চাহিদা লাখো, আসন ৩১ হাজার : বাঁশের ব্যারিকেডে রেলের ‘কঠোর’ ঈদযাত্রা!

আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে ঘরমুখী মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে ঢাকা ছাড়ার অগ্রিম টিকিট বিক্রি ইতোমধ্যে শেষ করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এবারও সব টিকিট অনলাইনে বিক্রি করা হয়েছে। তবে, লাখো মানুষের চাহিদার বিপরীতে আসন সংখ্যা খুবই সীমিত হওয়ায় স্টেশনে ভিড় সামলাতে এবং অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতে বিশেষ কড়াকড়ির ব্যবস্থা নিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।
তথ্যমতে, এবার ঢাকা থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচলকারী ট্রেনগুলোর জন্য সর্বোচ্চ ৩১ হাজার ২৫৫টি আসন বরাদ্দ রয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় কয়েক হাজার কম। এই অপ্রতুল আসনের বিপরীতে কয়েক লাখ মানুষ ঢাকা ছাড়ার অপেক্ষায় আছেন। ফলে স্টেশনগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় সামলানো এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখা রেলওয়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আগামী শুক্রবার (১৩ এপ্রিল) ভোর ৬টায় রাজশাহীগামী ‘ধূমকেতু এক্সপ্রেস’ (৭৬৯) ঢাকা স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঈদের বিশেষ ট্রেনযাত্রা শুরু হবে। ১৩ এপ্রিল প্রথম প্রহর থেকেই সব ট্রেন বিশেষ ব্যবস্থায় চলাচল করবে।
আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে ঢাকা থেকে প্রতিদিন ৩১ হাজার ২৫৫টি ট্রেনের আসন বরাদ্দ থাকলেও টিকিটপ্রত্যাশীর সংখ্যা কয়েক লাখ। এই বিশাল ব্যবধান সামাল দিতে ঢাকা, বিমানবন্দর ও জয়দেবপুর স্টেশনে বাঁশের ‘জিকজ্যাক’ ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে। প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের আগে যাত্রীদের টিকিট ও এনআইডি বাধ্যতামূলকভাবে পরীক্ষা করা হবে। বিনা টিকিটে কেউ যেন স্টেশনে ঢুকতে না পারে, সেজন্য নেওয়া হয়েছে তিন স্তরের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা
বুধবার (১১ মার্চ) ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, গতবারের মতো এবারও স্টেশনে প্রবেশের পথে বাঁশ দিয়ে অস্থায়ী পথ তৈরি করা হয়েছে। মোট ছয়টি পথ রাখা হয়েছে, যার প্রথমটি দিয়ে স্ট্যান্ডিং টিকিট কেনা যাবে এবং পরের চারটি দিয়ে মূল যাত্রীরা স্টেশনে প্রবেশ করবেন। ষষ্ঠ পথটি রাখা হয়েছে যাতায়াত উভর কাজের জন্য। সবগুলো পথই প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের আগে মিশেছে। যেখানে ঈদের সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ একাধিক টিটিই দায়িত্ব পালন করবেন।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বটলনেক সিস্টেমের এই বাঁশের পথগুলোর মুখে যাত্রী ও সহযাত্রীদের টিকিট এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পরীক্ষা করা হবে। বিনা টিকিটে কেউ যেন প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করতে না পারেন— সেজন্যই এই কড়াকড়ি। বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে ভ্রমণের সময় টিকিটের পাশাপাশি এনআইডি সঙ্গে রাখতে এবং পর্যাপ্ত সময় হাতে নিয়ে স্টেশনে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তার জন্য স্টেশনের প্রবেশমুখেই র্যাব, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) ও পুলিশের কন্ট্রোল রুম বসানো হয়েছে। একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বিমানবন্দর ও জয়দেবপুর জংশনেও।
ঈদের চাপ সামাল দিতে আগামী ১৬ এপ্রিল থেকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত সব আন্তনগর ট্রেনের সাপ্তাহিক ছুটি (ডে-অফ) বাতিল করা হয়েছে। রেললাইন ও চলন্ত ট্রেনে নাশকতা প্রতিরোধে জিআরপি, আরএনবি, পুলিশ, বিজিবি ও র্যাব সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করবে। এছাড়া ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ এবং টিকিট কালোবাজারি রুখতে বিশেষ কমিটি ও ভিজিল্যান্স টিম সার্বক্ষণিক সক্রিয় থাকবে বলে জানিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ
সার্বিক বিষয় নিয়ে ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনের ব্যবস্থাপক মো. সাজেদুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঈদুল ফিতর ২০২৬ সামনে রেখে যাত্রীদের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। স্টেশনে অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং বিনা টিকিটে প্রবেশ ঠেকাতে তিন স্তরে চেকিং কার্যক্রম চালানো হবে। রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, টিটিই, টিসি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এই চেকিং প্রক্রিয়ায় সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন।

তিনি আরও বলেন, ‘ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করতে একটি বিশেষ কমিটি কাজ করবে। এটি যাত্রীদের জীবনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এই প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে জিআরপি, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী, মেট্রোপলিটন পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা যুক্ত থাকবেন, যাতে যাত্রীরা নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন।
স্টেশন ব্যবস্থাপক বলেন, অতীতে শেষ মুহূর্তে পোশাক কারখানার শ্রমিক এবং তৃণমূলের মানুষ একসঙ্গে স্টেশনে আসার ফলে অনেক সময় কিছু ট্রেনে বিচ্ছিন্নভাবে যাত্রীরা উঠে পড়ার ঘটনা ঘটতো। তবে, এবার এই পরিস্থিতি রোধে প্রস্তুতি আরও জোরদার করা হয়েছে, যাতে ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ এবং বিনা টিকিটে যাত্রা পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েট অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঢাকা থেকে ট্রেনের চাহিদা যেখানে লাখো মানুষের, সেখানে রেলওয়ের সক্ষমতা মাত্র কয়েক হাজার। এই বিশাল ব্যবধানের কারণে শেষ পর্যন্ত ঈদের চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হবে। এবার আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রেনের আসন সংখ্যা কমানোয় কোচের মধ্যেও তিল ধারণের ঠাঁই থাকবে না। অথচ মানুষের বাড়ি ফেরার চাহিদা একটুও কমেনি; বরং কর্মসংস্থানের জন্য নিয়মিত মানুষ ঢাকায় আসায় ট্রেনের চাহিদা এখন আকাশচুম্বী।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘দিন দিন রেলের যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ার বদলে উল্টো কমেছে। সেই হিসাবে স্টেশনে বাঁশ দিয়ে জিগজ্যাক পথ তৈরি বা অন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত শৃঙ্খলা ধরে রাখা দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। কোচে জায়গা না পেয়ে মানুষ বাধ্য হয়ে ট্রেনের ছাদেও উঠে যেতে পারে।’
এ বিষয়ে ঢাকা বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) এ বি এম কামরুজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমাদের প্রথম এবং প্রধান গুরুত্ব হলো যাত্রীদের নিরাপত্তা এবং তাদের নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, কোনো টিকিটবিহীন যাত্রী যেন কোনোভাবেই স্টেশনে প্রবেশ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। এজন্য বিভিন্ন স্তরে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পাশাপাশি টিকিট কালোবাজারি ঠেকাতে আমাদের ভিজিল্যান্স টিমও সক্রিয় থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বরাবরের মতো এবারও ঢাকা, বিমানবন্দর ও জয়দেবপুর স্টেশনে বাঁশের জিকজ্যাক গেট তৈরি করা হচ্ছে। এবার বাড়তি নিরাপত্তা হিসেবে অতিরিক্ত লোহার ব্যারিয়ারও বসানো হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টায় টিকিটবিহীন যাত্রীদের প্রতিহত করা হবে। ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ অত্যন্ত বিপজ্জনক হওয়ায়, কেউ যাতে ছাদে উঠতে না পারে, সেজন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’

