ইসিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি: অনুমতি ছাড়াই পাসপোর্ট অধিদপ্তরে গণবদলি

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পূর্বানুমতি ছাড়াই ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একযোগে বদলি ও সংযুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রচলিত নির্বাচনী আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বা বিশেষ নির্বাচনী সময়ে ইসির অনুমতি ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি করা বিধিবহির্ভূত হলেও এই আদেশে তা মানা হয়নি।
গত ১৪ জানুয়ারি ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর একটি প্রজ্ঞাপন ও পৃথক তিনটি অফিস আদেশের মাধ্যমে মোট ১৮ জন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন দপ্তরে বদলি ও সংযুক্ত করা হয়েছে।
অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পক্ষে উপপরিচালক (প্রশাসন) তারিক সালমান স্বাক্ষরিত একটি অফিস আদেশের মাধ্যমে ১১ জন কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সুপারিনটেনডেন্ট, অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক এবং ডাটা এন্ট্রি অপারেটর পদমর্যাদার কর্মীরা রয়েছেন। এছাড়া আলাদা আরও দুটি অফিস আদেশে একজন সুপারিনটেনডেন্ট ও একজন অফিস সহায়ককে বদলি করা হয়েছে।
নির্বাচনী আইন (আরপিও) অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার পর ইসির অনুমতি ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি করা নিষিদ্ধ। ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর এই বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে ১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করেছে। নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে কমিশনের লিখিত অনাপত্তি গ্রহণ বাধ্যতামূলক হলেও, এই আদেশে আইনি প্রক্রিয়ার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন দেখা গেছে, যা নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে
অন্যদিকে, অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. নূরুল আনোয়ার স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে পাঁচজন উপসহকারী পরিচালককে (ডিএডি) দেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে বদলি করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের বদলির ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের অনাপত্তি গ্রহণ বাধ্যতামূলক হলেও সংশ্লিষ্ট আদেশে এমন কোনো অনুমোদনের উল্লেখ নেই বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ডাটা অ্যান্ড পার্সোনালাইজেশন সেন্টারে সংযুক্ত উপসহকারী পরিচালক মো. আব্দুস সাত্তারকে কুমিল্লা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে এবং নরসিংদীর মো. শাহাদৎ হোসেনকে ঝালকাঠিতে বদলি করা হয়েছে। এছাড়া কুমিল্লার মো. আবুল বাসারকে ভোলায়, বান্দরবানের মোহাম্মদ আলিম উদ্দিন ভূঁঞাকে কুমিল্লায় এবং প্রধান কার্যালয়ে সংযুক্ত শশীভূষণ বিশ্বাসকে নরসিংদীর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে পদায়ন করা হয়েছে।
বদলির আদেশে ২১ জানুয়ারির মধ্যে যোগদানের কঠোর সময়সীমা দেওয়া হয়েছে, অন্যথায় কর্মকর্তারা ‘স্বয়ংক্রিয় অবমুক্ত’ বলে গণ্য হবেন। অথচ নির্বাচন কমিশন এই গণবদলি সম্পর্কে কিছুই জানে না। সংশ্লিষ্ট শাখা জানিয়েছে, অধিদপ্তর থেকে কোনো অনুমতি চাওয়া হয়নি। ইসির নজর এড়িয়ে এ ধরনের পদক্ষেপকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কমিশনকে ‘বৃদ্ধাঙ্গুলি’ দেখানোর শামিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা
অফিস আদেশের মাধ্যমে বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিস রাজশাহীর সুপারিনটেনডেন্ট মো. সাইফুল ইসলামকে প্রধান কার্যালয়ের পাসপোর্ট শাখায় এবং নীলফামারীর অফিস সহকারী সুলতানা নাসরিনকে ঢাকার উত্তরা আঞ্চলিক অফিসে বদলি করা হয়েছে।
আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, অফিস আদেশের আওতাভুক্ত কর্মচারীদের আগামী ১৯ জানুয়ারি এবং প্রজ্ঞাপনের আওতাভুক্ত কর্মকর্তাদের ২১ জানুয়ারির মধ্যে স্ব-স্ব কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে যোগদান না করলে বর্তমান কর্মস্থল থেকে তারা সরাসরি অবমুক্ত বলে গণ্য হবেন।

গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের অধ্যায় ৩-খ এর ৪৪ ঙ (২)-এর ‘নির্বাচনকালীন প্রশাসন এবং আচরণ’-এ বলা হয়েছে, নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে সরকারের কোনো বিভাগ বা অন্য কোনো সংস্থার কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জেলার বাহিরে বা মেট্রোপলিটন এলাকায় বদলি করা প্রয়োজনীয় বলে প্রতীয়মান হলে, কমিশন লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করবে এবং কমিশনের নিকট হইতে অনুরোধ প্রাপ্তির পর উক্ত বদলি কার্যকর করতে হবে।
অধিদপ্তরের পৃথক তিনটি আদেশে ৫ জন উপসহকারী পরিচালকসহ (ডিএডি) মোট ১৮ জনকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রদবদল করা হয়েছে। কুমিল্লা, ঝালকাঠি, ভোলা ও নরসিংদীর মতো আঞ্চলিক অফিসগুলোতে এই পদায়ন করা হয়। বদলিকৃতদের মধ্যে সুপারিনটেনডেন্ট ও ডাটা এন্ট্রি অপারেটরও রয়েছেন। ইসির অনাপত্তি ছাড়াই একযোগে এত বেশি কর্মকর্তার বদলি অধিদপ্তরটির অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে
নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট শাখার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জানান, পাসপোর্ট অধিদপ্তর থেকে এ ধরনের কোনো বদলির অনুমতি চাওয়া হয়নি। কমিশনের অনুমতি ছাড়া কোনো বদলি করা হলে ইসি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে থাকে, তবে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের বিষয়টি এখনও তাদের নজরে আসেনি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
নির্বাচন কমিশনের অনুমতি ব্যতীত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি কীভাবে করা হয়েছে— এমন প্রশ্নে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখার উপপরিচালক তারিক সালমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। ফাইল দেখে বলতে হবে। আপনি কিছুক্ষণ পর ফোন দেন।’ পরবর্তীতে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি আর রিসিভ করেননি।
বিষয়টি জানতে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদকে ফোন দিলে তিনিও রিসিভ করেননি।
এসআর/
