রাজধানীতে তেলের সংকট নিয়ে চলছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আর হাহাকার। ফিলিং স্টেশনগুলোতে লেগে আছে কিলোমিটার দীর্ঘ তেলের লাইন। বাইক বা প্রাইভেট কার— তেল পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের। এর মধ্যেই অভিযোগ উঠেছে, অনেকেই ট্যাংকে তেল থাকা সত্ত্বেও বারবার রিফিল করছেন, এমনকি কেউ কেউ তেল মজুত বা অতিরিক্ত দামে বিক্রিও করছেন।
বিজ্ঞাপন
রোববার (২৯ মার্চ) সরেজমিনে সকাল থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত মোহাম্মদপুর, নিউমার্কেট ও শাহবাগ এলাকা ঘুরে তেল সংকটের এমন চিত্রই চোখে পড়ে। সরকার নির্ধারিত লিমিট অনুযায়ী বাইকে ৬০০ এবং কারে ১৫০০ টাকার তেল দেওয়া হলেও, এক শ্রেণির অসাধু লোকের লোভ আর অসচেতনতার কারণে সাধারণ চালকরা ভুগছেন চরম দুর্ভোগে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের সোনার বাংলা স্টেশনে ঘুরে এবং তেল পাম্প কর্মী ও বাইকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সোনার বাংলা স্টেশনের সামনে থেকে পৌনে এক কিলোমিটার দীর্ঘ তেলের লাইন। বাইকাররা জানান, তারা প্রায় এক ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। সোনার বাংলা তেল পাম্পে লম্বা সিরিয়াল হলেও তেল পাওয়া যাচ্ছে।

মোটরসাইকেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা আব্দুল্লাহ আল মামুন নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমি এক ঘণ্টা ধরে তেল নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছি। আস্তে আস্তে করে গাড়ি সামনে এগোচ্ছে, আমরাও আগাচ্ছি। তবে, এই সোনার বাংলা তেল পাম্পে টাংকি ফুল করে দেওয়া হয়, এটিই একমাত্র সুবিধা।’
বিজ্ঞাপন
সোনার বাংলা তেল পাম্পের ক্যাশিয়ার সোহরাব হোসেন জানান, এখন পর্যন্ত তাদের তেল পাম্পে কোনো সংকট তৈরি হয়নি। গ্রাহকদের চাহিদামতো তেল দিতে পারছেন। সরকারের নির্দেশনা মেনেই তারা তেল দিচ্ছেন। তাদের দিনে বেশ কয়েকটি তেলের গাড়ি আসে। আগে কিছু তেল রিজার্ভ থাকত, যা পরের দিন বিক্রি করা হতো। কিন্তু এখন দিনের তেল দিনেই শেষ হয়ে যায়।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর, নিউমার্কেট ও শাহবাগ এলাকায় জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন লেগে আছে, বাইক বা প্রাইভেট কার চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সংকট মোকাবিলায় সরকার বাইকে ৬০০ টাকা এবং কারে ১৫০০ টাকার তেল লিমিট নির্ধারণ করে দিলেও অনেক পাম্প বন্ধ থাকায় চাপ বাড়ছে খোলা পাম্পগুলোতে
বিজ্ঞাপন
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘অনেকে ২০ থেকে ২৫টি গাড়ির সিরিয়াল পার করে এসে ট্যাংকি ফুল থাকলেও আবার অতিরিক্ত তেল নিচ্ছেন। অনেক প্রাইভেট কারে ২০০ টাকার অথবা ১৮৫ টাকার তেল ঢুকছে। সিরিয়াল পার করে এত কম টাকার তেল কেন নিচ্ছেন জিজ্ঞেস করলে তারা জানান, একটু খালি হয়ে গেছে, সেটুকু তেল ঢুকিয়ে নিলাম।’

