আপাতত আলোর মুখ দেখছে না কুমিল্লা-ফরিদপুর বিভাগ

জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও প্রাথমিক প্রস্ততি থাকা সত্ত্বেও আপাতত হচ্ছে না বহুল আলোচিত ফরিদপুর ও কুমিল্লা বিভাগ। প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সাম্প্রতিক সভায় নতুন এই বিভাগ গঠনের প্রস্তাবটি তোলা হয়নি। মূলত নতুন বিভাগ গঠনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সৃষ্ট বিতর্ক ও আঞ্চলিক বিরোধের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আপাতত এই প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে তার বাসভবন যমুনায় নিকারের ১১৯তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদকালে নিকারের প্রথম সভা।
সভায় প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসসংক্রান্ত মোট ১১টি প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। এর মধ্যে দেশে চারটি নতুন থানা স্থাপনের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। এ ছাড়া, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ অক্টোবর সরকার ‘প্রাক নিকার সচিব কমিটি’ গঠন করে। কমিটির সভাপতি মন্ত্রিপরিষদ সচিব। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী কমিটি বৈঠক করে ফরিদপুর ও কুমিল্লার নামে নতুন দুটি বিভাগ গঠনের সুপারিশ তৈরি করে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, ফরিদপুর বিভাগে থাকবে ফরিদপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ ও শরীয়তপুর জেলা। এছাড়া, কুমিল্লা বিভাগে অন্তর্ভুক্ত করা হবে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলা।
এ খবরকে কেন্দ্র করে কুমিল্লা, ফরিদপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জনসাধারণ ও রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে পাল্টাপাল্টি দাবি ও প্রতিবাদ দেখা গেছে। এর মধ্যে বৃহত্তর নোয়াখালীকে কেন্দ্র করে ‘নোয়াখালী বিভাগ’ গঠনের দাবি যেমন উঠেছে, তেমনি ফেনীকে প্রস্তাবিত কুমিল্লা বিভাগে অন্তর্ভুক্ত না করে চট্টগ্রাম বিভাগে রাখার পক্ষে জনমত তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, শরীয়তপুরকে প্রস্তাবিত ফরিদপুর বিভাগে অন্তর্ভুক্ত না করে ঢাকা বিভাগের সঙ্গেই বহাল রাখার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভসহ নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে। বিভাগ গঠনের এই ইস্যুটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতেও ব্যাপক আলোচনা, তর্ক ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
বিভাগের বিষয়টি সভায় না ওঠানোর সিদ্ধান্ত
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ বলেন, “আপাতত এ বিষয়টি (ফরিদপুর ও কুমিল্লা বিভাগ) নিকার সভায় ওঠেনি। এটি সভায় না তোলারই সিদ্ধান্ত হয়েছে। অনেক ঝগড়াঝাটি (আঞ্চলিক বিরোধ ও দাবি) আছে, সেজন্য আপাতত এটি আর বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না।”
সভায় বিষয়টি প্রস্তাব আকারে ওঠেনি বলেও জানান তিনি। মন্ত্রিপরিষদ সচিব আরও বলেন, এটা নিয়ে বিতর্ক আছে বিভিন্ন জায়গায়। প্রস্তাব তোলা হয়নি, এমনি আলোচনায় তোলা হয়েছিল।
ভৌগোলিক ও যাতায়াত সুবিধা বিবেচনায় প্রস্তাব করেছিল কমিশন
‘জনমুখী প্রশাসনের লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত পুনর্গঠন’ শিরোনামে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন ফরিদপুর ও কুমিল্লা নামে দুটি নতুন বিভাগ গঠনের প্রস্তাব দেয়।
কমিশন তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, বর্তমানে দেশে মোট ৮টি প্রশাসনিক বিভাগ রয়েছে। ভৌগোলিক ও যাতায়াতের সুবিধা বিবেচনায় কুমিল্লা ও ফরিদপুর বিভাগ গঠনের দাবি বহুদিনের। সেই বিবেচনায় কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে দুটি নতুন বিভাগ গঠনের সুপারিশ করা হয়।

২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান আব্দুল মুইদ চৌধুরী সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের কাছে এ প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন। প্রস্তাবে ফরিদপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ ও শরীয়তপুর জেলা নিয়ে ফরিদপুর বিভাগ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলা নিয়ে কুমিল্লা বিভাগ গঠনের সুপারিশ করা হয়।
প্রসঙ্গত, কুমিল্লা ও ফরিদপুরকে কেন্দ্র করে বিভাগ গঠনের দাবি বহু বছরের। এর আগে ২০২২ সালের ২৭ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নিকার বৈঠকে বৃহত্তর ফরিদপুরের কয়েকটি জেলা নিয়ে ‘পদ্মা বিভাগ’ এবং কুমিল্লা ও আশপাশের জেলাগুলো নিয়ে ‘মেঘনা বিভাগ’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উঠেছিল। তবে সে সময় প্রস্তাবটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি।
এসএইচআর/এমজে
