অভিযোগ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে থানায় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বসানোর প্রস্তাব

নাগরিক সেবার মান বৃদ্ধি ও অভিযোগের তাৎক্ষণিক সমাধানের লক্ষ্যে থানায় থানায় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বসানোর প্রস্তাব সরকারকে দিয়েছেন নবনিযুক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির।
আইজিপি বলছেন, নাগরিকদের মধ্যে আইন অমান্য করার প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেকোনো ঘটনা ঘটলে সবাই খুব দ্রুত বিচার চায়। আমাদের জুডিশিয়াল ও পুলিশি সিস্টেমে একটি প্রক্রিয়া আছে, যা মানতে হয়। সেজন্য আমি সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছি প্রতিটি থানায় একজন করে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়ার জন্য। এতে সাত দিনের মধ্যে বিচার পাওয়া সম্ভব হবে। জনগণকে কোর্টে ঘুরতে হবে না এবং পুলিশেরও সময় বাঁচবে। এ ধরনের কার্যক্রমের পরিকল্পনা সরকারের আছে। আশা করছি এটি আমরা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারব।
সোমবার (৯ মার্চ) বেলা ১১টায় পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স মিডিয়া সেন্টারে (ডিএমপির সেন্ট্রাল কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার ভবনের নিচতলা) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
আইজিপি হিসেবে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানতে চাইলে আলী হোসেন ফকির বলেন, নাগরিক সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান সম্ভব হলে পুলিশ সম্পর্কে মানুষের বিরূপ ধারণাও কমে যাবে। কারণ অনেক বিষয় পুলিশের আইনের আওতায় পড়ে না; যেমন- ভূমি, জমি ও টাকা আদায় সংক্রান্ত মামলা। এগুলোর সিদ্ধান্ত কোর্টই নেবে। কিন্তু থানায় যদি একজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট থাকেন, তবে তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধান সম্ভব। এতে জনগণ সন্তুষ্ট হবে এবং প্রশাসনিক জটিলতাও কমে যাবে। সমস্যা সমাধানের জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বিরূপ ধারণা পোষণ না করে সহযোগিতা করুন।
পুলিশের পোশাক পরিবর্তন নিয়ে চলমান আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুলিশের পোশাকের ব্যাপারে সরকার সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে। এটি নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। সরকারের পক্ষ থেকেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত ব্রিফিং পাবেন।
মাদকের ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণার পরও তা প্রকাশ্য বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে একটি ঐতিহ্য বা প্রথা চালু হয়েছে, যা রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব নয়। আমাদের ‘রেসপন্স টাইম’ দিতে হবে। কোনো ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই বিচারের জন্য চাপ সৃষ্টি করলে পুলিশের ওপর মানসিক চাপ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সঠিক তদন্তের আগেই তড়িঘড়ি করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়া হয়, যা ভুল বার্তা দেয়। যার প্রমাণ অতীতে ‘জর্জ মিয়া নাটক’। মিডিয়ার চাপের কারণেই এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে আমি মনে করি।
তিনি বলেন, এখন যাতে এমন কিছু না হয়, সেজন্য আমাদের সময় দিন। আমি আসার পর থেকে ঘটা প্রতিটি ঘটনা আমরা শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছি। আপনারা আমাদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করুন।
অসাধু কর্মকর্তাদের চক্র ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে আইজিপি বলেন, সৎ, দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তার অবশ্যই মূল্যায়ন হবে। এসব নিয়ে কথা বলার কারণে আমি নিজেও এক সময় ক্ষতির শিকার হয়েছি। আমার পরিষ্কার বার্তা হলো- বাংলাদেশ পুলিশের ২ লাখ ১৫ হাজার সদস্যের এই পরিবারে যদি কোনো ‘দুষ্টু’ সদস্য থাকে, তবে তাদের বিদায় নিতে হবে। দুষ্টু গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো। যারা সৎ ও যোগ্য, তারাই কেবল বাংলাদেশ পুলিশের জন্য কাজ করবে।
থানাকে ‘জিরো কমপ্লেইন’ করার পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এজন্যই আমি বলেছি যে থানায় একটি ম্যাজিস্ট্রেসি সিস্টেম ডেভেলপ করা দরকার, যাতে জরুরি মামলাগুলো অল্প সময়ে সমাধান করা যায়। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ কমাতে প্রতিটি থানার রিসিপশনে পরিবর্তন আনার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
বিগত সরকারের সময় প্রসঙ্গে আইজিপি বলেন, গত ১৭ বছরে পুলিশের সঙ্গে জনগণের দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে এবং বিশ্বাস ভঙ্গ হয়েছে। তবে সব পুলিশ এর সঙ্গে জড়িত ছিল না। হাতেগোনা কয়েকজন নেতা নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির জন্য সঠিক দায়িত্ব পালন না করায় পুলিশের দুর্নাম হয়েছে।
কিশোর গ্যাং ও তাদের রাজনৈতিক ছত্রছায়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আপনি কি আপনার বাবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবেন? দেশের রাজনীতির মূল চালিকা শক্তি রাজনৈতিক দল। তারা পলিসি মেকার, তারা পার্লামেন্টে নীতি নির্ধারণ করে। দেশ কোথায় যাবে পুলিশ কিভাবে চলবে সমাজ কিভাবে চলবে তারাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তারা যদি ভুল করে তারা সংশোধনের দায়িত্ব তারা সবাই মিলে সমঝোতার মাধ্যমে টেবিলেই আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিবে। তাদেরকে কন্ট্রোল করার দায়িত্ব তো আমাদের না। কিন্তু সে যদি কোন ক্রিমিনাল এক্টিভিটিস করে বা কোন আইন ভঙ্গ করে সেক্ষেত্রে আমরা আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।
পুলিশ সদস্যদের কাউন্সেলিং বিষয়ে তিনি জানান, বাহিনীকে পেশাদারিত্বের দিকে মোটিভেট করার কাজ শুরু হয়েছে। নিয়মিত তদারকি চলছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পুলিশ হত্যার তদন্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিটি ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং তদন্ত শেষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজানো আসলে সন্ত্রাস বিরোধী অপরাধ কিনা? জানতে চাইলে আইজিপি বলেন, আপনাদেরকে একটা বিষয়ে আশ্বস্ত করতে চাই যে আমাদের পুলিশের পক্ষ থেকে কোন অতিশীয় ভূমিকা পালন করা হবে না। কিন্তু নাগরিকদের আইন মানতে হবে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না। আইনের শাসন বাস্তবায়ন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এজন্যই পুলিশ কাজ করবে।
তিনি বলেন, যারা নিষিদ্ধ সংগঠন অনেক নিষিদ্ধ সংগঠন আছে তারা বিভিন্ন অজুহাতে রাস্তায় নেমে আইনশৃঙ্খলা অবনতি করে তাদের সন্ত্রাসকে উস্কে দিবে এটা আমরা মেনে নেব না।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, এ কে এম আওলাদ হোসেন (অতিরিক্ত আইজি, প্রশাসন), আকরাম হোসেন (অতিরিক্ত আইজি, অর্থ), খোন্দকার রফিকুল ইসলাম (অতিরিক্ত আইজি, ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস), মোসলেহ উদ্দিন আহমদ (অতিরিক্ত আইজি, লজিস্টিকস) ও সরদার নূরুল আমিনসহ (অতিরিক্ত আইজি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
জেইউ/এমএসএ