মাঘেই বসন্তের তাপ, ঢাকা থেকে কি বিদায় নিল শীত?

প্রকৃতিতে এখন চলছে মাঘ মাস (বৃহস্পতিবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২১ মাঘ)। এরপর শুরু হবে বসন্তকাল, ফাল্গুন মাস। তবে প্রকৃতিতে এরইমধ্যে বসন্তের আভাস মিলতে শুরু করেছে। ‘মাঘের শীতে বাঘ কাঁপা’র (প্রচলিত বাংলা প্রবাদ) বদলে রাজধানীবাসীর এখন সূর্যের তাপে (বিশেষ করে দুপুরে) শরীর ঘামছে।
মূলত, গত জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই শীত উধাও হয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ওলটপালট ঋতুচক্রে খোদ মাঘ মাসেই ঢাকাবাসীর গায়ে লেগেছে ‘গরমের’ তাপ। ফলে, প্রকৃতির নিয়মানুযায়ী ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত শীতের হাওয়ায় স্বস্তির পরিবর্তে, জানুয়ারির শেষ থেকেই এসি কিংবা ফ্যানের সুইচ চেপে ‘বসন্তের প্রস্তুতি’ নিতে হচ্ছে রাজধানীবাসীকে।
আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ বছর মাঘের প্রথম সপ্তাহেই দিনের তাপমাত্রা পৌঁছেছে ২৬-২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। রাতের ন্যূনতম তাপমাত্রাও ১৬-১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামতে পারছে না বেশিরভাগ দিন (এখন পর্যন্ত)। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে ঢাকায় শীতল দিনের (যখন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামে) সংখ্যা গড়ে ৩০ শতাংশ কমেছে।
এ বছর জানুয়ারিতে ঢাকার গড় তাপমাত্রা গত কয়েক বছরের গড় তাপমাত্রার চেয়ে প্রায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে যেখানে পারদ ১২-১৪ ডিগ্রিতে থাকার কথা, সেখানে চলতি সপ্তাহের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে। দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৯ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা মূলত মার্চের শেষ বা এপ্রিলের আবহাওয়ার সমতুল্য।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শীতের এই ‘ফুরিয়ে যাওয়া’ শুধু আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ব্যতিক্রম নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট ও ভয়ংকর ইঙ্গিত। কারণ, গত এক দশকে বাংলাদেশের ঋতুচক্রে যে পরিবর্তন এসেছে, তার সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে শীতকাল। তার উপর বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের যে নেতিবাচক প্রভাব, তা ঢাকার ওপর দিয়ে স্পষ্টভাবে বয়ে যাচ্ছে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় এল-নিনো পরিস্থিতির কারণে এ বছর বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। ফলে সাইবেরিয়া বা হিমালয় পাদদেশ থেকে আসা উত্তর-পশ্চিমা শীতল বায়ু বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করলেও ঢাকার উষ্ণ বলয় ভেদ করতে পারছে না। একইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতুর স্থায়িত্ব কমে আসছে। বিশেষ করে শীতকাল এখন আড়াই মাস থেকে সংকুচিত হয়ে এক মাসেরও কমে এসে ঠেকেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারির শেষার্ধ এবং ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকের তাপমাত্রা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ বছর জানুয়ারিতে ঢাকার গড় তাপমাত্রা গত কয়েক বছরের গড় তাপমাত্রার চেয়ে প্রায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে যেখানে পারদ ১২-১৪ ডিগ্রিতে থাকার কথা, সেখানে চলতি সপ্তাহের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে। দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৯ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা মূলত মার্চের শেষ বা এপ্রিলের আবহাওয়ার সমতুল্য।
