‘কোটা’র লোভে অস্তিত্বই বিসর্জন, অবিশ্বাস্য এক প্রতারণার গল্প

নিজের বাবার নাম আড়াল করে চাচার পরিচয়ে রাষ্ট্রীয় সুবিধা হাতিয়ে নেওয়ার এক নজিরবিহীন জালিয়াতি ধরা পড়েছে ময়মনসিংহে। জন্মদাতা বাবাকে বাদ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা চাচাকে ‘বাবা’ সাজিয়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের সার্ভেয়ার (প্রকৌশল) মো. বেলাল হোসেন। নীতি-নৈতিকতা আর আইনের তোয়াক্কা না করে বছরের পর বছর ধরে মুক্তিযোদ্ধা কোটার অপব্যবহার করে আসা এই কর্মকর্তার প্রতারণার জাল এখন প্রশাসনের তদন্তে উঠে আসছে। নিজের অস্তিত্ব আর পরিচয় বদলে দেওয়ার এই অবিশ্বাস্য গল্প কেবল একজন ব্যক্তির অপরাধ নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির দুর্বলতাকেও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
জানা গেছে, বেলাল হোসেন ছোটবেলা থেকে চাচা আবুল কালাম আজাদের বাসায় থেকে পড়াশোনা করতেন। এসএসসি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশনের সময় নিজের বাবা মো. গফুর মণ্ডলের নাম বাদ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা চাচা আবুল কালাম আজাদকে সরকারি নথিতে বাবা হিসেবে দেখান তিনি। পরবর্তীতে এই তথ্য ব্যবহার করে অবৈধভাবে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নেন।
এদিকে, ভুল তথ্য দিয়ে নিজের এলাকার চেয়ারম্যানের কাছ থেকে একটি ওয়ারিশ সনদও সংগ্রহ করেন বেলাল হোসেন। পরবর্তীতে সত্যতা জানতে পেরে ইউপি চেয়ারম্যান সেই ভুয়া ওয়ারিশ সনদ বাতিলের জন্য বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেন। ঢাকা পোস্টের হাতে আসা নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। সম্প্রতি বিষয়টি জানতে পেরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ড তদন্ত শুরু করেছে।
মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর উপজেলার চরকাটারী এলাকার বাসিন্দা বেলাল হোসেন কাগজে-কলমে মুক্তিযোদ্ধা মো. আবুল কালাম আজাদকে বাবা দেখিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নেন। অথচ ওয়ারিশ সনদ, স্থানীয় সরকারের নথি ও পারিবারিক তথ্য অনুযায়ী তার জৈবিক পিতা (বাবা) মো. গফুর মণ্ডল। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে বিষয়টি পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে সেখান থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালককে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর উপজেলার চরকাটারী এলাকার বাসিন্দা বেলাল হোসেন কাগজে-কলমে মুক্তিযোদ্ধা মো. আবুল কালাম আজাদকে বাবা দেখিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নেন। অথচ ওয়ারিশ সনদ, স্থানীয় সরকারের নথি ও পারিবারিক তথ্য অনুযায়ী তার জৈবিক পিতা (বাবা) মো. গফুর মণ্ডল। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে বিষয়টি পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে সেখান থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালককে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট নথিতে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ভুয়া পরিচয় গ্রহণ, কোটার অপব্যবহার ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বেলাল হোসেন প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় কেউ এ বিষয়ে মুখ খোলার সাহস পাননি। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মিথ্যা তথ্য দিয়ে এভাবে চাকরি নেওয়া শুধু শাস্তিযোগ্য অপরাধই নয়, এটি একটি চরম নৈতিক অধঃপতন। একজন ব্যক্তি যদি নিজের বাবার পরিচয় আড়াল করে অবৈধ সুবিধা নিতে পারেন, তবে তার কর্মজীবনে সততা ও নাগরিক সেবার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায়।

ওয়ারিশ সনদে যা দেখা গেছে