পাশেই তালুকদার ফিলিং স্টেশনের ফিলিং ম্যান শামীম ইসলাম জানান, তাদের এখানে তেলের সংকট নেই, তবে স্বল্পতা আছে। তারা মোটরসাইকেলে ৬০০ টাকার তেল এবং প্রাইভেট কারে ১৫০০ টাকার তেল দিচ্ছেন।
অন্য একটি ফিলিং স্টেশন ট্যাংকি ফুল করে দিলেও তারা কেন দিতে পারছেন না— এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের তেলের গাড়ি পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তেল নামাতে নামাতেই তেলের ট্যাংকি খালি হয়ে যায়। দিনে ৮ থেকে ১০টি তেল ট্যাংকার আসে। আমাদের এখানে যে পরিমাণ আসে, আমরা সেই পরিমাণই দিয়ে থাকি।’
ঢাকা কলেজের বিপরীত পাশে নতুন সার্ভিস স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, পাম্পে ঢোকার দুই পাশের গেটে তালা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। একটু সামনে এগোলেই
অভিযোগ উঠেছে, অনেকেই ট্যাংকে তেল থাকা সত্ত্বেও বারবার রিফিল করছেন। এমনকি কেউ কেউ তেল মজুত বা অতিরিক্ত দামে বিক্রি করছেন। অসাধু লোকের লোভ আর অসচেতনতার কারণে সাধারণ চালকরা চরম দুর্ভোগে পড়ছেন। ফিলিং স্টেশনের কর্মীরাও এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন, যেখানে অনেকেই দিনে ও রাতে বেশ কয়েকবার তেল নেওয়ার জন্য আসেন
পথের বন্ধু ফিলিং স্টেশনটিও বন্ধ দেখা যায়। স্টেশনের ফিলিং ম্যান মোহাম্মদ আলী জানান, শনি ও রোববার তেল না আসায় দুই দিন ফিলিং স্টেশনটি বন্ধ। এখানে পেট্রল, অকটেন ও ডিজেল তিনটিই দেওয়া হয়। তেলের গাড়ি সিরিয়ালে আসছে শুনেছেন। যদি আসে, তাহলে তারা তেল দিতে পারবেন।
একটু সামনে নীলক্ষেত মোড়ে কিউজি সাদমান ফিলিং স্টেশন খোলা পাওয়া যায়। সেখানেও লম্বা সিরিয়াল। পাঠাও চালক মাসুম বলেন, ‘আমি প্রায় ৪০ মিনিট সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে আছি। এখনও তেল নিতে পারিনি। তবে, শুনেছি এখানে ৫০০-৬০০ টাকার তেল দেয়।’

কিউজি সাদমান ফিলিং স্টেশনের ফিলিং ম্যান জাহিদ জানান, তারা এখানে মোটরসাইকেলে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার তেল দিচ্ছেন এবং গাড়িভেদে ১৫ থেকে ২০ লিটার তেল দেওয়া হচ্ছে। তেল সংকট আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেটা বলতে পারব না।’ তবে, অনেক স্টেশন বন্ধ থাকায় যেগুলো খোলা আছে, সেগুলোর ওপরে চাপ বেশি।
এরপর শাহবাগ এলাকার সরকারি তেল পাম্প মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও লম্বা লাইন। মোটরসাইকেলে ৬০০ টাকার এবং গাড়িতে ১৫ থেকে ২০ লিটার তেল দেওয়া হচ্ছে।
লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মোটরসাইকেল চালক সাইফুল অভিযোগ করে বলেন, ‘এই তেল পাম্প সরকারি, সেখানেই লিমিটেড তেল দিচ্ছে। তাহলে বেসরকারি তেল পাম্পের কথা কী বলব? মোটরসাইকেলে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ৬০০ টাকার তেল পাওয়া যাচ্ছে।’
সরকারি তেল পাম্প মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টারেও লিমিটেড তেল দেওয়া হচ্ছে, যা সাধারণ চালকদের ভোগান্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, অনেক বেসরকারি পাম্প বন্ধ থাকায় চাপ বাড়ছে খোলা পাম্পগুলোতে। কিছু পাম্পকর্মী দাবি করেছেন, তারা গ্রাহকদের চাহিদামতো তেল দিতে পারলেও, সংকটের মুখে তেল আসার হার কমে গেছে। চালক ও পাম্প কর্মীদের মতে, এ বিষয়ে সচেতন না হলে তেল সংকট কমবে না
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাম্পের কয়েকজন ফিলিং ম্যান জানান, অনেকেই বাসায় তেল মজুত করছেন। গাড়ি থেকে তারা তেল নামিয়ে বারবার তেল পাম্পে আসছেন। তারা এমনও দেখেছেন, বাইক বা গাড়ি দূরে দাঁড়িয়ে রেখে ট্যাংকি থেকে তেল নামিয়ে পুনরায় তেল নেওয়ার জন্য আসছেন। অনেকেই দিনে বেশ কয়েকবার এবং রাতেও তেল নেওয়ার জন্য আসেন।

অনেকের আগে ট্যাংকিতে ২০০, ৩০০ বা ৫০০ টাকার তেল ঢোকানো থাকত। তারা এখন অতিরিক্ত তেল নিচ্ছেন, যার কারণে সংকট দেখা দিচ্ছে। আবার অনেকে এখান থেকে তেল নিয়ে গাড়ি থেকে নামিয়ে অতিরিক্ত দামে বিক্রিও করছেন। এ বিষয়ে সচেতন না হলে তেল সংকট যাবে না— মন্তব্য তাদের।
এসএএ/এমএআর/
