২৭ হাজার ৫৯ অগ্নিদুর্ঘটনার বড় কারণ বৈদ্যুতিক গোলযোগ-সিগারেট!

২০২৫ সালে সারাদেশে ২৭ হাজার ৫৯টি এবং দিনে গড়ে ৭৫টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে। গড়ে প্রতিদিন ৭৫টি। এসব আগুনে আহত হয়েছেন ২৬৭ জন, নিহত হয়েছে ৮৫ জন।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, সবচেয়ে বেশি আগুন বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে। এরপরই বিড়ি-সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরা, চুলা এবং গ্যাস সিলিন্ডার ও সরবরাহ লাইন লিকেজের কারণে আগুনের ঘটনা বেশি ঘটেছে।
সারাদেশে এই অগ্নিকাণ্ডে ৫৬৯ কোটি ৯৭ লাখ ৭ হাজার ৮৬৪ টাকার সম্পদের ক্ষতি হয় এবং ফায়ার সার্ভিস আগুন নির্বাপণের মাধ্যমে ৩ হাজার ২৬৩ কোটি ৬২ লাখ ১ হাজার ৯১৬ টাকার সম্পদ রক্ষা সম্ভব হয়েছে। এদিকে আগুন নির্বাপণের সময় ১৭ জন বিভাগীয় কর্মী আহত এবং ৩ জন নিহত হন।
বার্ষিক প্রতিবেদন তুলে ধরে এতথ্য জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর।
ফায়ার সার্ভিসের কারণ ভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২৭ হাজার ৫৯টি আগুনের মধ্যে বৈদ্যুতিক গোলযোগে ৯ হাজার ৩৯২টি (৩৪.৭১%), বিড়ি-সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরা থেকে ৪ হাজার ২৬৯টি (১৫.৭৮%), চুলা থেকে ২ হাজার ৯০৯টি (১০.৭৫%), গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে ৯২০টি (৩.৪০%), গ্যাস সরবরাহ লাইন লিকেজ থেকে ৫৬২টি (২.০৮%), গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে ১২১টি (০.৪৫%), কেমিক্যাল বা রাসায়নিক দুর্ঘটনা থেকে ৩৮টি (০.১৪%), ছোটদের আগুন নিয়ে খেলার কারণে ৬০৮টি (২.২৫%), উত্তপ্ত ছাই থেকে ৩৫৬টি (১.৩২%), কয়েল থেকে ৪৯৩টি (১.৮২%) এবং আতশ বাজি/ফানুস/পটকা পোড়ানো থেকে ১০৯টি (০.৪০%) আগুনের ঘটনা ঘটে।
সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি ভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে বাসাবাড়ি/আবাসিক ভবনে সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। সারাদেশে বাসা বাড়িতে মোট ৮ হাজার ৭০৫টি আগুন লাগে, যা মোট আগুনের ৩২.১৭ শতাংশ।
এছাড়া খড়ের গাঁদায় ৩ হাজার ৯২২টি (১৪.৪৯%), দোকানে ১ হাজার ৮০০টি, হাট বাজারে ১০৬৭টি, শপিং মলে ৬১৭টি, পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানে ৬৬৫টি, পোশাক শিল্প ব্যতীত কলকারখানায় ৬১৫টি, গ্যাস সিলিন্ডার দোকানে ৪৮৩টি, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে ১২২টি, বহুতল ভবনের আগুন (৬ তলার উপরে) ৭১টি, রেস্টুরেন্ট ও হোটেলে ১৫৫টি, সরকারি প্রতিষ্ঠানে ১৫২টি, সরকারি হাসপাতালে ৩৪টি, বেসরকারি হাসপাতালে ২৫টি, ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ৭২টি, পাট গুদাম-পাটকলে ১২২টি, কেমিকেল গোডাউন/দোকানে ৩৬টি, বস্তিতে ৯১টি, মসজিদে ২৫টি, মন্দিরে ৯টি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১২৩টি এবং এসিতে ৬২টি আগুনের ঘটনা ঘটে।
পরিবহনে আগুনের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে সারাদেশে বাসে ১৫৩টি, বাস বাদে অন্যান্য যানবাহনে ২১৬টি, ট্রেনে ১০টি, লঞ্চে ৪টি, জাহাজে ২টি এবং ১টি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
মাসভিত্তিক অগ্নিকাণ্ডের পরিসংখ্যানে জানা যায়, ২০২৫ সালে ডিসেম্বর (২৭২৪টি), জানুয়ারি (২৭০৮টি) ফেব্রুয়ারি (২৮৮৫টি), মার্চ (৩৫২২টি), এপ্রিল (৩০৩৫টি) এই চার মাসে বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এই চার মাসে গড়ে প্রতিদিন ১২৩টি করে আগুন লেগেছে। এছাড়া নভেম্বর মাসে ২২৩৭টি, মে মাসে ২২০৯টি আগুন লাগে।