কেন শীত অনুভূত হচ্ছে না?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শীতের প্রধান কারিগর হলো উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা হিমশীতল বায়ুপ্রবাহ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরে জেট স্ট্রিমের অবস্থানে পরিবর্তন আসায়, এই শীতল বাতাস সরাসরি বাংলাদেশে না ঢুকে ভারতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে অনেক সময় দিক পরিবর্তন করছে। এছাড়া বঙ্গোপসাগরে ঘনঘন সৃষ্ট লঘুচাপ ও উচ্চচাপ বলয়ের কারণে সমুদ্র থেকে জলীয় বাষ্পপূর্ণ উষ্ণ বাতাস ভূখণ্ডে ঢুকে পড়ছে। এই জলীয় বাষ্প শীতের শুষ্ক বাতাসকে বাধা দিচ্ছে, যার ফলে হালকা কুয়াশা থাকলেও বাতাসে ঠান্ডার অনুভূতি আর পাওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ আফরোজা সুলতানা ঢাকা পোস্টকে বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের শীতের তীব্রতা ক্রমেই কমে আসছে। তবে চলতি বছর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শীত আরও দ্রুত বিদায় নিয়েছে। জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়, অর্থাৎ মাঘ মাসের শুরু থেকেই শীতের অনুভূতি অনেকটাই কমতে শুরু করে। জানুয়ারির শেষ দশকে এসে ঢাকায় কার্যত শীত আর অনুভূত হয়নি।

তিনি জানান, শীত কম অনুভূত হওয়ার পেছনে একটি বড় কারণ হলো কুয়াশার পরিমাণ কমে যাওয়া। কুয়াশা কেটে গেলে সূর্যের কিরণ সহজে ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে পারে, ফলে দিনের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। এ বছর ডিসেম্বরের পর জানুয়ারি মাসের ১১ তারিখের পর থেকেই তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে ঢাকার শীত গায়েব হওয়ার পেছনে আরও বড় স্থানীয় কারণ হলো ‘আরবান হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট’ বা নগরে তাপীয় দ্বীপ প্রভাব। ঢাকা শহর এখন কেবল ইট, কাঠ আর সিমেন্টের জঙ্গল। এখানে মাটির স্পর্শ নেই বললেই চলে। বহুতল ভবন এবং পিচঢালা রাস্তা দিনের বেলা সূর্যের তাপ শোষণ করে নেয়। রাতের বেলা যখন প্রকৃতি শীতল হওয়ার কথা, তখন এই দালানকোঠাগুলো সেই জমানো তাপ পরিবেশে ছেড়ে দেয়।
এই আবহাওয়াবিদ আরও বলেন, সাধারণত ফেব্রুয়ারির দিকে তাপমাত্রা বাড়ে, তবে এ বছর সেই প্রবণতা জানুয়ারিতেই দেখা গেছে। পশ্চিমা লঘুচাপ বা ‘ওয়েস্টারলি ডিস্টার্বেন্স’ প্রতিবছর এক-দুইবার বাংলাদেশ অতিক্রম করে। চলতি বছরও এমন কয়েকটি ওয়েস্টারলি ডিস্টার্বেন্স বাংলাদেশের ওপর দিয়ে গেছে। তবে সেগুলো থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো বৃষ্টিপাত হয়নি। যদি জানুয়ারি মাসে কিছুটা বৃষ্টিপাত হতো, তাহলে তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে কম থাকত। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশের কোথাও উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়নি। একই পরিস্থিতি গত বছরও দেখা গিয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে ঢাকার শীত গায়েব হওয়ার পেছনে আরও বড় স্থানীয় কারণ হলো ‘আরবান হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট’ বা নগরে তাপীয় দ্বীপ প্রভাব। ঢাকা শহর এখন কেবল ইট, কাঠ আর সিমেন্টের জঙ্গল। এখানে মাটির স্পর্শ নেই বললেই চলে। বহুতল