পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে মা ও বোনের জন্য নতুন কাপড় কিনতে বেরিয়েছিলেন ২১ বছরের গৃহবধূ মুক্তা আক্তার। কিন্তু কে জানত, এই আনন্দযাত্রাই তার জীবনের শেষ যাত্রা হবে! রাজধানীর উত্তরা দক্ষিণ মেট্রো স্টেশনের নিচে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে চলন্ত ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হয় তার। অথচ এই নির্মম ঘটনার ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও তদন্তে পুলিশের অগ্রগতি শূন্য।
বিজ্ঞাপন
এখন পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার বা ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত গাড়িটি শনাক্ত করতে পারেনি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তুরাগ থানা।
নিহতের স্বামী পোশাক কারখানার সুপারভাইজার লিমন হোসেন অভিযোগ করেছেন, পুলিশ তাকে মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে কিছুই জানাচ্ছে না। থানায় গিয়ে বসে থাকলেও তদন্তকারী কর্মকর্তার দেখা পান না তিনি। ফোনে যোগাযোগ করা হলে তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রতিবারই একই উত্তর দেন– ‘আসামি শনাক্ত হয়নি, আমরা চেষ্টা করছি।’ স্ত্রীর মৃত্যুর এত দিন পার হলেও পুলিশ কাউকে শনাক্ত করতে না পারায় চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন লিমন।
জানা যায়, গত ১৯ মার্চ (বৃহস্পতিবার) সকালে ঘটনা ঘটার পর তুরাগ থানা পুলিশ প্রায় এক দিন বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করে আসছিল। পরে ঘটনাটি জানাজানি হলে এবং গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর তুরাগ থানা পুলিশ তাদের থানা এলাকায় ঘটনাটি ঘটেছে বলে স্বীকার করে। পরদিন শুক্রবার (২০ মার্চ) নিহতের স্বামী লিমন হোসেন অজ্ঞাতনামা তিন-চারজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
বিজ্ঞাপন
মামলা দায়েরের পর তুরাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘ঘটনাস্থলে কোনো সিসি ক্যামেরা নেই। আমরা আসামিদের শনাক্তের চেষ্টা করছি, দ্রুত তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।’
কিন্তু ঘটনার ১০ দিন পার হলেও পুলিশ কোনো কিনারা করতে পারেনি। এমনকি ছিনতাইকারীরা যে প্রাইভেট কারে করে এসেছিল, সেটিও শনাক্ত হয়নি। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাও আগের বক্তব্যেই আটকে আছেন। আজ রোববার (২৯ মার্চ) তুরাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মামুনুর রশীদ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার নেই। আসামি ও প্রাইভেট কার শনাক্ত হয়নি। শনাক্তের জন্য আমরা চেষ্টা করছি, কাজ চলমান রয়েছে।’
এদিকে, বারবার থানায় গিয়েও কোনো তথ্য না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন লিমন হোসেন। ঘটনার দিনের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত আমরা স্বামী-স্ত্রী বাসাতেই ছিলাম। পরে একসঙ্গে বের হই। মুক্তা জানায়, সে তার মা ও বোনের জন্য ঈদের কাপড় কিনতে মিরপুর-১০ নম্বরে যাবে। আমি তাকে রিকশায় তুলে দিয়ে কিছু দূর গিয়ে নেমে যাই। মুক্তা বাইরে গেলে কিছুক্ষণ পরপরই আমাকে ফোন করে। কিন্তু এক ঘণ্টা পার হওয়ার পরও ফোন না পেয়ে আমি নিজেই কল দিই। তখন রিকশাচালক ফোন ধরে জানান, মুক্তা রাস্তায় অচেতন হয়ে পড়ে আছে; আমি যেন দ্রুত ঘটনাস্থলে যাই। উত্তরা আধুনিক হাসপাতালের সামনে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই মুক্তাকে নিয়ে আসা হয়। দেখি, তার মুখের এক পাশ কান পর্যন্ত থেঁতলে গেছে।’
বিজ্ঞাপন
লিমন আরও জানান, রিকশাচালকের বর্ণনা অনুযায়ী, ছিনতাইকারীরা একটি সাদা রঙের প্রাইভেট কারে ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে চার-পাঁচজন ছিল। উত্তরা দক্ষিণ মেট্রো স্টেশনের কাছে ছিনতাইকারী মুক্তার ব্যাগ ধরে টান দিলে তিনি পাকা রাস্তার ওপর ছিটকে পড়ে গুরুতর আঘাত পান। ছিনতাইয়ের পর গাড়িটি দ্রুতগতিতে পালিয়ে যায়।
গুরুতর আহত অবস্থায় মুক্তাকে তিনটি হাসপাতাল ঘোরানোর পর ওই দিন বেলা ২টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বরগুনার বাসিন্দা মুক্তার সঙ্গে বছর দুয়েক আগে লিমন হোসেনের বিয়ে হয়। তারা রাজধানীর দক্ষিণখানের ফায়দাবাদ এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন।
