বঙ্গবন্ধু যে বাংলাদেশ চেয়েছিলেন

Kushal Baran Chakraborty

০১ আগস্ট ২০২২, ০৮:৩৬ এএম


বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের অনন্য বিশ্বখ্যাত ভাষণ অভূতপূর্ব অতুলনীয়; ভাষণের তুলনা হয় না। সেই ৭ মার্চের অনন্য বিশ্বখ্যাত ভাষণের পরে আমার দৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধুর অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ হলো ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশ গণপরিষদে দেওয়া ভাষণ।

এই ভাষণের শুরুতে বঙ্গবন্ধু স্মরণ করিয়ে দেন বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্যের সাথে সাথে বাঙালিদের বিপ্লব-বিদ্রোহের স্বাভিমানের রক্তের অক্ষরে লেখা জাজ্বল্যময় ইতিহাস।

তিনি স্মরণ করেন চট্টগ্রাম জালালাবাদ পাহাড়ে স্বাধীনতার নায়ক মাস্টারদা সূর্য সেনকে। তিনি স্মরণ করেন বাংলার সকল স্বদেশি, বিপ্লবীদের যারা দেশমাতৃকার জন্যে হাসতে হাসতে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলে আত্মাহুতি দিয়েছেন।

আরও পড়ুন : সম্প্রীতি ফিরে আসার প্রত্যাশায়

৪ নভেম্বরের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং পরিশেষে ধর্মনিরপেক্ষতাকে অসাধারণভাবে ব্যাখ্যা করেন। যে কথাগুলো দেশের সকল প্রগতিশীল বা আওয়ামী রাজনীতির সাথে যুক্ত সকলের স্মরণে, মননে এবং কর্মে থাকা উচিৎ বলে মনে করি।

কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার যেমন সকল বামপন্থীদের অবশ্যপাঠ্য, ঠিক একইভাবে বঙ্গবন্ধুর ভাষণগুলো বিশেষ করে ৭ মার্চ এবং ৪ নভেম্বরের এই দুটি ভাষণ দেশের বিশেষ করে প্রগতিশীল রাজনৈতিক ভাবাদর্শের সাথে যুক্ত সকলের জানা এবং ঠোঁটস্থ থাকা প্রয়োজন।

বর্তমানে দেশে ধর্মান্ধতা, অসহিষ্ণুতা যেভাবে জ্যামিতিক হারে বেড়ে চলছে, সেই প্রেক্ষাপটে সকল প্রগতিশীল, মুক্তবুদ্ধির মানুষদের মাঝেই এক অজানা আশঙ্কা বিরাজ করছে। তবে আশঙ্কার আঁচ একটু বেশিই পড়ছে সংখ্যালঘুদের মনোজগতে এবং যাপিত জীবনে।

৪ নভেম্বরের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং পরিশেষে ধর্মনিরপেক্ষতাকে অসাধারণভাবে ব্যাখ্যা করেন।

সেই প্রেক্ষাপটে, বঙ্গবন্ধুর ৪ নভেম্বরের খসড়া সংবিধান অনুমোদন উপলক্ষে ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কিত যে যুক্তি উপস্থাপন করেছেন, তা আমাদের সকলেরই জানা একান্ত প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্ম কর্ম করার অধিকার থাকবে। আমরা আইন করে ধর্মকে বন্ধ করতে চাই না এবং করবো না।

আরও পড়ুন : অসাম্প্রদায়িক মানবিক বঙ্গবন্ধু

ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে, তাদের বাঁধা দেওয়ার ক্ষমতা এই রাষ্ট্রের কারো নেই। হিন্দুরা তাদের ধর্ম পালন করবে, কারো বাঁধা দেওয়ার ক্ষমতা নেই। বৌদ্ধরা তাদের ধর্ম পালন করবে, খ্রিস্টানরা তাদের ধর্ম করবে, তাদের কেউ বাঁধা দিতে পারবে না। আমাদের শুধু আপত্তি হলো এই যে, ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না।

পঁচিশ বৎসর আমরা দেখেছি ধর্মের নামে জুয়াচুরি, ধর্মের নামে শোষণ, ধর্মের নামে বেইমানি, ধর্মের নামে অত্যাচার, ধর্মের নামে খুন, ধর্মের নামে ব্যভিচার—এই বাংলাদেশের মাটিতে এসব চলেছে।

ধর্ম অত্যন্ত পবিত্র জিনিস। পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না। যদি কেউ বলে ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়েছে, আমি বলব, ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়নি, সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করার ব্যবস্থা করছি।

যদি কেউ বলে গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকার নেই, আমি বলব সাড়ে সাত কোটি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে যদি গুটিকয়েক লোকের অধিকার হরণ করতে হয়, তাহলে তা করতেই হবে।’

আরও পড়ুন : বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সত্যিই বেদনাদায়ক 