ভবন এবং পিচঢালা রাস্তা দিনের বেলা সূর্যের তাপ শোষণ করে নেয়। রাতের বেলা যখন প্রকৃতি শীতল হওয়ার কথা, তখন এই দালানকোঠাগুলো সেই জমানো তাপ পরিবেশে ছেড়ে দেয়। ফলে গ্রামীণ জনপদে শীত থাকলেও ঢাকা শহরের ওপর একটি উষ্ণ গ্যাসের আস্তরণ তৈরি হয়ে থাকে। এর ওপর যোগ হয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং জলাশয় ভরাট। গত দুই দশকে ঢাকা শহরের প্রায় ৮০ শতাংশ জলাভূমি ও গাছপালা হারিয়ে গেছে, যা শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ‘ন্যাচারাল কুলিং সিস্টেম’ হিসেবে কাজ করত।
এমন অবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে বলে মনে করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের চেয়ারম্যান ড. কাজী মো. ফজলুল হক। ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, ঢাকাসহ বাংলাদেশে জলবায়ুগত পরিবর্তনের যে প্রভাব পড়ছে, তা মোকাবিলা করা এই মুহূর্তে অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে পুরোপুরি অসম্ভব না হলেও এটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। এ পরিস্থিতিতে কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, তা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা প্রয়োজন।
ড. ফজলুল হক আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উঠে আসে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়টি। যেসব কারণে কার্বন নিঃসরণ বাড়ছে, সেগুলো কমিয়ে আনতে হবে। যদিও বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিল্পায়ন, ম্যানুফ্যাকচারিং ও উন্নয়ন কার্যক্রমের ফলে কার্বন নিঃসরণ তুলনামূলকভাবে কম, তবুও জলবায়ু পরিবর্তন যেহেতু একটি বৈশ্বিক সমস্যা, এর প্রভাব আমাদের ওপরও পড়ে।
সব স্তর থেকে কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রসহ সব পর্যায়েই দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে, যাতে আমাদের দেশে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা কম রাখা যায় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব কিছুটা হলেও মোকাবিলা করা সম্ভব হয়।

ভয়াবহ পরিসংখ্যান : ৩৬.৬ মিলিয়ন মানুষ, গাছ মাত্র ১.৩ মিলিয়ন
বন অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকায় বর্তমানে প্রায় ৩৬ দশমিক ৬ মিলিয়ন মানুষের (৩.৬৬ কোটি) বিপরীতে গাছ রয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন (১৩ লাখ)। অর্থাৎ, গড়ে প্রতি ২৮ জন মানুষের জন্য গাছ রয়েছে মাত্র একটি, যা পরিবেশগত ভারসাম্যের তুলনায় নগণ্য।
বন অধিদপ্তরের উপপ্রধান বন সংরক্ষক মো. জাহিদুল কবির এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, একজন মানুষের দৈনিক অন্তত ৫৫০ লিটার অক্সিজেনের প্রয়োজন, যা নিশ্চিত করতে তিনটি পূর্ণবয়স্ক গাছ লাগে। কিন্তু ঢাকায় ২৮ জনের জন্য আছে মাত্র একটি গাছ। আমরা এক ভয়াবহ অক্সিজেন সংকটের দিকে এগোচ্ছি।
তিনি আরও জানান, একটি শহরের অন্তত ২০ শতাংশ সবুজ এলাকা থাকা প্রয়োজন হলেও দুই সিটি কর্পোরেশন মিলিয়ে ঢাকায় আছে মাত্র ১০ শতাংশের সামান্য বেশি। রাশিয়ার মতো দেশে যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে মাত্র ৯ জন বাস করে, সেখানে বাংলাদেশে এই সংখ্যা ১ হাজার ২০০ জন। এমন ঘনবসতিপূর্ণ দেশে বনায়নই একমাত্র স্বল্পব্যয়ী প্রাকৃতিক সমাধান। তাই জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় অবিলম্বে বনায়ন বাড়ানোর বিকল্প নেই বলে সতর্ক করেন এই কর্মকর্তা।
আরএইচটি/জেডএস
