চেয়েছি গণতন্ত্র, পেয়েছি মবোক্রেসি

আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে তাদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব এবং নির্বাচনের ওপর তাদের আস্থা বা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, তাতে জোর দিতে হবে।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন : সংখ্যালঘু অধিকার, প্রতিনিধিত্ব ও গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব বিষয়ে জোর দেন।
অনুষ্ঠানে আলোচকদের মধ্যে ছিলেন— মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, ব্যারিস্টার সারা হোসেন; বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের অন্যতম সভাপতি নির্মল রোজারিও, গণফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, ঢাকা মহানগর পূজা কমিটির সভাপতি জয়ন্ত কুমার দেব, বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ভিক্ষু সুনন্দ প্রিয়, বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ও হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিজন কান্তি সরকার, বাংলাদেশ দলিত পরিষদের বিভাগীয় প্রধান, চন্দ্রমোহন রবিদাস; বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সভাপতি ফাল্গুনী ত্রিপুরা, সুপ্রিম কোর্ট এর আইনজীবী নিকোলাস চাকমা, প্রথম আলোর সহকারী বার্তা সম্পাদক পার্থ শংকর সাহা, সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, বাংলাদেশের ট্রান্সজেন্ডার আন্দোলনের মুখ, হো চি মিন ইসলাম, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান, সিজিএস-এর সভাপতি জিল্লুর রহমান প্রমুখ।
শাহীন আনাম বলেন, আমাদের সরকারের প্রতি যে আস্থা ভেঙে গেছে, তা আমরা গ্রহণ করতে চাই না। সংখ্যালঘুদের বাড়ি-ঘর এবং মানুষের জীবন পুড়ে ফেলা হয়েছে এবং তার বিচার নিয়ে কোনো স্বচ্ছতা নেই। যারা ভুক্তভোগী, তাদের কোনো বিশ্বাস নেই যে বিচার হবে। তাই মানুষকে মানুষের মধ্যে সম্প্রতি এবং ভিন্ন মানুষের মতপার্থক্য গ্রহণ করতে হবে। রাজনৈতিক দলের প্রতিশ্রুতির প্রতি মানুষের আস্থা নেই।
তিনি বলেন, আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে কোনো পরিবর্তন আনতে পারিনি। তাদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেছিলাম, কিন্তু তা নিশ্চিত করতে পারিনি। উইটনেস ভিকটিম প্রোটেকশন অ্যাক্টের বাস্তবায়ন হয়নি। এগুলোর জন্য আমাদের জোরালো দাবি করতে হবে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা দিতে হবে। তা না হলে মানুষের অধিকার বাস্তবায়ন হবে না।
ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যেও কিছু সংখ্যালঘু গোষ্ঠী রয়েছে, এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি তাদের সমস্যাগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা দেখি, রক্ষণশীল পটভূমির নারীরাও এখনও পিছিয়ে আছে। রংপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় হামলার ঘটনা ঘটেছে, এমনকি শিশুদেরও লক্ষ্য করা হয়েছে। নির্বাচন সামনে থাকায় নির্বাচন কমিশনকে এসব সহিংসতার বিষয়ে নজর দিতে হবে। হটলাইন ব্যবস্থাও প্রায়ই দূরত্ব বা অন্যান্য কারণে দ্রুত সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়, যা আরও সমস্যা তৈরি করে। এটিকে আরও কার্যকর ও দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল করতে হবে।
তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের পরিস্থিতির দিকেও নজর রাখা জরুরি। অবশ্যই সংখ্যালঘুদের বিষয়গুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে, পাশাপাশি মিথ্যা মামলাগুলো কীভাবে নিষ্পত্তি করা যায় সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। সমস্যাগুলো আরও জটিল হওয়ার আগেই অর্থাৎ সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া বললেন, আত্মপরিচয়ের সংকট আমরা এখনো সমাধান করতে পারিনি। এই ক্ষেত্রে আমরা খুবই দুর্বল। আমরা এখনো আদিবাসীদের স্বীকৃতি দিতে পারিনি স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর। সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে আমরা একত্রিত হয়ে কাজ করতে পারি না, কারণ আমরা নিজেদের বিভক্ত হয়ে গেছি। সবার চাওয়া যদি এক না হয়, ব্যথা যদি এক না হয়, তবে অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে? তাই যদি আমরা অধিকার নিয়ে একত্রিত হয়ে ঐক্যবদ্ধ হই, তবে আমরা মানুষের কাছে আস্থাভাজন হব এবং আমাদের সমস্যা সমাধান হবে। আমরা এখনো প্রতিনিধিত্ব সৃষ্টি করতে পারিনি। কেন আমরা কিছু রাজনৈতিক দলের কাছে বিক্রি হব? দুর্বল মানুষের কাছে বিক্রি হলে আমরা কখনো আমাদের অধিকার আদায় করতে পারব না।
