ইফতারের ‘নতুন রাজধানী’ বেইলি রোড, ভাঙছে চকবাজারের একচেটিয়া আধিপত্য

ঢাকার ইফতার সংস্কৃতির বহু বছরের চেনা মানচিত্র বদলে দিচ্ছে বেইলি রোড। এক সময় ইফতারি মানেই পুরান ঢাকার চকবাজারের একচেটিয়া আধিপত্য থাকলেও, এখন রুচি ও আভিজাত্যের লড়াইয়ে সমানে সমান পাল্লা দিচ্ছে বেইলি রোড। স্বাস্থ্য সচেতনতা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ আর ঐতিহ্যবাহী খাবারের আধুনিক পরিবেশনায় বেইলি রোড এখন ভোজনরসিকদের কাছে ইফতারের ‘নতুন রাজধানী’। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে হালিম, রোস্ট আর রেজালার সুবাসে মাতোয়ারা ক্রেতারা ভিড় করছেন এখানে, যার ফলে ঐতিহ্য আর আধুনিকতার এক মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে এই ইফতার বাজারে।
ক্রেতাদের এমন চাহিদাকে সামনে রেখে রাজধানীর বেইলি রোড এখন উঠে এসেছে ইফতারের ‘নতুন রাজধানী’ হিসেবে। অনেকেই বলছেন, বেইলি রোডের ইফতার বাজারের কারণে রাজধানীর পুরান ঢাকার ইফতার বাজারের একচেটিয়া প্রভাব ভাঙছে।
শুক্রবার, রমজানের ৯ম দিন। প্রতিবারের মতো এবারও বেইলি রোডের বিভিন্ন হোটেল ও খাবারের দোকানে সাজানো হয়েছে অভিজাত ও বৈচিত্র্যময় ইফতারি সামগ্রী। চিকেন কাবাব, হালিম, ফালুদা, দই বড়া, ফিরনি, পরোটা, রোল, কাটলেটসহ নানা আইটেমের সারি ক্রেতাদের দৃষ্টি কাড়ছে। এদিকে দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামতেই বেইলি রোডের ফুটপাত ও রেস্তোরাঁর সামনের অংশে ভিড় বাড়তে থাকে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, হালিম, খাসির রোস্ট, গরুর রেজালা, মোরগ পোলাও, কাবাব, রোল- সব মিলিয়ে এখানে তৈরি হয়েছে ঢাকার খাদ্যসংস্কৃতির আলাদা এক সুর ও সংস্কৃতি। দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছুটির দিনের কারণে আজ বিক্রি তুলনামূলক বেশি। বিকেলের পর থেকেই ক্রেতার চাপ বাড়তে থাকে, আর ইফতারের এক ঘণ্টা আগে বেচাকেনাও থাকে বেশি। ইফতারের এক ঘণ্টা আগে পরিস্থিতি এমন হয় যে, অনেককে সিরিয়াল ধরে দাঁড়াতে হয়। ৫-৭ রমজানের পর থেকেই মূলত এই চাপটা বাড়তে শুরু করে।

মানুষ এখন শুধু স্বাদ নয়, নিরাপত্তাও দেখে
নবাবী ভোজ–এর সত্তাধিকারী কামরুল হাসান চৌধুরী দীর্ঘ সময় ধরে কথা হয় ঢাকা পোস্টের। তিনি বলেন, আমরা আসলে নতুন কিছু করছি না। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী আইটেমগুলোই দিচ্ছি। কিন্তু পার্থক্যটা হচ্ছে পরিবেশ আর পরিবেশনা। এখানে আস্ত খাসির রোস্ট, আস্ত মুরগির রোস্ট, লেগ রোস্ট, বিভিন্ন ধরনের রেশমি কাবাব, শাহী জিলাপি, বোম্বে জিলাপি, সবকিছু রেস্টুরেন্টের ভেতরে প্রস্তুত হয়। পেস্তা বাদামের শরবত, তরমুজের শরবত, বালুশাহী, মধুশাহী- এসবও নিয়মিত তৈরি হয়।
তিনি বলেন, মানুষ এখন শুধু স্বাদ নয়, নিরাপত্তাও দেখে। খোলা আকাশের নিচে খাবার থাকলে ধুলোবালি বা দূষণের ঝুঁকি থাকে। এখানে আমরা রান্না থেকে পরিবেশন- সবকিছু নিয়ন্ত্রিতভাবে করি। গরম খাবার গরমই দিচ্ছি। অনেকেই বিশেষভাবে বলেন, ‘ভাই, গরমটা যেন থাকে।’ আমরা সেটাই নিশ্চিত করার চেষ্টা করি।

