গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয় : কী কী পরিবর্তন আসছে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গতকাল অনুষ্ঠিত হওয়া ঐতিহাসিক গণভোটে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে তাদের রায় দিয়েছে। আজ শুক্রবার নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, বিপুল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়যুক্ত হয়েছে। এর ফলে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর আওতায় সংবিধানের ৪৮টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পথ চূড়ান্তভাবে উন্মোচিত হলো।
একনজরে গণভোটের ফলাফল
• মোট ভোটার : ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি।
• ভোট প্রদানের হার : ৬০.২৬ শতাংশ।
• ‘হ্যাঁ’ ভোট : ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি।
• ‘না’ ভোট : ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি।
কী কী পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে
গণভোটে জনগণের এই সম্মতির ফলে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় বেশকিছু বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। সেগুলো হলো—
১. ক্ষমতার ভারসাম্য
এতদিন বলা হতো, ‘বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা আসমানের সমান।’ এখন আর তা থাকছে না। নতুন সংস্কারে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কিছুটা কমিয়ে রাষ্ট্রপতির হাতে ভারসাম্য দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, এখন থেকে আর একজন ব্যক্তি চাইলেই যা খুশি তা করতে পারবেন না; তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আসতে হবে।
২. দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ
আমাদের সংসদ এখন থেকে দোতলা বাড়ির মতো হবে! নিচে থাকবে ‘নিম্নকক্ষ’, যারা আমাদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। ওপরে থাকবে ‘উচ্চকক্ষ’। উচ্চকক্ষ দেশের নামকরা বুদ্ধিজীবী, বিজ্ঞানী, শিল্পী এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত হবে। ফলে যেকোনো আইন পাস হওয়ার আগে দুবার যাচাই করা হবে, যাতে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর চেপে না বসে।
৩. স্বৈরতন্ত্রের কবর: ‘৭০ অনুচ্ছেদ’ সংশোধন
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে আগে কোনো এমপি তার দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিতে পারতেন না। এতে সংসদ হয়ে পড়েছিল দলের হাতের পুতুল। এখন এই আইন শিথিল হচ্ছে। ফলে আপনার এলাকার এমপি সংসদে দলের কথা নয়, বরং আপনার (জনগণের) চাহিদার কথা মাথায় রেখে স্বাধীনভাবে কথা বলতে ও ভোট দিতে পারবেন।
৪. সাংবিধানিক পদে নিয়োগে স্বচ্ছতা: কমবে ‘আমলানির্ভরতা’
নির্বাচন কমিশন বা দুদকের মতো বড় বড় পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে আর সরকারের পছন্দের লোক বসানো সহজ হবে না। একটি নিরপেক্ষ সার্চ কমিটি বা সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে দেশের সবচেয়ে যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে এসব পদে নিয়োগ দেওয়া হবে।
৫. মৌলিক অধিকার এখন আরও শক্তিশালী
বাকস্বাধীনতা, ইন্টারনেটে মানুষের অধিকার এবং সভা-সমাবেশ করার অধিকারগুলো এখন সংবিধানে আরও দৃঢ়ভাবে সুরক্ষিত হবে। কোনো সরকারই হুট করে আইন করে মানুষের মুখ চেপে ধরতে পারবে না।
সংবিধানের বিতর্কিত ৭০ অনুচ্ছেদের ছায়া থেকে বেরিয়ে সংসদ সদস্যরা সংসদে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করবেন।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, একটি তুলনামূলক চিত্র
১. ভারত (লোকসভা ও রাজ্যসভা)
ভারতে সংসদ দুটি কক্ষ নিয়ে গঠিত। একটি লোকসভা (নিম্নকক্ষ), অপরটি রাজ্যসভা (উচ্চকক্ষ)।
লোকসভা (নিম্নকক্ষ) : এটি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সভা (৫৪৩ জন)। সরকারের মূল চালিকাশক্তি এখানেই থাকে। প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভা সরাসরি লোকসভার কাছে দায়বদ্ধ।
রাজ্যসভা (উচ্চকক্ষ) : এটি রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে। এই কক্ষের সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নয়, বরং রাজ্য বিধানসভার সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। রাজ্যসভা একটি স্থায়ী কক্ষ; এটি কখনও বিলুপ্ত হয় না।
কাজ করার ধরন : যেকোনো সাধারণ আইন পাসের জন্য দুই কক্ষেরই অনুমোদন লাগে। তবে অর্থবিল পাসের ক্ষেত্রে লোকসভা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। যদি কোনো সাধারণ বিল নিয়ে দুই কক্ষের মধ্যে মতবিরোধ হয়, তবে রাষ্ট্রপতির আহ্বানে যৌথ অধিবেশনের মাধ্যমে ফয়সালা হয়।
২. পাকিস্তান (ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ও সিনেট)
পাকিস্তানের সংসদীয় কাঠামোও ভারতের মতোই। এটিও দুটি কক্ষ নিয়ে গঠিত। ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি (নিম্নকক্ষ) ও সিনেট (উচ্চকক্ষ)।
ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি (নিম্নকক্ষ) : এটি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কক্ষ।
সিনেট (উচ্চকক্ষ) : সিনেটে পাকিস্তানের প্রতিটি প্রদেশ থেকে সমান সংখ্যক সদস্য থাকেন (যেমন- প্রতিটি প্রদেশ থেকে ২৩ জন)। এর মূল উদ্দেশ্য হলো যাতে জনসংখ্যায় বড় প্রদেশগুলো (যেমন- পাঞ্জাব) ছোট প্রদেশগুলোর (যেমন- বেলুচিস্তান) ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে।
কাজ করার ধরন : ফেডারেল ইউনিটের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে সিনেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোনো বিল সিনেটে পাস না হলে তা আইনে পরিণত হতে সমস্যায় পড়ে।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের যে অঙ্গীকার করেছিল, এই গণভোট তারই চূড়ান্ত প্রতিফলন। প্রায় ৩০টি রাজনৈতিক দলের সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ যে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছিল (জুলাই জাতীয় সনদ), তার মধ্যে সংবিধান সংশ্লিষ্ট ৪৮টি প্রস্তাবই ছিল এই গণভোটের মূল বিষয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ কেবল নেতা পরিবর্তন নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী পদ্ধতিগত পরিবর্তনের পক্ষে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এই রায়ের মাধ্যমে একটি নতুন ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হতে যাচ্ছে।
এমএআর/