ডিজিএমকে চিঠি দিয়ে শ্রমিকদের ১৫ লাখ টাকা ‘চাঁদা’ আদায়, নেপথ্যে কী?

যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের (জেওসিএল) বাৎসরিক লভ্যাংশ থেকে শ্রমিকপ্রতি পাঁচ হাজার টাকা করে কেটে রাখার অভিযোগ উঠেছে সিবিএ নেতাদের বিরুদ্ধে। কোনো ধরনের পূর্বানুমতি ছাড়াই প্রায় ৩০০ শ্রমিকের লভ্যাংশ থেকে অন্তত ১৫ লাখ টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। সাধারণ শ্রমিকদের অভিযোগ, কারাবন্দি সিবিএ নেতাদের আইনি খরচ মেটাতেই এই ‘বিশেষ চাঁদা’ আদায় করা হয়েছে।
জানা যায়, কোম্পানির বাৎসরিক লভ্যাংশ থেকে প্রতি বছর একটি অংশ পান যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের (জেওসিএল) কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এখান থেকে শ্রমিকপ্রতি পাঁচ হাজার টাকা করে কেটে রাখার জন্য কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয় যমুনা অয়েল কোম্পানি লেবার ইউনিয়ন (সিবিএ)। গত ২৯ জানুয়ারি সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) মো. নাসির উদ্দিন কোম্পানির উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম ফাইন্যান্স) মেজবাহ উদ্দিনকে উদ্দেশ্য করে এ চিঠি দেন। এরপরই শ্রমিকপ্রতি (সিকিউরিটিসহ) পাঁচ হাজার টাকা কেটে গত রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) লভ্যাংশ বিতরণ করে জেওসিএল।
শ্রমিকদের অসন্তোষ, নেপথ্যে কী
বিষয়টি নিয়ে শ্রমিকদের কেউ কেউ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, প্রতি মাসে নিয়মিত চাঁদা আদায় করে সিবিএ। এরপরও বাৎসরিক লভ্যাংশ থেকে নেতারা কোনো কারণ ছাড়াই পাঁচ হাজার টাকা কেটে নিয়েছেন। এক্ষেত্রে তাদের অনুমতি নেওয়া হয়নি। কী কারণে হঠাৎ বিশেষ চাঁদা আদায় করা হয়েছে তাও স্পষ্ট করা হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, যমুনা অয়েল সিবিএর অধীনে শ্রমিক, কর্মচারী ও সিকিউরিটি মিলিয়ে তিন শতাধিক সদস্য রয়েছেন। এই হিসাবে অন্তত ১৫ লাখ টাকা আদায় করেছে সিবিএ। শ্রমিকদের কয়েকজন জানান, নাশকতা মামলায় কারাগারে রয়েছেন যমুনা অয়েল কোম্পানির শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি মো. আবুল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ এয়াকুব। তাদের জামিনে খরচের জন্য ফান্ড করতে শ্রমিকদের কাছ থেকে এই টাকা আদায় করা হয়েছে।
তবে, সিবিএর বর্তমান নেতারা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, শ্রমিকদের মৌখিক সম্মতি নিয়েই এই টাকা আদায় করা হয়েছে। সংগঠনের অ্যাকাউন্টে তা জমা হবে। এরপর সবার সম্মতিতে সদস্যদের কল্যাণে এই টাকা ব্যয় হবে। অতীতে এভাবে চিঠি দিয়ে বিশেষ চাঁদা আদায় করা হয়। এছাড়া শুধু শ্রমিকদের নয়, অফিসারদের সংগঠনও এভাবে টাকা আদায় করে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অফিসারদের সংগঠন প্রতিটি সদস্যের লিখিত অনুমতি নিয়েই চাঁদা আদায় করে।
যমুনা অয়েল কোম্পানির টার্মিনালে কর্মরত গেজার শরাফত দৌলা চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘বছরে কোম্পানির লভ্যাংশ থেকে আমরা টাকা পাই। সেখান থেকে এবার পাঁচ হাজার টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের বিষয়টি জানানো হয়নি। আমার অনুমতি ছাড়া কর্তৃপক্ষ এভাবে টাকা কেটে নিতে পারে না। যতটুকু শুনেছি, সিবিএর দুই নেতা নাশকতা মামলায় কারাগারে রয়েছেন। তাদের মুক্ত করতে এ টাকা ব্যয় করা হবে।’
অভিযোগ অস্বীকার, শ্রমিকদের কল্যাণেই ব্যয় হবে টাকা
