সকাল তখন সাড়ে দশটা। পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারে স্বর্ণের দোকানিরা কেউ দোকান খুলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে ব্যস্ত, কেউবা পয়লা বৈশাখ উপলক্ষ্যে ফুল দিয়ে দোকান সাজিয়ে ক্রেতাদের আমন্ত্রণ জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু যে উৎসবের আমেজে এলাকা মুখর থাকার কথা, সেই চিত্র খুব একটা চোখে পড়েনি।
বিজ্ঞাপন
তাঁতীবাজার ও শাঁখারীবাজারের অনেক দোকানি জানান, তারা পঞ্জিকা অনুযায়ী বুধবার বৈশাখ উদ্যাপন করবেন। ফলে আজ প্রস্তুতি থাকলেও মূল উৎসবের আয়োজন হচ্ছে না। নতুন বছরকে বরণ করতে অনেকে দোকান পরিষ্কার করছেন, আবার কয়েকটি দোকানে সাজসজ্জার কাজও দেখা গেছে।

এ এলাকার অধিকাংশ দোকানি হিন্দুধর্মাবলম্বী হওয়ায় তারা পঞ্জিকা মেনেই ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন। তাদের মতে, সরকারি হিসাবে আজ (মঙ্গলবার) পয়লা বৈশাখ হলেও পঞ্জিকা অনুযায়ী তা পড়েছে আগামীকাল। তাই হালখাতা ও বৈশাখ উদ্যাপনের মূল আয়োজনও থাকছে বুধবারে। তবে সরকারি দিনটি উপলক্ষ্যে কেউ কেউ আজই ক্রেতাদের জন্য ছোটোখাটো উপহার রেখে পুরোনো সম্পর্ক ঝালাইয়ের চেষ্টা করছেন।

পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারে কেবি স্বর্ণের দোকানের স্বত্বাধিকারী অমর ঘোষ সকাল থেকে তার ছেলে মিলন ঘোষকে নিয়ে ফুল দিয়ে দোকান সাজানোর কাজ করছেন। অমর ঘোষ ৪৫ বছর ধরে এ স্বর্ণের দোকান করে আসছেন। তিনি প্রতিবছরই বৈশাখের প্রথম দিনেই আয়োজন করেন হালখাতার। পুরোনো বছরের হিসাব চুকিয়ে নতুন বছরের বাণিজ্য শুরু করা যেন তার রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে অমর ঘোষ আক্ষেপ করে বলছিলেন, আজ থেকে বিশ বছর পূর্বেও তারা যেভাবে আমেজ-উদ্দীপনা নিয়ে বৈশাখের নানা আয়োজন করতেন, সেই আমেজ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
বিজ্ঞাপন

অমর ঘোষ ঢাকা পোস্টকে করুণার সুরে বলেন, পয়লা বৈশাখ আমাদের সেই আদিপুরুষ থেকে উৎসব হিসেবে পালন করে আসছি। কিন্তু বিগত কয়েক বছর যাবৎ একটি গোষ্ঠী পয়লা বৈশাখকে ধর্মীয় বেড়াজালে আবদ্ধ করার চেষ্টা করছে। পয়লা বৈশাখ কোনো ধর্মীয় আচার নয়, এটি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমাদের সব বাঙালির প্রাণের উৎসব। কিন্তু এ উৎসবকে একটি গোষ্ঠী ধর্মের সুরসুরি দিয়ে এটাকে এককেন্দ্রিক উৎসবে পরিণত করার পাঁয়তারা করছে। আমি সব বাঙালির প্রতি করজোড় অনুরোধ করি, পয়লা বৈশাখসহ বাঙালির সব উৎসবকে প্রাণবন্ত ও বাঁচিয়ে রাখা আমাদের সবার কর্তব্য এবং আমাদের এটি বাঁচিয়ে রাখতেই হবে।
অমিত জুয়েলার্সের ম্যানেজার মো. হেলাল জানান, পঞ্জিকা অনুযায়ী আগামীকাল মূল অনুষ্ঠান পালন করা হবে। কিন্তু সরকারি হিসেবে আজ সব ক্রেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছি। তাদের জন্য আজ বিভিন্ন ধরনের উপহার সামগ্রী রেখেছি। এর মধ্যে রাইস বল, চাবির রিং, ইলেকট্রিক কেটলি, টিফিন বাটিসহ অনেক রকমের গিফট রেখেছি।

একটু সামনে এগোতেই ঋত্বিকা জুয়েলার্সের কর্ণধার রবি ঘোষের সঙ্গে কথা হয়। দীর্ঘ ৫৫ বছর যাবৎ তিনি স্বর্ণ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে তার ছেলে বিশ্বজিৎ ঘোষ ব্যবসা পরিচালনা করেন। রবি ঘোষ বেদনার সুরে জানান, একটা সময় পয়লা বৈশাখকে ঘিরে বাঙালিরা অন্তর থেকে যে উৎসব পালন করতো, সেটা এখন আর হচ্ছে না। তবুও জীবনের শেষ বয়সে এসে ভালো লাগার একটি বিষয় হলো, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন প্রজন্ম যেভাবে বৈশাখকে বরণ করে নিচ্ছে, এটা খারাপ না। তবে এ প্রজন্মের কাছে অনুরোধ জানাই, তারা যেন বাঙালির আদি উৎসবকে হারাতে না দেন।
বিজ্ঞাপন
রাজধানীর মতিঝিলের বাসিন্দা কৃপা দাসকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান বিশ্বজিৎ। কৃপা দাস জানান, গতকাল আমাকে ফোন করে বৈশাখের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তাদের নিমন্ত্রণ পেয়েই আজ এসেছি। পুরোনো কিছু লেনদেন আছে, সেটাও আজ পরিশোধ করে নতুন বছর নতুনভাবে পালন করব।
এমএল/এসএম
