পাম্পে পুলিশের সঙ্গে সেনা সদস্য মোতায়েন চায় ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন

বর্তমান পরিস্থিতিতে পাম্পগুলো সচল রাখতে প্রতিটি ফিলিং স্টেশনের নিরাপত্তার জন্য পুলিশের পাশাপাশি সেনা সদস্য মোতায়েনসহ ৮ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউশন এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।
বুধবার (১১ মার্চ) মালিবাগের স্কাই সিটি হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানান সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক।
দাবিগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের ৮ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—মোটরসাইকেলের তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে কোনো বিভাজন করা যাবে না। ছোট-বড় সকল ফিলিং স্টেশনে তেল সরবরাহ করতে হবে। বিপণন কোম্পানি থেকে তেল সরবরাহের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে। এজেন্সি, প্যাক পয়েন্ট ও ডিস্ট্রিবিউটর বরাবর তেল সরবরাহ চালু করতে হবে।
মনিটরিংয়ের নামে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে ‘সোশ্যাল পানিশমেন্ট’ বা সামাজিক হয়রানি বন্ধ করতে হবে। কোনো ফিলিং স্টেশন বা রিভার ভেসেলে অবৈধ মজুত ধরা পড়লে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং তেলের ডিপোসমূহে বহিরাগতদের প্রবেশ বন্ধ করতে হবে।
সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা দেখা দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকার জ্বালানি তেল বিক্রিতে রেশনিং বা সীমা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং আমরা তা যথাযথভাবে পালন করছি।
রাজধানীসহ সারা দেশের পেট্রোল পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘তেল ফুরিয়ে যাওয়ার’ আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। অথচ একদিকে সরকার বারবার বলছেন দেশে পর্যাপ্ত তেলের মজুত রয়েছে, আবার সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে বলা হচ্ছে রেশনিং করে জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে। এই সিদ্ধান্তহীনতা এবং একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্য সামাল দিতে গিয়ে আমরা ভোক্তাদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছি। এ মুহূর্তে সাধারণ মানুষের প্রতি আমাদের পরামর্শ হলো—অহেতুক আতঙ্কিত না হয়ে সরকারি নির্দেশনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুন এবং রেশনিং ব্যবস্থা নির্বিঘ্নে পরিচালিত হতে দিন।
তিনি বলেন, সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে তেলের যে মজুত রয়েছে, তা দিয়ে সংকট মোকাবিলা সম্ভব এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন তেলের জাহাজ বন্দরে ভিড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা একটি সাময়িক সমস্যা, যা কাটিয়ে উঠতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। এ অবস্থায় যদি প্রত্যেকেই নিজের গাড়ির ট্যাঙ্ক পূর্ণ করে রাখার প্রতিযোগিতায় নামেন, তাহলে সাধারণ সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। এই ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে কেনার প্রবণতা বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অত্যন্ত শক্তিশালী। নীতিনির্ধারকরা যদি ভেবেচিন্তে কথা বলতেন এবং তথ্য দেওয়ার ব্যাপারে সচেতন হতেন, তবে গুজব ও বিভ্রান্তি ছড়াত না। বিশেষ করে একবার পর্যাপ্ত মজুতের কথা বলে আবার রেশনিংয়ের কথা বলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীতিমতো আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ফেসবুক ও ইউটিউবে ‘তেল নেই’ বলে অস্থিরতা সৃষ্টি করা হচ্ছে।
যারা অবৈধভাবে মজুত করছে বা গুজব ছড়িয়ে আতঙ্ক তৈরি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে আমরা আহ্বান জানাচ্ছি। পেট্রোল পাম্প মালিকরা যদি তেলের সরবরাহ নিয়ে কোনো অনিয়ম করে, অবৈধ মজুত করে বা নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত দামে বিক্রির চেষ্টা করে, তবে সংশ্লিষ্ট পাম্পের বিরুদ্ধে জেল-জরিমানা বা যেকোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অবশ্যই নেওয়া হোক। এ ব্যাপারে অ্যাসোসিয়েশন সরকারকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করবে।
নাজমুল হক বলেন, সরকার কর্তৃক সরবরাহকৃত তেল ভোক্তা পর্যায়ে সঠিকভাবে বিপণন হচ্ছে কি না বা অবৈধ মজুত করা হচ্ছে কি না—তা মনিটরিং করার জন্য মোবাইল কোর্ট পরিচালনার প্রয়োজন নেই। কারণ কোম্পানি থেকে সরবরাহকৃত তেল, পাম্পের আন্ডারগ্রাউন্ড ট্যাংক এবং ডিসপেন্সার ইউনিটের মিটার রিডিং যাচাই করলেই অনিয়ম স্পষ্ট হয়ে যায়। এটি মন্ত্রণালয়, বিপিসি বা বিপণন কোম্পানির কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই মনিটরিং করা সম্ভব। যখন মোবাইল কোর্ট কোনো পাম্পে পুলিশ বা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে প্রবেশ করে, তখন মনে হয় তারা কোনো ডাকাত বা দাগি আসামি ধরতে এসেছেন। এতে আমাদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। আমরা বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে সম্মানজনক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে এবং সরকারি লাইসেন্স নিয়ে কমিশন এজেন্ট হিসেবে জনগণের দুয়ারে জ্বালানি সেবা দিচ্ছি। অথচ আমাদের মান-সম্মান রক্ষা ও নিরাপত্তা দেওয়ার কোনো আগ্রহই সরকার ও প্রশাসনের নেই। এরূপ অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের পক্ষে পাম্প পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, ভোক্তারা তাদের চাহিদা অনুযায়ী তেল সংগ্রহের জন্য পাম্পে আসেন। আমরা তেল আমদানি বা প্রস্তুত করি না। আমরা সরকার থেকে মূল্য পরিশোধ সাপেক্ষে সরবরাহ নিয়ে থাকি। সরকার যদি চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ না করে এবং সরকারের সিদ্ধান্তের কারণে আমাদের পাম্পগুলোকে ভোক্তাদের সাথে সংঘর্ষের ক্ষেত্রে পরিণত করা হয়, তবে আমাদের প্রতিষ্ঠান ও স্টাফরা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বেন। এরূপ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের বিপণন ব্যবস্থা সচল রাখা অসম্ভব। বর্তমান পরিস্থিতির কিছু সরকারি নির্দেশনা আমাদের চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, গতকাল সরকার একটি নির্দেশনা দিয়েছে যে, রাইড শেয়ারিং মোটরবাইকে কিছু শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ৫ লিটার অকটেন সরবরাহ করা হবে। কিন্তু ওই শর্তগুলো যাচাই করতে একটি মোটরবাইকের পেছনে যে সময় ব্যয় হবে, তাতে পেট্রোল পাম্পগুলো বিপদে পড়বে। কাগজপত্র যাচাই করতে বিলম্ব হলে লাইনে দাঁড়ানো অন্যান্য ক্রেতারা অধৈর্য হয়ে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেন। সরকার এই ধরনের বিভাজন কেন করতে গেল, তা আমাদের বোধগম্য নয়।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউশন এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের অন্যান্য সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এএসএস/এমএসএ