দামের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেকে বলেন দাম বেশি। কিন্তু ভালো মানের মাংস, ঘি, মসলা- সবকিছুর দাম বেড়েছে। আমরা কোয়ালিটি কমাইনি। বরং মান ধরে রাখতে চেষ্টা করছি। ক্রেতারাও সেটা বোঝেন বলেই বারবার ফিরে আসেন।
তিনি বলেন, আগে মানুষ বলত ইফতার মানেই চকবাজার। এখন অনেকে বলেন, একবার বেইলি রোড ঘুরে দেখি। এই পরিবর্তনটাই বড় কথা।
বেইলি রোড এলাকায় মায়ের সঙ্গে ইফতার কিনতে এসেছেন রাকিবুল ইসলাম। প্রথবার এই এলাকার ইফতার কেনার অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, আমার ছোটবেলা কেটেছে পুরান ঢাকার ইফতারের গল্প শুনে। বাবার সঙ্গে কয়েকবার চকবাজারেও গেছি। সেখানে একটা উৎসবমুখর পরিবেশ থাকে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এখন ঢাকার অবস্থা আলাদা। যানজট, ভিড়- সব মিলিয়ে সেখানে যাওয়া সময়সাপেক্ষ। এখানে আসলে অন্তত স্বস্তিতে দাঁড়ানো যায়।

তিনি বলেন, আমার মা স্বাস্থ্য নিয়ে একটু সচেতন। উনি বলেন, খোলা জায়গায় খাবার থাকলে ধুলো পড়ে কিনা সেটা বোঝা যায় না। এখানে কাঁচের ভেতরে থাকে, তাই মানসিকভাবে নিশ্চিন্ত লাগে। হয়তো শতভাগ নিশ্চয়তা নেই, কিন্তু একটা ধারণা তো তৈরি হয়।
দাম বেশি, কিন্তু মান ভালো- মিশ্র প্রতিক্রিয়া ক্রেতাদের
মঞ্জুর এলাহী নামের আরেক ক্রেতা বললেন, আমি প্রতি বছরই কয়েকদিন বাইরে থেকে ইফতার কিনি। আগে বেশিরভাগ সময় চকবাজারে যেতাম। এখন দেখি বেইলি রোডে অনেক ভ্যারাইটি। জাফরানি মোরগ পোলাও, বিফ রেজালা, সাসলিক- সবকিছু একসঙ্গে পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, হ্যাঁ, দাম বেশি। কিন্তু এক জায়গায় এত ভ্যারাইটি আর পরিষ্কার পরিবেশ পেলে অনেকেই একটু বেশি খরচ করতে রাজি। তবে এটা ঠিক, সবার সামর্থ্য এক নয়। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এখানে নিয়মিত কেনা কঠিন।
খাদ্য নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাইরের খাবার পুরোপুরি হেলদি- এটা বলা যাবে না। তবু যদি দোকানগুলো নিয়ম মেনে রান্না করে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখে, তাহলে ঝুঁকি কিছুটা কমে।

