কুমিল্লায় ট্রেনে সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তার মৃত্যু ঘিরে নানা প্রশ্ন

ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী আন্তঃনগর ট্রেন চট্টলা এক্সপ্রেসে চাকরিচ্যুত এক ব্যাংকার নিহতের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। গভীর রাতে ট্রেনের ছাদে সংঘটিত এই ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিও নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
নিহত ব্যক্তি চাকরিচ্যুত ব্যাংককর্মীদের আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকায়, এটি নিছক ছিনতাই নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড— তা নিয়ে পরিবার, সহকর্মী ও যাত্রীদের মধ্যে ভিন্নমত ও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। তবে রেলওয়ে জানিয়েছে, তারা মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করতে তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
জানা যায়, ঢাকা থেকে আন্তঃনগর ট্রেন চট্টলা এক্সপ্রেসে চড়ে বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) রাতে চট্টগ্রাম ফিরছিলেন আবদুল আজিজ (৩৪)। গভীর রাতে ট্রেনটির ছাদে দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত হন তিনি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ছিনতাইকারীরা তাকে ছুরিকাঘাত করে চলন্ত ট্রেন থেকে নিচে ফেলে দেয়। পরদিন শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সকাল ৮টার দিকে কুমিল্লার লালমাই রেলস্টেশন এলাকা থেকে পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে।
নিহত আজিজ চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার খরনা ইউনিয়নের ওয়াহিদুর পাড়া গ্রামের মৃত আবদুল আলমের ছেলে। তিনি একসময় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডে অফিসার পদে কর্মরত ছিলেন। গত বছর চাকরিচ্যুত হওয়ার পর ঢাকার একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ শুরু করেন। একই সঙ্গে, চাকরিচ্যুত ব্যাংককর্মীদের চাকরি পুনর্বহালের দাবিতে চলমান আন্দোলনে তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় সমন্বয়ক।
পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীদের দাবি, আজিজের এই আন্দোলনমূলক ভূমিকার কারণে তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। আজিজ সাম্প্রতিক সময়ে নানা হুমকি ও চাপের মধ্যেও আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, চট্টলা এক্সপ্রেস রাত আনুমানিক ৮টা ১৫ মিনিটে লাকসাম জংশনে প্রবেশ করে। কুমিল্লা ও লাকসামের মধ্যবর্তী এলাকায় ওই সময় ছিনতাইকারীদের তৎপরতা ছিল বলে জানা গেছে। দীর্ঘদিন ধরেই এই রুটে ট্রেনের ছাদে ছিনতাই ও সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে।

ট্রেনের যাত্রী ও নিহতের প্রতিবেশী খোকন জানান, ছাদে ছিনতাইয়ের সময় তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। পরে ঘুম ভেঙে জানতে পারেন, ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে কয়েকজন যাত্রী আহত হয়েছেন। তখনই ছাদে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ওই ট্রেনের যাত্রী আরিয়া আরশি জানান, লাকসাম স্টেশনে যাত্রাবিরতির পর ট্রেন ছাড়ার সময় ছাদ থেকে এক যুবক রক্তাক্ত অবস্থায় একটি বগিতে নেমে আসে। তার কান দিয়ে রক্ত ঝরছিল। যাত্রীরা তাকে সিটে বসিয়ে পানি খাওয়ান। এ সময় তার ব্যাগ তল্লাশি করে একাধিক মোবাইল ফোন ও ইসলামী ব্যাংক কর্মকর্তার একটি আইডি কার্ড পাওয়া যায়। জিজ্ঞাসাবাদে ওই যুবক দাবি করে, আইডি কার্ডটি তার ভাইয়ের। ওই সময় সন্দেহ তৈরি হলেও কেউ তাকে আটক করেনি। পরে সে নাঙ্গলকোট স্টেশনে নেমে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একটি ভিডিওতে চট্টলা এক্সপ্রেসের ছাদে যাত্রী ও ছিনতাইকারীদের দৌড়াদৌড়ির দৃশ্য দেখা যায়। আরেকটি ভিডিওতে সন্দেহভাজন ওই যুবককে দেখা যায়, যেখানে নিহত আজিজের নাম উচ্চারণ করতেও শোনা যায়।
যাত্রীরা নিশ্চিত করেছেন, সন্দেহভাজন যুবকটি নাঙ্গলকোট স্টেশনেই ট্রেন থেকে নেমে যায়। তার কাছে থাকা একটি ক্রস বডি ব্যাগ দেখতে আজিজের ব্যবহৃত ব্যাগের সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে। এসব সামগ্রী আজিজের কাছ থেকে ছিনতাইকৃত কি না, তা নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
চাকরিচ্যুত ব্যাংকারদের আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক বোরহান উদ্দিন বলেন, নাঙ্গলকোটসহ বিভিন্ন রেলওয়ে জংশনের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা এবং নিরপেক্ষ তদন্ত হলেই এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন সম্ভব। এটি নিছক ছিনতাই, নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—তা দ্রুত স্পষ্ট করা জরুরি।
রেলওয়ে পুলিশ জানায়, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। বিভিন্ন স্টেশনের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই চলছে। সন্দেহভাজনদের শনাক্তের চেষ্টা করছে পুলিশ।
লাকসাম রেলওয়ে থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মাসুদুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে।
এদিকে, ব্যাংকার আবদুল আজিজ নিহতের ঘটনায় শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় পটিয়া উপজেলা সদরের ইন্দ্রপুল এলাকায় কয়েকশত চাকরিচ্যুত ব্যাংকার ও স্থানীয় মানুষ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এ সময় বিক্ষোভকারীরা দাবি করেন, চাকরিচ্যুত ব্যাংকারদের পক্ষে কথা বলার কারণেই আবদুল আজিজকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তারা অবিলম্বে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
এমআর/এমজে