এ বিষয়ে যমুনা অয়েল কোম্পানির লেবার ইউনিয়নের (সিবিএ) সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) মো. নাসির উদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক নিয়ম মেনে ডিজিএমকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় করতে এসব টাকা আদায় করা হয়েছে। কোনো নেতার মামলা চালানোর জন্য নয়। এ বিষয়ে আমাদের মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এরপর ডিজিএমকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এসব টাকা সংগঠনের অ্যাকাউন্টে জমা হবে। এরপর সিবিএর মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির সই নিয়ে টাকাগুলো উত্তোলন করা যাবে। এখানে এককভাবে টাকা ব্যয় করার সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, কোম্পানি থেকে লভ্যাংশ বিতরণ করা হয়। একেকজন প্রায় ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা লভ্যাংশ পান। সেখান থেকে সংগঠনের জন্য পাঁচ হাজার টাকা আদায় কোনো বিষয় নয়। গত বছর নেওয়া হয়নি। এ বছর সংগঠনের প্রয়োজনে নেওয়া হয়েছে।

এটা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় : ডিজিএম
জানতে চাইলে যমুনা অয়েলের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম, ফাইন্যান্স) মেজবাহ উদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, শ্রমিকদের এটা নিবন্ধিত সংগঠন। সমিতির নেতারা প্যাডে টাকা কেটে রাখতে চিঠি দিয়েছেন। অতীতেও আমরা এটা করেছি। সংগঠনের অ্যাকাউন্টে জমা দিয়েছি। এখানে তাদের কোনো সদস্যের আপত্তি থাকলে, সেটা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়।
নেপথ্যে কারাবন্দি নেতাদের মামলা?
জানা যায়, গত বছরের ২০ জুলাই নগরের ইপিজেড থানার সিমেন্ট ক্রসিং এলাকা থেকে যমুনা অয়েল কোম্পানির শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি মো. আবুল হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন চলাকালে সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
একই বছরের ১২ ডিসেম্বর নগরের ডবলমুরিং থানার আগ্রাবাদ এলাকা থেকে যমুনা অয়েল কোম্পানির শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ এয়াকুবকে গ্রেপ্তার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাকেও জুলাই-আগস্টের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠান আদালত। বর্তমানে দুজনেই কারাগারে রয়েছেন।
যমুনা অয়েলের কর্মকর্তারা জানান, ফৌজদারি অপরাধ কিংবা দুর্নীতির কারণে কোনো সরকারি কর্মচারী কারাগারে যাওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্ত হন। কিন্তু প্রভাবশালী এই দুই নেতার ক্ষেত্রে তা হয়নি। দুজনকে এখনও কাগজে-কলমে বহিষ্কার করা হয়নি।
জানা গেছে, যমুনা অয়েলের আলোচিত নেতা মুহাম্মদ এয়াকুব ১৯৯৭ সালে যমুনা অয়েলে ৯৩৫ টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেন। পদোন্নতির পর এখন সবমিলিয়ে বেতন পান ৮৫ হাজার ১০০ টাকা। ২০০৯ সালে কোম্পানির লেবার ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন তিনি। এক বছর পর সাধারণ সম্পাদক হন। সেই থেকে তিনি এই পদে রয়েছেন। গত দেড় দশক এটি ছিল শ্রমিক লীগের সংগঠন।
অন্যদিকে দুদক সূত্রে জানা গেছে, অঢেল সম্পদের মালিক এয়াকুবের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করছে সংস্থাটি। তাদের প্রাথমিক তদন্তে এয়াকুবের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে।
এমআর/