এই ঐতিহাসিক ভাষণের শেষপ্রান্তে বঙ্গবন্ধু যে কথাগুলো বলেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং বর্তমান সময়ের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যৎ বংশধরেরা যদি সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে শোষণহীন সমাজ গঠন করতে পারে, তাহলে আমার জীবন সার্থক, শহীদদের রক্তদান সার্থক।’

বাংলাদেশ আজ গর্বের সাথে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী অতিক্রম করেছে। তবে অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে আমরা দেখছি, আমাদের সংস্কৃতির অভিমুখকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন প্রকার দেশে বিদেশে ষড়যন্ত্রের জাল বিছানো হচ্ছে।

যার নির্দেশনায় এই দেশ স্বাধীন হয়েছে, সেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ২০২০ সালে বিজয়ের মাস ডিসেম্বর মাসেই ক্ষত-বিক্ষত করা হয়েছে। জাতির জন্যে এর থেকে লজ্জার আর কী হতে পারে?

দেশের আনাচে-কানাচে সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জুড়ে স্বাধীন সার্বভৌম এই জাতিরাষ্ট্রে আজও পাকিস্তানের প্রেতাত্মারা গিজগিজ করছে। এরা প্যাঁচার মতো সূর্যের আলোকে সহ্য করতে পারে না।

আরও পড়ুন : সম্প্রীতি কোথায়?

স্বাধীনতার সূর্যের আলো এই অন্ধকার প্রিয় প্যাঁচাদের অপছন্দ। তারা অন্ধকারে ঘাপটি মেরে বসে। অন্ধকারই তাদের বড় প্রিয়, দিনের আলোতে তাদের ভয় এই বুঝি সবাই অন্ধকারস্বরূপ সর্বসমক্ষে প্রকাশিত হয়ে গেল। তারা আজও স্বপ্ন দেখে, তাদের পেয়ারের পাকিস্তানের।

আজও তারা পাকিস্তানের উর্দু ভাষার প্রেমে মশগুল। বাংলাদেশের সাথে খেলা হলেও স্টেডিয়ামে তারা পাকিস্তানের পতাকা বহন করে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তি পাকিস্তানকে নির্লজ্জ সমর্থন করে।

বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্ম কর্ম করার অধিকার থাকবে। আমরা আইন করে ধর্মকে বন্ধ করতে চাই না এবং করবো না।

আজও প্রতিনিয়ত এসব ঘটনার বিভিন্ন দৃষ্টান্ত আমরা চোখের সম্মুখে দেখছি। আমরা যদি প্রশ্ন রাখি, স্বাধীন দেশে পাকিস্তানি প্রেতাত্মাদের শক্তি এবং সামর্থ্য এত বৃদ্ধি হওয়ার কারণ কী? তবে আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাব, এদের সংখ্যা খুব বেশি নয়; অত্যন্ত খুবই নগণ্য। কিন্তু এই স্বল্পসংখ্যক মানুষেরা অত্যন্ত সক্রিয়।

আরও পড়ুন : তোমাদের যা বলার ছিল, বলছে কি তা বাংলাদেশ?

তারা সর্বদা জেগে আছে পাকিস্তানি ভাবাদর্শের চিন্তায় মশগুল হয়ে। পক্ষান্তরে, কিছু মানুষ ছাড়া স্বাধীনতার স্বপক্ষীয় মূলস্রোতের মানুষেরা স্বাধীনতার অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ প্রচারে উদাস।

স্বাধীনতার বিরুদ্ধ শক্তির বাড়বাড়ন্ত দিনে দিনে অসহনীয় হয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। তাই অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়গুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে বা দলীয়ভাবে চর্চা করে তৃণমূল পর্যায়ে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।

আমি ঠিক জানি না কয়জন বিষয়টি যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছে ১৯৭১ সালের অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ দিনেদিনে শুধু কথা সর্বস্ব বা বক্তৃতা সর্বস্ব হয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন : রাজনৈতিক সম্প্রীতির দেশ!

বিষয়টি নিয়ে দেশের অধিকাংশ মানুষের আজও পরিষ্কার ধারণা নেই। তাই এর সুযোগ নিচ্ছে, দেশে বসবাসরত পাকিস্তানের প্রেতাত্মারা।

আগস্টের এই শোকাবহ মাসে শুধুমাত্র শোক নয়। বঙ্গবন্ধুর উক্ত বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্রের এই প্রধান চার মূলনীতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকারের মাস।

বঙ্গবন্ধুর আকাঙ্ক্ষিত আদর্শ নিজ জীবন এবং জাতীয় জীবনে বাস্তবায়িত করে শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করাই হোক, রক্তাক্ত আগস্টের দীপ্ত অঙ্গীকার।

কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী ।। সহকারী অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Link copied