বিজ্ঞাপন

সংবাদ সম্মেলনে ডিবি প্রধান

যুবদল নেতা বাবুকে হত্যায় ২৫ লাখ টাকার চুক্তি, ভাড়া করা হয় চার শুটার

যুবদল নেতা বাবুকে হত্যায় ২৫ লাখ টাকার চুক্তি, ভাড়া করা হয় চার শুটার

রাজধানীর মিরপুরে যুবদল কর্মী মো. ইউসুফ হত্যা মামলার তদন্তে হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

ডিবির দাবি, কাফরুল থানা যুবদলের সদস্যসচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২৫ লাখ টাকায় মাগুরা ও ঝিনাইদহ থেকে চার পেশাদার খুনি ভাড়া করা হয়েছিল। তবে পরিকল্পিত ওই হামলায় লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে নিহত হন যুবদল কর্মী ইউসুফ। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গ্রেপ্তাররা হলেন- চঞ্চল, জিহাদ মোল্লা (৩০), জিয়ারুল মোল্লা (৩৯), মাসুম বিল্লাহ (২৮), নাহিদ হাসান (২১), আবির হাওলাদার (২৫), আলী হোসেন (৪৫) এবং শাফিন আহমেদ (২২)।

সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম এসব তথ্য জানান।

শফিকুল ইসলাম বলেন, কাফরুল থানার ওপেক্স গার্মেন্টসের দক্ষিণ পাশের লিংক রোডে সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের গুলিতে যুবদল কর্মী মো. ইউসুফ নিহত হন। একই ঘটনায় সবজি বিক্রেতা নালাম সরদার ও মো. মনির হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। হামলার পর পালানোর সময় স্থানীয় জনতা অস্ত্রধারী চঞ্চলকে অস্ত্রসহ আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এ ঘটনায় নিহত ইউসুফের বড় ভাই মো. মাসুদ রানা বাদী হয়ে কাফরুল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

ডিবি প্রধান বলেন, থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা মিরপুর বিভাগও ছায়া তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত চালিয়ে প্রথমে নাহিদ হাসান ও শাফিন আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জিয়ারুল, আলী হোসেন, জিহাদ মোল্লা ও মাসুম বিল্লাহকে বিভিন্ন জেলা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। আর আবির হাওলাদারকে স্থানীয় জনতা আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিল।

বামে- ইউসুফ আলী, মাঝে- হাফিজুর রহমান হাফিজ ও ডানে- হাফিজুল ইসলাম বাবু। ছবি- ঢাকা পোস্ট

তিনি বলেন, কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান হাফিজ ওরফে সিএনজি হাফিজের সঙ্গে কাফরুল থানা যুবদলের সদস্যসচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুর দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। স্থানীয় ময়লার টেন্ডার, ফুটপাতের দোকান, ব্যবসা এবং একটি টিনশেড বাড়ির দখলকে কেন্দ্র করে এ বিরোধের সৃষ্টি হয়। এই বিরোধের জেরেই হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার উদ্দেশ্যে মাগুরা ও ঝিনাইদহ অঞ্চল থেকে প্রায় ২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে পেশাদার খুনি ভাড়া করা হয়।

শফিকুল ইসলাম জানান, গত ২৯ জুন প্রথমবার হত্যাচেষ্টা চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পিস্তলে গুলি লোড করার সময় অস্ত্রে মিসফায়ার হলে ওই দিন হত্যার পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। পরে ২২ জুলাই পুনরায় ঢাকায় এসে অভিযুক্তরা মিরপুর-২ এলাকার একটি হোটেলে অবস্থান নেয় এবং ২৩ জুলাই রাতে পরিকল্পনা অনুযায়ী হামলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ঘটনার রাতে হাফিজুল ইসলাম বাবুর অফিসের সামনে অবস্থান নেওয়া সন্দেহভাজনদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা নিজেদের মিরপুর-১০ এলাকার বাসিন্দা বলে দাবি করে। পরে তাদের দেহ তল্লাশির চেষ্টা করা হলে একজন অস্ত্র বের করে যুবদল কর্মী ইউসুফের বুকে গুলি চালায়। এ সময় দুর্বৃত্তদের এলোপাতাড়ি গুলিতে সবজি বিক্রেতা নালাম সরদার ও মনির হোসেন আহত হন।

মিরপুরে যুবদলের একজন নেতা এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের আরেকজন নেতার হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তাদের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। সন্ত্রাসীদের কোনো নির্দিষ্ট দল নেই এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে তাদের সন্ত্রাসী হিসেবেই বিবেচনা করা হবে। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ২৫ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল, যার পেছনে মূলত এলাকার ময়লা নিয়ন্ত্রণ, জমি দখল এবং ফুটপাত দখলের মতো বিষয়গুলো জড়িত ছিল। গ্রেপ্তারকৃতরা জানিয়েছে, হাফিজুর রহমান হাফিজ (সিএনজি হাফিজ) তাদের ভাড়া করে নিয়ে এসেছিল।

নিহত যুবদল কর্মী ইউসুফ আলী

অস্ত্রের উৎস এবং মিরপুরে হিজড়াদের দুটি গ্রুপের মহড়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা সব সময় সতর্ক অবস্থানে রয়েছি এবং অনেক ক্ষেত্রে ঘটনা ঘটার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অনেক সময় অপরাধীরা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করে ব্র্যান্ডিং করার চেষ্টা করে, তবে বর্তমানে তাদের সরাসরি কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।

৫ আগস্টের পর ঢাকায় ঘটা ৩০-৩৫টি হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা দেখা যাচ্ছে; সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুলিশ কোনো রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করছে না। ভিকটিম এবং টার্গেট, উভয় পক্ষেরই রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরা হচ্ছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ছবি- গ্রেপ্তার আসামিরা

তদন্তে আরও জানা গেছে, আসন্ন কাউন্সিলর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই হামলার পরিকল্পনা করা হয়ে থাকতে পারে। হাফিজ বর্তমানে এই পরিকল্পনার মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত এবং তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। চুক্তির ২৫ লাখ টাকার মধ্যে প্রাথমিকভাবে কিছু টাকা অগ্রিম দেওয়া হয়েছিল এবং তাদের হোটেল ভাড়া ও খাওয়ার খরচ বহন করা হয়েছিল। পুলিশ একটি অস্ত্র উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে এবং অন্যগুলোর উৎস সন্ধানে কাজ করছে।

অস্ত্রের ডিলার হিসেবে বিদেশে অবস্থানরত ইব্রাহিম বা আব্বাসের নাম আসার প্রসঙ্গে পুলিশ জানায়, যে অস্ত্র বহন করছে বা ব্যবহার করছে তাকেই আইনের আওতায় আনা হচ্ছে; এখানে তথ্য গোপন করার কোনো সুযোগ নেই।

ডিবি জানায়, এ ঘটনায় কাফরুল থানায় হত্যা ও অস্ত্র আইনে পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। হত্যা মামলাটি বর্তমানে ডিবির তদন্তাধীন রয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত কার্যক্রম চলমান এবং মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। 

এমএসি/এমএসএ