এসি তারেক সেকান্দারসহ অভিযুক্তদের শাস্তি ও টাকা ফেরত চেয়ে সংবাদ সম্মেলন

রাজধানীর ওয়ারী এলাকায় একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে জাল টাকা উদ্ধারের নামে নগদ পৌনে চার কোটি টাকা লুট করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এসি তারেক সেকান্দারসহ অভিযুক্ত ১১ জনের শাস্তি ও অর্থ ফেরত চেয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ভুক্তভোগী মো. ফখরুদ্দীন।
সোমবার (২ মার্চ) দুপুরে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানান তিনি।
ঘটনার বিষয় উল্লেখ করে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মো. ফখরুদ্দীন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আমি একজন ব্যবসায়ী। আমি ব্যবসার কাজে ঘটনার দিন মালয়েশিয়ায় ছিলাম। আমার ম্যানেজার আমাকে মালয়েশিয়ার সময় অনুযায়ী রাত আড়াইটার দিকে ফোন দেয়। আমি ঘুমিয়ে থাকায় তখন ফোনটি ধরতে পারিনি। পরে ফজরের নামাজ আদায়ের জন্য উঠে দেখি আমার ম্যানেজার বেশ কয়েকবার আমাকে ফোন দিয়েছে। পরে আমি কল ব্যাক করলে জানায়, ডিবি তার দুইজন কর্মচারী ও বাসা থেকে ৩ কোটি ৭৫ লাখ ২৩ হাজার টাকা নিয়ে গেছে। পাশাপাশি তারা আমার ওই দুই কর্মচারীকে ছয় লাখ জাল টাকা দিয়ে ও নগদ ১৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা দেখিয়ে মামলা দেয়।

‘এ ঘটনায় আমি অনেক চেষ্টা করেও কোনো কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পরে তারা আমার ওই দুই কর্মচারীকে নিয়ে ওয়ারী থানায় একটি জাল টাকার মামলা দিয়ে চালান করে দেয়। আমি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মিশন বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাকে বলি, আপনারা আমার বাসা থেকে তিন কোটি ৭৫ লাখ ২৩ হাজার টাকা নিয়ে গেছেন, তাহলে কেন আমার দুই কর্মচারীকে জাল টাকা দিয়ে মামলা দিয়েছেন। এসআই বলেন, আমরা যে জাল টাকা পেয়েছি সেটা দিয়েই মামলা দেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েকবার তার সঙ্গে আমার কথা হয়। তখন আমি জানাই কিছু টাকা রেখে বাকি টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য। মিশন বিশ্বাস জানায় আমি তো ছোট অফিসার এগুলো সিনিয়র স্যার বলতে পারবে। এরপর সে আমাকে জানায় এসব বিষয় নিয়ে আপনি কারো সঙ্গে শেয়ার করবেন না। এরপর থেকে এসআই মিশন বিশ্বাস আমার ফোন ধরেনি।’
ভুক্তভোগী ফখরুদ্দীন আরো বলেন, ‘পরে আমি ডিবির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি রাকিব খানের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সশরীরে গিয়ে তার সঙ্গে বিষয়টি খুলে বলি। বিষয়টি জানার পর তিনি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মিশন বিশ্বাসকে পরিবর্তন করে দেন। ডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমাকে আশ্বস্ত করে এ ঘটনার সুস্থ তদন্ত হবে। আমি জানতে পেরেছি ডিবি আভ্যন্তরীণ একটি তদন্ত করেছে এবং পুলিশের পক্ষ থেকে সিটিটিসির যুগ্ম কমিশনার মুন্সি শাহাবুদ্দিন তদন্ত করছেন। আমি পরে ১১ জন পুলিশ সদস্যসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে আদালতে একটি ডাকাতির মামলা দায়ের করি। মামলাটি পিবিআই ডিআইজিকে একজন এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে দিয়ে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আমি ডিবির এসি তারেক সেকান্দারসহ ১১ জন পুলিশ সদস্যের এই ডাকাতির ঘটনায় শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। পাশাপাশি আমি প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, যাতে আমার টাকা ফেরত পাই।’
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী ফখরুদ্দীনের পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট নুরুজ্জামান ইকবাল জানান, আমরা যে সংবাদ সম্মেলনটি আজকে করছি সে বিষয়টি আমরা আপনারা অলরেডি অবগত আছেন। এই ঘটনাটি নিয়ে ঢাকা পোস্টে ২৭ ফেব্রুয়ারি ‘নকল টাকা উদ্ধারের নাটক, পৌনে চার কোটি আসল টাকা খেয়ে ফেলল ডিবি পুলিশ’ সংবাদ প্রচার করে। যা আপনারা সবাই অবগত আছেন এবং এই রিপোর্টটি করায় ঢাকা পোস্টকে আমরা আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই।

ঘটনার বিষয়ে আইনজীবী বলেন, গত বছরের ৮ নভেম্বর ব্যবসায়ী ফখরুদ্দিনের ওয়ারীর ৩৮ নম্বর বাসায় ডিবি পরিচয় দিয়ে ১৩ বছরের একটি বাচ্চা এই বাসায় রয়েছে বলে জানায়। পরে তারা ওই বাসায় ঢুকে ব্যবসায়ী ফখরুদ্দিনের তিন কোটি ৭৫ লাখ ২৩ হাজার টাকা ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়ে যায়। এবং পরে ৬ লাখ জাল টাকা এবং ১৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা দেখিয়ে বাসার ফ্ল্যাটের অন্য লোকদের সামনে নাটক সাজিয়ে ব্যবসায়ী ফখরুদ্দিনের দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে ওয়ারী থানায় একটি মামলা দেয়। ভুক্তভোগী তখন মালয়েশিয়ায় ছিলেন। পরে বিষয়টি ডিবির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। বিষয়টি জানার পর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন করে দেয় ডিবির উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তিনি তার এই টাকা ফেরত আনার জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তারেক সেকান্দারের কাছ থেকে সেই টাকা উদ্ধার করতে পারেননি। পরে জানা যায় বিষয়টি সিটিটিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মুন্সী শাহাবুদ্দিন তদন্ত করছেন।
‘এরপর ডিবির তদন্তকারী কর্মকর্তারা গ্রেপ্তার দুইজন আসামিকে রিমান্ডে আনে এবং এই অভিযানের মূল সোর্স দিদারুল আলম আদালতে ১১ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। অভিযানের পর সোর্স দিদারুলকে ৫০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল এসি তারেক সেকান্দারের। কিন্তু তিনি তাকে মাত্র ২০০০ টাকা দেন। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পরেও সোর্স দিয়ে তারা ঢাকায় নিয়ে আটকে রাখে এবং তার সন্তান ও তার ভাইকেও আটকে রাখে। আমরা আদালতে বিভিন্ন ধারায় ডাকাতির একটি মামলা দায়ের করেছি। মামলাটি এরইমধ্যে ডিআইজি পিবিআইকে নির্দেশ দিয়েছেন একজন এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে দিয়ে এই মামলাটি তদন্ত করে দ্রুতই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য। এসি তারেক সেকান্দার পদোন্নতি নিয়ে রাঙামাটিতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে কর্মরত রয়েছেন। অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের বেশিরভাগই ক্লোজ রয়েছেন। আমার ভুক্তভোগীর চাওয়া তার ৩ কোটি ৭৫ লাখ ২৩ হাজার টাকা এবং যারা এই ডাকাতির সঙ্গে জড়িত তাদেরকে আইনের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া,’ বলেন আইনজীবী অ্যাডভোকেট নুরুজ্জামান ইকবাল।
এসএএ/জেডএস