স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের ব্যবহার বাতিল করে জাতীয় সংসদে একযোগে পাঁচটি সংশোধনী বিল পাস হয়েছে। আইনি কাঠামোতে বড় এই পরিবর্তনের ফলে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সিটি কর্পোরেশন পর্যন্ত নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের আনুষ্ঠানিক পথ বন্ধ হচ্ছে। তবে, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিনের দলীয় প্রভাবের কারণে অনানুষ্ঠানিক মনোনয়ন ও প্রভাব খাটানোর আশঙ্কা রয়েই গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিজ্ঞাপন
গত বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে ‘স্থানীয় সরকার ইউনিয়ন পরিষদ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘জেলা পরিষদ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘পৌরসভা (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ এবং ‘সিটি কর্পোরেশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ উত্থাপন ও কণ্ঠভোটে পাস হয়। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ও গেজেট প্রকাশের পর এগুলো কার্যকর আইনে পরিণত হবে।
নির্দলীয় কাঠামোয় ফেরা
সংশোধিত আইন অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারবে না। সব প্রার্থীই হবেন নির্দলীয়— যা বর্তমানে ‘স্বতন্ত্র’ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারব্যবস্থার পাঁচটি স্তরেই (ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি কর্পোরেশন) এই পরিবর্তন কার্যকর হবে। এর মধ্যে জেলা পরিষদ বাদে বাকি চার স্তরে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
বিজ্ঞাপন
দলীয় প্রতীক চালুর ইতিহাস
স্থানীয় সরকার নির্বাচন একসময় সম্পূর্ণ নির্দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হতো। তবে, ২০১৫ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইন সংশোধনের মাধ্যমে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করা হয়। তখন যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, এতে জবাবদিহিতা বাড়বে এবং উন্নয়ন কার্যক্রম সমন্বয় সহজ হবে।
কিন্তু বাস্তবে এর নেতিবাচক প্রভাব হিসেবে মনোনয়ন–বাণিজ্য, সহিংসতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র বিভক্তি লক্ষ্য করা যায়। ফলে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য অনেক ব্যক্তি নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন।
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়ন
দলীয় প্রতীকের ব্যবহার বন্ধের দাবি দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে উঠে আসছিল। তাদের মতে, নির্দলীয় ব্যবস্থা ফিরলে স্থানীয় পর্যায়ে যোগ্য প্রার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়বে। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমে অধ্যাদেশ জারি করে দলীয় প্রতীক বাতিল করে। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে বিষয়টি স্থায়ী আইনি রূপ দিচ্ছে।
‘অদৃশ্য মনোনয়ন’ নিয়ে শঙ্কা
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, কেবল আইন পরিবর্তনই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সুশাসন ফেরানোর জন্য যথেষ্ট নয়। তার মতে, দীর্ঘদিনের ‘দলীয়করণ সংস্কৃতি’র ফলে ব্যবস্থার যে গভীর ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি তার শঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো অতীতে যে সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে, তাতে হয়তো এখন আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মনোনয়ন দেওয়া হবে না; কিন্তু অনানুষ্ঠানিকভাবে তাদের পছন্দের প্রার্থী বা মনোনয়ন ঠিকই থাকতে পারে। এমনটা হলে যোগ্য ও নির্দলীয় ব্যক্তিরা অতীতের মতোই নির্বাচনে অংশ নিতে অনাগ্রহী হবেন এবং মাঠ থেকে দূরে থাকবেন।’
বদিউল আলম মজুমদার আরও উল্লেখ করেন যে, দলীয় ভিত্তিতে মনোনয়ন দেওয়ায় অনেক সময় যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রার্থীদের বেছে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা কমে গিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘যখন প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ে, তখন যোগ্য প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। তাই দলগুলোকে সত্যিকার অর্থেই আন্তরিক হতে হবে যাতে নির্বাচনটি পুরোপুরি নির্দলীয় থাকে।’
বর্তমান প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এখন রাজনৈতিক বিভক্তি প্রতিটি ঘরে পৌঁছে গেছে। এই অবস্থায় সরকার যদি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের সদিচ্ছা দেখায় এবং দলগুলো যদি অনানুষ্ঠানিক মনোনয়ন থেকে বিরত থাকে, তবেই একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকে।’
এসএইচআর/এমএআর/
