মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার প্রভাবে সারাদেশে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বাধ্য হয়ে তেল বিক্রিতে রেশনিং পদ্ধতি চালু করেছে এবং অফিস-দোকান খোলা রাখার সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। পাশাপাশি, সারাদেশে তেলের অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে চলছে কঠোর অভিযান। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিপুল পরিমাণ অবৈধ মজুত ধরা পড়ছে, প্রশাসন তা জব্দ করছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
দেশজুড়ে জ্বালানির এই হাহাকারের প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে— অবৈধভাবে মজুত করা এই বিপুল পরিমাণ তেল এলো কোথা থেকে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তেল বিপণনে নিয়োজিত রাষ্ট্রায়ত্ত তিন প্রতিষ্ঠানের ভয়াবহ অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। পরিসংখ্যান বলছে, আনুষ্ঠানিকভাবে রেশনিং শুরুর ঠিক আগেই, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত মাত্র সাত দিনে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানি থেকে ডিলারদের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে ১ লাখ ৭৫ হাজার টন জ্বালানি তেল।
অর্থাৎ, এই সাত দিনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৫ হাজার টন করে তেল ডিলারদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে এই তিন কোম্পানি মিলে প্রতিদিন গড়ে তেল সরবরাহ করে মাত্র ১১ থেকে ১২ হাজার টন। সেই হিসাবে, রেশনিং চালুর ঠিক আগ মুহূর্তের ওই বিশেষ সময়ে প্রতিদিন অতিরিক্ত ১৩ থেকে ১৪ হাজার টন তেল বাজারে ছাড়া হয়েছে, যা সংশ্লিষ্টরা অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং নিয়মবহির্ভূত বলে মনে করছেন।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিটি কোম্পানি দিনে গড়ে ৩ হাজার ৬৬৫ টন থেকে ৪ হাজার টন পর্যন্ত তেল বিক্রি করে। কিন্তু আলোচিত ওই সাত দিনে তিন কোম্পানি মিলিয়ে প্রতিদিন বিক্রি হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার টন। এই হিসাবে প্রতিটি কোম্পানির মাধ্যমে ডিলারদের হাতে গেছে দৈনিক প্রায় ৮ হাজার ৩৩৩ টন তেল, যা স্বাভাবিক সরবরাহের দ্বিগুণেরও বেশি।
কোম্পানিভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, মেঘনা অয়েল কোম্পানি ১ থেকে ৫ মার্চ পর্যন্ত ডিলারদের কাছে বিক্রি করেছে ৫০ হাজার ৪১৩ টন তেল, যা প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার টনেরও বেশি। পদ্মা অয়েল ওই সাত দিনে বিক্রি করেছে ৪১ হাজার ২৫৮ টন তেল, দৈনিক গড়ে ৬ হাজার ৮৭৬ টন। যমুনা অয়েলও একইভাবে অতিরিক্ত তেল সরবরাহ করেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সময় ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক। তখন রেশনিং বা সংকট পুরোপুরি কার্যকর ছিল না, ঠিক সেই সময়েই এই অতিরিক্ত তেল ডিলারদের হাতে চলে গেছে। অর্থাৎ, সরকার যখন সংকট মোকাবিলায় রেশনিং চালুর আলোচনা করছিল, ঠিক তখনই কোম্পানিগুলো ডিলারদের হাতে বিপুল পরিমাণ তেল তুলে দেয়। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই তেলের বড় অংশই পরবর্তীতে কালোবাজারিদের হাতে চলে গেছে। পরে যখন সরকার রেশনিং চালু করে এবং সারাদেশে অভিযান শুরু হয়, তখনই অবৈধ মজুতের এই ভয়াবহ চিত্র সামনে আসে।
বিজ্ঞাপন
এই ভয়াবহ অনিয়মের বিষয়ে জানতে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানকে একাধিকবার কল করা হলেও তার সংযোগ পাওয়া যায়নি। এমনকি খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি। বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে বিপিসির সহকারী ব্যবস্থাপক ফারজিন হাসান মৌমিতা এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘এটি স্পষ্ট অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিপিসি এ দায় এড়াতে পারে না। মাত্র সাত দিনে এত তেল কোথায় গেছে, তা খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি। প্রকৃতপক্ষে তেল সেক্টরটি চোর দিয়ে ভরা। তারা নিজেদের পকেট ভারী করতে এমনটি করেছে। অথচ বিশ্বজুড়ে সংকটের এই সময়ে তাদের আরও সচেতন হওয়া জরুরি ছিল। কারণ ভবিষ্যতে তেলের সংকট প্রকট হবে, তা তারা আমাদের চেয়ে ভালো জানতেন। তাই রাষ্ট্রের উচিত হবে এই জঘন্য কাজে যারা জড়িত, তাদের দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করা।’
জানা গেছে, বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৬৮ লাখ টন। এর মধ্যে প্রায় ৬৩ লাখ টন তেলই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়; বাকি ৫ লাখ টন পেট্রোল ও অকটেন স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। আমদানি করা তেলের মধ্যে ১৫ লাখ টন হলো অপরিশোধিত (ক্রুড অয়েল), যা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালি হয়ে বাংলাদেশে আসে। বাকি ৪৭ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি অন্যান্য দেশ থেকে আনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ডিজেল, জেট ফুয়েল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল ও মেরিন ফুয়েল।
হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ২২ শতাংশই হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই রুটটি বন্ধ থাকায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে গভীর সংকট তৈরি হয়। এতে করে তেল বিপণনে হিমশিম খাচ্ছে রাষ্ট্রীয় ৩ প্রতিষ্ঠান। আবার, সংকটের এই সময়ে বিভিন্ন এলাকায় গোপনে মজুত অব্যাহত রেখেছে অসাধু চক্র।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাস ও চলতি এপ্রিলের ২ তারিখ পর্যন্ত দেশের ২২ জেলার ৩০টি স্থানে অবৈধভাবে জ্বালানি তেলের মজুত করার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গত ১৭ মার্চ থেকে গত সপ্তাহ পর্যন্ত অবৈধ জ্বালানির মজুতের তথ্য পাওয়া গিয়েছিল ১৭টি জেলায়। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে তা বেড়ে পৌঁছেছে ২২ জেলায়।
এমআর/এমএআর/
