পল্লবীতে চার মৃত্যুর রহস্যজট এখনো খোলেনি, অন্ধকারে পুলিশ

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে একই পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় রহস্য দানা বাঁধছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে নিজ বাসা থেকে দুই শিশু সন্তানসহ স্বামী-স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনো অন্ধকারে পুলিশ ও স্বজনরা। ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও চার মৃত্যুর রহস্যজট এখনো খোলেনি।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, মাসুম তার স্ত্রী ও সন্তানদের হত্যার পর নিজেই গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে নিহত ফাতেমা আক্তার সুমির বড় ভাই নজরুল ইসলাম বলেন, গত ১৫ বছর আগে আমার বোন সুমির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে মাসুমের বিয়ে হয়। আমার বোনের দুই ছেলে ও এক মেয়ে ছিল। গতকাল আমরা খবর পাই আমার বোন, বোনজামাই ও দুই ভাগ্নে মারা গেছে।
তিনি বলেন, আমার বোনজামাই একটু অলস প্রকৃতির ছিল। সে পেশায় একজন অটো রিকশাচালক এবং বোন বাসা-বাড়িতে কাজ করত। তাদের সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকত। তবে মাসুম পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত; কোনো ধরনের অন্যায় বা বাজে কাজে সে লিপ্ত ছিল না। তার একটি ঋণ ছিল, আমার বোন বিষয়টি জানালে আমরা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে তাকে ২৫ হাজার টাকা দিই সেই ঋণ শোধ করার জন্য। বর্তমানে তার কোনো ঋণ ছিল না। ৫০০ টাকা জমা দিয়ে প্রতিদিন ভাড়ায় অটো রিকশা চালাত। তবে অটোরিকশা চালিয়ে তেমন আয় করতে পারত না।
তিনি আরও বলেন, আমার বোনের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিন বছর আগে তাদের চোরাই পথে বড় ভাগ্নি মাহফুজাসহ তার বাবা-মাকে ভারতে পাঠাই। সেখানে আমার ভাগ্নে মিনহাজের জন্ম হয়। অনেক টাকা খরচ করে সেখানে তাদের আধার কার্ডসহ অন্যান্য কাগজপত্র তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পরেই তারা আবার দেশে চলে আসার কথা বলে। পরে তাদের আবারও অবৈধভাবে দেশে নিয়ে আসা হয়। এখন পর্যন্ত কী কারণে আমার দুই ভাগ্নে এবং আমার বোনকে হত্যা করে সে নিজে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে, তার কোনো মোটিভ খুঁজে পাইনি।
মাসুমের ফুফাতো ভাই মান্না বলেন, আমার ফুফাতো ভাই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত এবং কোনোভাবে তার সংসার চালাত। বিহারী ক্যাম্পে সে পরিবার নিয়ে থাকত। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে মাসুম ছিল সবার ছোট। সকাল দশটার দিকে তার ভাবি তাকে বাথরুমে ঢুকতে দেখেন। এরপর দুপুর ১২টার দিকে তার বড় মেয়ে মাহফুজা বাসায় এসে দেখে তার বাবা গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে আছে। তার দুই ভাই ও মা পাশে পড়ে আছে। তাদের সংসারে অভাব-অনটন ছিল, কিন্তু অন্য কোনো ঋণের ব্যাপারে আমরা কিছুই জানি না। আমার ফুফাতো ভাই মাসুম তার সন্তান ও স্ত্রীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে নিজেই আত্মহত্যা করেছে। তবে কী কারণে সে এই ঘটনাটি ঘটিয়েছে, তা আমরা এখনও জানতে পারিনি।
মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদনকারী উপ-পরিদর্শক (এসআই) ইব্রাহিম খলিল জানান, পল্লবীর এই ঘটনায় চারজনের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়েছিল। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, মাসুম তার দুই সন্তান ও স্ত্রীকে হত্যার পর নিজেই আত্মহত্যা করেছে। তবে এখন পর্যন্ত এই ঘটনার পেছনের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ আমরা জানতে পারিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম আলমগীর জাহান বলেন, প্রাথমিক তদন্তে এখন পর্যন্ত এই ঘটনার কোনো ক্লু পাওয়া যায়নি। মাসুম এবং তার পরিবারের সম্বন্ধে খোঁজ নিয়ে খারাপ কিছু মেলেনি। ধারণা করা হচ্ছে, প্রথমে তার দুই সন্তান ও স্ত্রীকে হত্যা করে সে নিজে আত্মহত্যা করেছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পেলে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১টায় পল্লবীর ১১ নম্বর বিহারী ক্যাম্পের ওয়াপদা ৩ নম্বর ভবন এলাকা থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন— মোহাম্মদ মাসুম (৩৫), তার স্ত্রী ফাতেমা আক্তার সুমি (৩০), ৪ বছর বয়সী ছেলে মিনহাজ ও ২ বছর বয়সী ছোট ছেলে আসাদ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের (পল্লবী) বি-ব্লকের ৩ নম্বর ওয়াপদা ভবন বিহারি ক্যাম্পে তাদের লাশ পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে কোনো এক সময় তাদের মৃত্যু হয়েছে।
এসএএ/এমএসএ