বেলাল হোসেন কি মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদের ছেলে, নাকি গফুর মণ্ডলের? ঢাকা পোস্টের হাতে আসা মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ ও তার ভাই গফুর মণ্ডলের ওয়ারিশ সনদ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদের সনদে মোট ছয়জন উত্তরাধিকারীর নাম রয়েছে। তারা হলেন— স্ত্রী চান ভানু এবং সন্তান যথাক্রমে মো. আবু নাসির, মো. শফিকুল ইসলাম, মোছা. হাসনে হেনা, মো. নাজমুল হাসান ও মো. হিমেল রানা। এই তালিকায় বেলাল হোসেনের নাম নেই।
অন্যদিকে, মো. গফুর মণ্ডলের ওয়ারিশ সনদে বেলাল হোসেনকে জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সনদ অনুযায়ী গফুর মণ্ডলের পাঁচজন উত্তরাধিকারী হলেন— স্ত্রী নুরুন নাহার, দুই ছেলে মো. বেলাল হোসেন ও মো. হেলাল হোসেন এবং দুই কন্যা আছিয়া খাতুন ও বৃষ্টি খাতুন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই দুটি ওয়ারিশ সনদই একই ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কর্তৃক স্বাক্ষরিত। বিষয়টি তদন্তকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ওয়ারিশ সনদ সংশোধন ও প্রত্যয়ন প্রদানের বিষয়ে স্থানীয় চরকাটারী ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আইয়ুব আলী বলেন, ‘বেলাল হোসেন চরকাটারী সবুজ সেনা হাইস্কুলে পড়াশোনা করতেন। ওই সময় তার চাচা আবুল কালাম আজাদ সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে নিজের পালিতপুত্র হিসেবে স্কুলে রেজিস্ট্রেশন করান। প্রকৃতপক্ষে বেলাল হোসেন তার সন্তান নন। ওই রেজিস্ট্রেশনের কারণে কাগজে–কলমে মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদের নাম বেলালের বাবা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আসলে বেলাল হোসেন গফুর মোল্লার ছেলে।’
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তদন্তের নির্দেশ
নথিপত্র অনুযায়ী, সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাধারণ অধিশাখার যুগ্ম সচিব মো. সাজ্জাদুল হাসানের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-১ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মাসুম রেজার স্বাক্ষরিত আরেকটি চিঠিতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালককে তদন্ত করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। তবে, নানা জটিলতায় এখনও পানি উন্নয়ন বোর্ড তদন্ত প্রতিবেদন পাঠাতে পারেনি।
জানা গেছে, এর আগে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) যোগ দিতে গেলেও ভুয়া পরিচয়-সংক্রান্ত জটিলতায় তিনি বাধার মুখে পড়েন। তদন্তে বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় সেখানে তিনি যোগ দিতে পারেননি। অভিযোগ রয়েছে, এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে যারা তথ্য দিয়েছেন বেলাল হোসেন তাদের বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে আসছেন।
জালিয়াতির দায় স্বীকার ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
ভুয়া বাবা হিসেবে দেখানো মুক্তিযোদ্ধা মো. আবুল কালাম আজাদের মৃত্যুর পর বেলাল হোসেন নিজেকে তার সন্তান দাবি করে একটি ওয়ারিশ সনদ নিয়েছিলেন। বর্তমানে সেটি বাতিলের আবেদন করে জেলা প্রশাসক ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান।
এ বিষয়ে বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আইয়ুব আলী বলেন, ‘বেলাল হোসেনের প্রকৃত বাবা গফুর মোল্লা আমাদের এলাকার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য। ভুয়া বাবা হিসেবে দেখানো মুক্তিযোদ্ধা আজাদ মণ্ডল মারা যাওয়ার কিছুদিন পর আমাকে ভুল তথ্য দিয়ে বেলালকে আজাদ মণ্ডলের সন্তান দেখিয়ে একটি ওয়ারিশ সনদ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি জানতে পেরে ওই ওয়ারিশ সনদ বাতিলের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আমি লিখিত আবেদন করেছি। এসএসসির কাগজপত্রে তার বাবার নাম আবুল কালাম আজাদ থাকায় আমি ওয়ারিশ সনদ দিয়েছিলাম। পরে প্রকৃত ঘটনা জানতে পেরে তা বাতিলের জন্য লিখিতভাবে জানিয়েছি।’