বেইলি রোডের বিভিন্ন দোকানে দামের তালিকা দেখলে বোঝা যায়, এটি সাধারণ ফুটপাতের ইফতার বাজার নয়। কিমা পরোটা ১৫০ টাকা, চিকেন মালাই কাবাব ১২০ টাকা, বারবিকিউ চিকেন রোল ১৬০ টাকা। হালিম ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা। খাসির রেজালা এক কেজি ২,৪০০ টাকা। গরুর কালা ভুনা ১,৭০০ টাকা কেজি।
মগবাজারের বাসিন্দা ইলিয়াস হোসেন বলেন, আমরা হয়তো প্রতিদিন কিনি না। সপ্তাহে একদিন বা বিশেষ দিনে কিনি। পরিবার নিয়ে একটু আলাদা কিছু খাওয়ার জন্য আসি। দাম বেশি, কিন্তু মান ঠিক থাকলে মানুষ নেয়।
তিনি বলেন, বেইলি রোড এখন এক ধরনের ব্র্যান্ড হয়ে গেছে। নাম শুনেই অনেকে আসে।
হালিমপ্রেমীদের ভিড়
বেইলি রোডের বিখ্যাত ‘এ ওয়ান ফুড’ ঘুরে দেখা যায় এখানে প্রায় ৩০ প্লাস আইটেম রয়েছে। এর মধ্যে চিকেন ড্রামস্টিক ৮০ টাকা, কিমা পরোটা ১৫০ টাকা, ওয়েস্টার কাবাব ৮০ টাকা, ভেজিটেবল কাটলেট ৫০ টাকা, চিকেন অন্থন ৪০ টাকা, পেঁয়াজু ও বেগুনি ১০ টাকা, ফিশ বল ৯০ টাকা, জালি কাবাব ৭০ টাকা, চিকেন আচারী কাবাব ১০০ টাকা, চিকেন মালাই কাবাব ১২০ টাকা, বারবিকিউ চিকেন রোল ১৬০ টাকা, চিকেন অনিয়ন রোল ১৫০ টাকা, স্পাইসি চিকেন ৮০ টাকা ও চিকেন ললিপপ ৮০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া এই দোকানে দই বড়া ১৬০ থেকে ২০০ টাকা, ফালুদা ৮০ টাকা, গাজর ফিরনি ৮০ টাকা এবং হালিম ৩০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে কাচারি বাড়ি ইফতার বাজারে মোরগ পোলাও ২৮০ টাকা, গরুর তেহারি ৩৫০ টাকা, খাসির রেজালা (হাফ কেজি) ১,২০০ টাকা ও এক কেজি ২,৪০০ টাকা, গরুর লাল ভুনা ১ কেজি ১,৬০০ টাকা এবং কালা ভুনা ১ কেজি ১,৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ঘি পরোটা ১০০ টাকা, আলু পরোটা ৮০ টাকা, লেমন মিন্ট ২২০ টাকা ও মহব্বতি শরবত ২৮০ টাকা।
এতোসব আইটিমের ভিড়ে এসব দোকানগুলোতে হালিমের সামনেই সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে। শফিকুল ইসলাম নামে এক নিয়মিত ক্রেতা বলেন, আমি প্রায় দশ বছর ধরে রমজানে এখান থেকে হালিম কিনছি। প্রথম দিকে এত ভিড় ছিল না। এখন দেখি লাইনে দাঁড়াতে হয়। স্বাদে একটা কনসিসটেন্সি আছে। প্রতিবছরই একই রকম ভালো লাগে।
তিনি আরও বলেন, আমি অফিস শেষে সরাসরি এখানে আসি। প্যাকেট নিয়ে বাসায় চলে যাই। সময়ও বাঁচে, পরিবারও খুশি থাকে।
ছুটির দিনে দ্বিগুণ বিক্রি, ঘাম ছুটে বিক্রয়কর্মীদের
সবুজ মিয়া নামক এক বিক্রয়কর্মী বলেন, রমজানের শুরু থেকেই বিক্রি ভালো। তবে শুক্রবার বা ছুটির দিনে বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। বিশেষ করে কাবাব, রোল আর হালিম দ্রুত শেষ হয়ে যায়।
তিনি বলেন, ইফতারের এক ঘণ্টা আগে সবচেয়ে বেশি চাপ থাকে। তখন একটানা প্যাকেট তৈরি করতে হয়। অনেক সময় আগেভাগেই কিছু আইটেম শেষ হয়ে যায়। সবমিলিয়ে ছটির দিনগুলোতে একরকম আমাদের ঘাম ছুটে যায়
টিআই/এমএসএ