তিনি বলেন, তাই যদি আমরা অধিকার জোট তৈরি করতে পারি, তবে আমরা আমাদের অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে পারব। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আবেদন জানাই, আমাদের প্রশ্ন, ‘আমরা কেন তোমাদের ভোট দেব?’ যদি তারা আমাদের অধিকার নিয়ে স্পষ্টভাবে কথা বলে এবং তা নিশ্চিত করে, তবেই আমরা তাদের ভোট দেব।
অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, প্রফেসর ইউনূস কথা দিয়েছিলেন কিন্তু কথা রাখেনি। ৫৪ বছরের ইতিহাসে কেউ কথা রাখেনি। প্রতিটি সরকারের আমলে এত নিপীড়ন, এত বৈষম্য হয়েছে কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি। এই সরকারের আমলেও কোনো সমস্যা সমাধান হয়নি। চেয়েছিলাম গণতন্ত্র, কিন্তু পেয়েছি মবোক্রেসি। এ ধরনের পরিবেশ আগে কখনো দেখিনি। আগামী নির্বাচনে অনেক আশা দেখা যাচ্ছে, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। আশা করি সরকার এবং বিচার বিভাগ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করবে। যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে, তা যেন পূর্ণ হয়, আমরা সেই আশা করি।
জয়ন্ত কুমার দেব বলেন, রাষ্ট্র প্রায়ই মানুষকে তাদের সংখ্যালঘু পরিচয় মনে করিয়ে দেয় এবং এর ফলে তারা ধারাবাহিক সহিংসতা ও বৈষম্যের শিকার হয়। এই বাস্তবতায় একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন কল্পনা করা কঠিন। সংখ্যালঘুরা কেবল যথাযথ প্রতিনিধিত্ব থেকেই নয়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অর্থবহ অংশগ্রহণ থেকেও বঞ্চিত। তবে যদি মানুষকে তাদের কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে হয়ত একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানো অত্যন্ত জরুরি, কারণ দুর্বলদের কণ্ঠস্বর শোনা ও সম্মান করা হলেই প্রকৃত অগ্রগতি সম্ভব।
বিজন কান্তি সরকার বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে অনেক বিধান রয়েছে, কিন্তু সেগুলো কার্যকর করা হয় না। বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে মুসলমানদের ধরা হয় এবং হিন্দু সম্প্রদায়কে সাধারণত সংখ্যালঘু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর মতো শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমের কার্যালয়ে সাম্প্রতিক ভাঙচুর ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। যথাযথ আইনি সুরক্ষা ও জবাবদিহিতার অভাব দেশের ন্যায়বিচার ও সমতার মূল মূল্যবোধকে ক্ষুণ্ন করছে—এ বিষয়গুলো জরুরি ভিত্তিতে সমাধান করা দরকার।
মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেগুলোর কোনোটিই কি বাস্তবায়িত হয়েছে? উদাহরণস্বরূপ, বিএনপি কখনোই অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে তুলতে পারেনি। সংসদে সংখ্যালঘুদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে প্রায় ৬০টি আসন সংরক্ষণের কথা বলা হয়। কিন্তু সরকার থেকে শুরু করে নির্বাহী প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যন্ত সর্বত্র এমন সমস্যা রয়েছে, যা অন্তর্ভুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করে। এ বিষয়ে আন্তরিক পদক্ষেপের অভাবই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর বঞ্চনাকে স্থায়ী করে রাখছে এবং সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের লক্ষ্যকে দুর্বল করছে।
বাসুদেব ধর বলেন, আমাদের অধিকার আদায়ের জন্য আমরা নিজেদের সংখ্যালঘু বলি। আমরা সংখ্যালঘু, কারণ আমাদের সংখ্যা কম। আমরা সমান অধিকার নিয়ে কথা বলি এবং তা নিশ্চিত করার জন্য সংগ্রাম করি। ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলো অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল না। ২০২৬ সালের নির্বাচন কী অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, তা আমি মনে করি না। আমরা জানি, আমরা ভোট দিলেও মার খাবো, না দিলেও মার খাবো। একজন সংখ্যালঘু ভোট কাকে দেবে, সে এটি বলতে পারে না এবং এটি ঠিক করতে পারে না বিভিন্ন হুমকির কারণে। মন্দিরে হামলা হয়েছে এবং হচ্ছে। আগামী নির্বাচনে সঠিকভাবে ভোট দিতে পারবো কি না, তা আমরা জানি না। সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
এনআই/এমএন