এছাড়া অগ্নিকাণ্ডে আহত-নিহতদের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আহত ও নিহতদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি। সারাদেশে ২৬৭ জন আহতের মধ্যে পুরুষ ১৯৭ ও নারী ৭০ জন এবং নিহত ৮৫ জনের মধ্যে ৪৬ জন পুরুষ ও ৩৯ জন নারী।
এছাড়া আহত ও নিহত হওয়ার ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাসা-বাড়ি/আবাসিক ভবনে (আহত ৭৭, নিহত ২২), রাসায়নিক দুর্ঘটনায় (আহত ২, নিহত ১৮) এবং বিমানের অগ্নিদুর্ঘটনায় (আহত ১১৬, নিহত ৩৫) সবচেয়ে বেশি হতাহত হয়েছেন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ২০২৫ সালে সারাদেশে ১০৭১টি ডুবুরি কার্যক্রমের মাধ্যমে ৭০ জন আহত ও ৫৮৫ জন নিহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করে। এছাড়া ফায়ার সার্ভিস ২০২৫ সালে ২৯৬টি পশু, ৩০টি পাখি ও ২২৯টি প্রাণি উদ্ধার করে।
২০২৫ সালে সারাদেশে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ১০ হাজার ১৪০টি দুর্ঘটনায় উদ্ধার কাজ পরিচালনা করে ১০ হাজার ৩৩৩ জন আহত এবং ১ হাজার ৭৫৬ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করে। এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ২৬৬ জন আহত এবং ১ হাজার ৩৮ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস।
২০২৫ সালে ফায়ার সার্ভিস ৭৮১৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় উদ্ধার কাজে অংশগ্রহণ করে। এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ১২৩৯টি বাস, ১০৮৯টি ট্রাক, ১৭৩২টি মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় পতিত হয়। এর মধ্যে বাস দুর্ঘটনায় ১৯৩৪ জন আহত ও ২৮৯ জন নিহত হন এবং মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২১৯০ জন আহত ও ১৯৩ জন নিহত হন।
অগ্নিনিরাপত্তা জরিপের আওতায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃক ২০২৫ সালে ১০৫৩৩টি ভবন পরিদর্শন করা হয়। এই ভবন পরিদর্শনে দেখা যায়, ৩৩১৬টি ভবন অগ্নিনিরাপত্তার দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ, ৬২২টি ভবন অতি ঝুঁকিপূর্ণ ও ৬৫৯৫টি ভবন সন্তোষজনক মানে রয়েছে।
সারাদেশে অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ২০২৫ সালে ১৯২টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে। এই মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ১৭৯টি প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ৯৪ লাখ ৫২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া ৮টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
অগ্নিদুর্ঘটনা কমানোর জন্য সারাদেশে জনগণকে সচেতন করতে ফায়ার সার্ভিস ২০২৫ সালে ১৫৮৬৫টি মহড়া, ২০৭৮টি সার্ভে, ১৪৯৮৭টি গণসংযোগ ও ৩৭২২টি ফায়ার ড্রিল করেছে। পাশাপাশি সারাদেশে অগ্নিদুর্ঘটনায় করণীয় বিষয়ে ৪ হাজার ৩৪৫টি প্রশিক্ষণের মাধ্যেমে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৮০০ জনকে মৌলিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর বাইরে ২০২৫ সালে শুধু পোশাক শিল্প কারখানায় ২ দিনব্যাপী ৩৯২১টি প্রশিক্ষণ কোর্সের মাধ্যমে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮৪০ জন পোশাক শ্রমিককে অগ্নিদুর্ঘটনায় করণীয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
এছাড়া ২ দিনব্যাপী ১১টি কোর্সের মাধ্যমে ৪২০ জন নতুন আরবান কমিউনিটি ভলান্টিয়ার তৈরি করা হয়েছে, যার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৩ জন শিক্ষার্থীও রয়েছেন। এছাড়া ৩৩টি কোর্সের মাধ্যমে ১০৩৯ জন ভলান্টিয়ারকে সতেজকরণ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
জেইউ/এসএম