‘লিখিত আবেদনে উল্লেখ করেছি, ভুয়া তথ্য দিয়ে আমার কাছ থেকে ওয়ারিশ সনদ নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়কেও লিখিতভাবে জানিয়েছি।’
এ বিষয়ে বেলাল হোসেনের প্রকৃত বাবা মো. গফুর মণ্ডল বলেন, ‘বেলাল ছোটবেলা থেকেই আমার কাছ থেকে দূরে ছিল। তখন তার বয়স আনুমানিক দুই বছর হবে। সে মূলত চাচার কাছেই মানুষ হয়েছে। আমি প্রায় ১৪ বছর দেশের বাইরে ছিলাম, তখন সে তার চাচার কাছে বড় হয়েছে। পরে দেশে ফিরে এলেও সে আর আমার কাছে আসেনি। এখন সে আমার খোঁজখবর রাখে না, আমাদের মধ্যে কথাবার্তাও হয় না।’
জানতে চাইলে অভিযুক্ত বেলাল হোসেন প্রথমে বলেন, ‘আপনাকে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে।’ তার ভুয়া বাবা হিসেবে পরিচিত চাচা আবুল কালাম আজাদের ওয়ারিশ সনদে তার নাম না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শুনুন, ছোটবেলায় আমার বাবা হারিয়ে যাওয়ায় আমি তার (চাচা আবুল কালাম আজাদ) বাসায় মানুষ হয়েছি। এসব আমি জানতামও না।’
বাবা হারালেও পরিচয় কেন পরিবর্তন করা হলো— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা হয়েছে, কী আর করতে পারি? এখন আর কিছুই বলার নেই আমার।’
দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও কেন বেলাল হোসেনের বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি— এমন প্রশ্নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মোল্লা মিজানুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তদন্ত দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
ব্যবস্থা নেবে মন্ত্রণালয়
এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম (বীর প্রতীক) বলেন, ‘রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধার ওয়ারিশ হবেন তার পিতা-মাতা ও সন্তান। এর বাইরে আর কারও ওয়ারিশ হওয়ার সুযোগ নেই। যারা ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে বা ভুয়া ওয়ারিশনামা তৈরি করে এসব সুবিধা নিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করা গেলে আমরা ব্যবস্থা নেব।’
মিথ্যা তথ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা কোটা কোনো করুণার দান বা সুবিধা নয়, এটি মুক্তিযুদ্ধের প্রতি রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ। ভুয়া কাগজপত্র ও মিথ্যা পরিচয়ের মাধ্যমে এই কোটায় চাকরি নেওয়া সরাসরি রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতারণা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অবমাননা।’
‘এই ধরনের অনিয়মের কারণে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলো তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। একইসঙ্গে প্রশাসনের ভেতরে বৈষম্য ও অবিশ্বাস তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে।’
সাবেক এই সচিব আরও বলেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে যদি জাল সনদ, ভুয়া ওয়ারিশ বা কৃত্রিম আত্মীয়তার আশ্রয় নেওয়া হয়, তবে সেটি শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার দিকেও ইঙ্গিত করে। তাই তদন্ত যেন শুধু ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং কোন পর্যায়ে গাফিলতি হয়েছে— সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি। এটি শুধু শাস্তিযোগ্য অপরাধই নয় বরং নৈতিক অধঃপতনেরও বড় ইঙ্গিত।
‘এই ধরনের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়ম বারবার ঘটবে। একইসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা কোটার সনদ যাচাই প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী ও প্রযুক্তিনির্ভর হওয়া প্রয়োজন, যাতে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের অধিকার সুরক্ষিত থাকে’— যোগ করেন আনোয়ার ফারুক।
এমএম/
