত নয় এবং ভবিষ্যতে দেশকে নতুন ঋণ, ভর্তুকি ও পরিবেশগত সংকটে ফেলবে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৫০ সালে বাংলাদেশের কার্বন নির্গমন হবে ১৮৬ দশমিক ৩ মেট্রিক টন কার্বন ডাই অক্সাইড সমতুল্য; যা দেশের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদানের (এনডিসি) লক্ষ্য এবং অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষিত ‘শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য কার্বন’ দর্শনের সঙ্গে এই পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে বিরোধী। পাশাপাশি শ্রমিক পুনর্বাসন, নারী ও লিঙ্গভিত্তিক ন্যায্যতা, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং পোশাক খাতের সবুজায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পরিকল্পনায় প্রায় উপেক্ষিত রাখা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বিডব্লিউজিইডির সদস্য সচিব হাসান মেহেদী জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনাটি (২০২৬–২০৫০) প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় জনসাধারণ, নাগরিক সমাজ ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। কোনো ধরনের জনশুনানি বা উন্মুক্ত পরামর্শ ছাড়াই এই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী সরকারের অস্বচ্ছ ও দায়মুক্তিমূলক নীতি প্রণয়নেরই পুনরাবৃত্তি।
লিডের গবেষণা পরিচালক এডভোকেট শিমনউজ্জামান বলেন, নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে, নাগরিক সমাজকে উপেক্ষা করে একই ধরনের (আইইপিএমপি ২০২৩ এর মতো) মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন সত্যিই হতাশাজনক।
ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশের পরিচালক (প্রোগ্রাম এভিডেন্স অ্যান্ড লার্নিং) মুনীর উদ্দীন শামীম বলেন, নাগরিক হিসেবে আমাদের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। এ ধরনের মহাপরিকল্পনা নাগরিক হিসেবে আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এটি যদি এভাবে এগিয়ে যায়, তাহলে রপ্তানি খাত চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। ২০২৭ সালের পর আমাদের নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন জেটনেট-বিডির ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সমন্বয়ক (সিডিইউ) ওয়াসিউর রহমান তন্ময়, এবং ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের ম্যানেজার সৈয়দ তাপস প্রমুখ।
এমএমএইচ/এমএন