ঈদে চলবে ৫ জোড়া বিশেষ ট্রেন
ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে ঘরমুখী মানুষের যাত্রা সহজ করতে এবার পাঁচ জোড়া বিশেষ ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ে, যদিও গত বছরগুলোতে এই সংখ্যা ছিল আট থেকে ১০ জোড়া।
এছাড়া যাত্রীদের সুবিধার্থে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচলকারী সব আন্তনগর ট্রেনের সাপ্তাহিক ছুটি বা ‘ডে-অফ’ বাতিল করা হয়েছে। আগামী ১৬ এপ্রিল থেকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত এসব ট্রেনের কোনো ছুটি থাকবে না, তবে ঈদের পর আবার যথারীতি তা কার্যকর হবে।
ঈদের দিন কোনো আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করবে না
নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী বিশেষ ট্রেনগুলো বিভিন্ন রুটে চলাচল করবে। প্রথম জোড়া ট্রেন চট্টগ্রাম–চাঁদপুর–চট্টগ্রাম রুটে চলবে। ‘চাঁদপুর ঈদ স্পেশাল–১’ চট্টগ্রাম থেকে দুপুর ৩টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে রাত ৮টা ২০ মিনিটে চাঁদপুর পৌঁছাবে এবং ‘চাঁদপুর ঈদ স্পেশাল–২’ চাঁদপুর থেকে ভোর ৪টায় ছেড়ে সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে চট্টগ্রাম পৌঁছাবে।

দ্বিতীয় জোড়া ট্রেন ঢাকা–দেওয়ানগঞ্জ–ঢাকা রুটে চলবে। ‘তিস্তা ঈদ স্পেশাল–৩’ ঢাকা থেকে সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে দুপুর ৩টা ৩০ মিনিটে দেওয়ানগঞ্জ পৌঁছাবে এবং ‘তিস্তা ঈদ স্পেশাল–৪’ দেওয়ানগঞ্জ থেকে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে রাত ১০টা ১৫ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছাবে।
তৃতীয় ও চতুর্থ জোড়া ট্রেন শুধুমাত্র ঈদের দিন ভৈরববাজার–কিশোরগঞ্জ–ভৈরববাজার এবং ময়মনসিংহ–কিশোরগঞ্জ–ময়মনসিংহ রুটে চলবে। ‘শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল–৫’ ভোর ৬টায় ভৈরববাজার থেকে ছেড়ে সকাল ৮টায় কিশোরগঞ্জ পৌঁছাবে এবং ‘শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল–৬’ কিশোরগঞ্জ থেকে বেলা ১২টায় ছেড়ে দুপুর ২টায় ভৈরববাজার পৌঁছাবে।
অন্যদিকে, ‘শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল–৭’ ময়মনসিংহ থেকে ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে ছেড়ে সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে কিশোরগঞ্জ পৌঁছাবে এবং ‘শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল–৮’ কিশোরগঞ্জ থেকে বেলা ১২টায় ছেড়ে বিকেল ৩টায় ময়মনসিংহ পৌঁছাবে।
পঞ্চম জোড়া ট্রেন জয়দেবপুর–পার্বতীপুর–জয়দেবপুর রুটে চলবে। ঈদের আগে ‘পার্বতীপুর ঈদ স্পেশাল–৯’ জয়দেবপুর থেকে সন্ধ্যা ৭টায় ছেড়ে রাত ২টা ৩০ মিনিটে পার্বতীপুর পৌঁছাবে এবং ‘পার্বতীপুর ঈদ স্পেশাল–১০’ পার্বতীপুর থেকে সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে দুপুর ২টা ২০ মিনিটে জয়দেবপুর পৌঁছাবে। তবে ঈদের পর এই ট্রেনের সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন আসবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে জানিয়েছে, বিনা টিকিটের যাত্রী প্রতিরোধে ঢাকা, বিমানবন্দর, জয়দেবপুর, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট, রাজশাহী ও খুলনাসহ বড় স্টেশনগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হবে। জিআরপি, আরএনবি, বিজিবি, র্যাব ও স্থানীয় পুলিশের সহযোগিতায় টিকিটবিহীন যাত্রীদের স্টেশনে প্রবেশ ঠেকাতে সার্বক্ষণিক প্রহরার ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া নাশকতা প্রতিরোধে চলন্ত ট্রেন, স্টেশন ও রেললাইন এলাকায় নজরদারি আরও বাড়ানো হবে। আরএনবি, জিআরপি ও রেলওয়ে কর্মচারীদের কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি র্যাব, বিজিবি, স্থানীয় পুলিশ ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় সহযোগিতায় যেকোনো নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে দমন করা হবে।
এমএইচএন/এমএআর/