মোদির সফরে সামাজিক যোগাযোগ আরও বাড়ুক

Palash Ahasan

২৫ মার্চ ২০২১, ০১:৫৭ পিএম


মোদির সফরে সামাজিক যোগাযোগ আরও বাড়ুক

লেখাটি শুরু করতে চাই ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শংকরের প্রেস ব্রিফিং থেকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, মুজিব শতবর্ষ এবং ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তিতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশে আসা উপলক্ষে দুই দিনের সফরে ৪ মার্চ ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। ৫ তারিখে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ওই প্রেস ব্রিফ করেছিলেন। এর আগে তারা দু’জন দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসেছিলেন।

জয়শংকর বলছিলেন, আজকের দিনে কূটনৈতিক সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ভিত্তি সংযুক্তি বা কানেকটিভিটি। সাধারণত সংযুক্তির বিষয়টি শুনলেই মনে হয় অবকাঠামোগত। সংযুক্তি যোগাযোগ বিষয়ক অবকাঠামো সন্দেহ নেই। কিন্তু মানুষে মানুষে যোগাযোগও জরুরি। সেটিও এই কানেকটিভিটির অংশ। এরই উন্নয়নে এখন কাজ করছে দুই দেশ। কারণ দুই দেশের সম্পর্ক মানেই দুই দেশের জনগণের সম্পর্ক। তিনি বলছিলেন, ‘আমাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় ৫০ বছর পার হয়েছে, আরও ২০ বছর পরে কী করা যেতে পারে। আমি বলব সংযুক্তির উন্নয়ন।’ সেদিনই তিনি আভাস দিয়েছিলেন এবার ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরে যেকোনো আলোচনায় প্রধান ইস্যুই থাকবে সংযুক্তি।

আধুনিক কূটনীতি আসলেই তাই। মানুষের জন্যই তো এত কিছু। তাই সরাসরি তাকে বা তাদের না নিয়ে কোনো আলোচনা বা উদ্যোগ সফল হওয়ার নয়। আজকের দিনের কূটনীতিকরা এ সত্য বুঝেছেন। কূটনীতিকরা এও বুঝেছেন যে, নানা তথ্য এবং তত্ত্ব থাকে আলোচনার টেবিলে। সেই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ মানুষের মাঝে প্রভাব ফেলা বেশ কঠিন ও সময় সাপেক্ষ। কিন্তু যারা এসব তত্ত্বের উপকার ভোগ করবেন, তাদের মধ্যে যদি সংযোগ ঘটিয়ে দেওয়া যায় তাহলে অনেক কঠিন কাজও সহজ হয়ে যায়। এবার মোদির সফর সূচি পাওয়ার পর সেই বোঝাবুঝি আরও পরিষ্কার হয়ে যায়। একে কূটনীতি চর্চার একটি নতুন দিগন্ত না বললে অবিচার হয়। 

মোদির সফর সূচি দেখে বোঝা গেল, আসলে সংযুক্তির যে তত্ত্ব জয়শংকর দিচ্ছিলেন এবার তার অনুশীলন দেখা যাবে। শুরুতে আসি মানুষে মানুষে সংযুক্তির প্রসঙ্গে। ২৬ মার্চ ঢাকার আনুষ্ঠানিকতা শেষে ২৭ মার্চ মোদি যাবেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার দূর গ্রাম ঈশ্বরীপুরে। সেখানে ঐতিহাসিক যশোরেশ্বরী মন্দির ঘুরে দেখবেন। ওই দিনই যাবেন গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মভূমি এবং সমাধিস্থল টুঙ্গিপাড়ায়। সেখান থেকে যাবেন গোপালগঞ্জের আরেক উপজেলা কাশিয়ানীর ওড়াকান্দিতে। ওড়াকান্দিতে এক সময়ের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী মতুয়া সম্প্রদায়ের মন্দিরে পূজা দেবেন মোদি।

আজকের দিনের কূটনীতিকরা এ সত্য বুঝেছেন। কূটনীতিকরা এও বুঝেছেন যে, নানা তথ্য এবং তত্ত্ব থাকে আলোচনার টেবিলে। সেই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ মানুষের মাঝে প্রভাব ফেলা বেশ কঠিন ও সময় সাপেক্ষ। কিন্তু যারা এসব তত্ত্বের উপকার ভোগ করবেন, তাদের মধ্যে যদি সংযোগ ঘটিয়ে দেওয়া যায় তাহলে অনেক কঠিন কাজও সহজ হয়ে যায়।

ঢাকার বাইরের মোদির এই সফরের অনেক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ অনেকে দিচ্ছেন। কোনো বিশ্লেষণের বিরোধিতা না করেই আমি বলতে চাই, এই তিনটি ভ্রমণের মধ্যে মানুষে মানুষে যোগাযোগের কূটনীতি খুবই পরিষ্কার। কারণ হিসেবে শুরুতেই আসতে চাই ঈশ্বরীপুরের যশোরেশ্বরী মন্দিরে। ইতিহাস বলছে, এই মন্দির সত্যযুগের পুরাণাশ্রয়ী কালী মন্দির বা শক্তিপীঠ। এরপর ত্রয়োদশ শতাব্দীতে লক্ষ্মণ সেন মন্দির সংস্কার করেছেন। পরে পনেরশ’ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে এই মন্দিরের সংস্কারের ইতিহাসে যুক্ত হয়েছিলেন মহারাজা প্রতাপাদিত্য।

যিনি দোর্দণ্ড প্রতাপে মুঘল শাসকের বিরুদ্ধে নিজেকে স্বাধীন ঘোষণা করেছিলেন। প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রী যাওয়ার জন্য এমন জায়গা খুঁজে বের করলেই তো দুই দেশের মানুষের মানসিক যোগাযোগ বেড়ে যায়। সেই উদ্দেশ্যের প্রভাব এরইমধ্যে পড়তে শুরু করেছে গোটা সাতক্ষীরা জেলায়।

বঙ্গবন্ধুর জন্মভূমি টুঙ্গিপাড়ায় যাওয়ার মধ্যেও রয়েছে সামাজিক কানেকটিভিটির প্রভাব। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর বিশাল ভাবমূর্তি রয়েছে। তার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানানোর মধ্য দিয়ে তিনিও নিশ্চয়ই সেই বিশালত্বের অংশীদার হবেন। তবে সামাজিক যোগাযোগের সবচেয়ে বড় নিদর্শন মোদি তৈরি করবেন গোপালগঞ্জেরই আরেক উপজেলা কাশিয়ানির ওড়াকান্দি সফরের মধ্য দিয়ে। যেখানে জন্ম মতুয়া সম্প্রদায়ের গুরু হরি চাঁদ ঠাকুরের। প্রায় দুশ’ বছর আগে যিনি একটি পিছিয়ে পড়া জাতিকে পাদপ্রদীপের আলোয় এনেছিলেন। আজ যার অনুসারী সারা পৃথিবীতে ৫ কোটিরও বেশি। সেখানে সফরের সিদ্ধান্ত নিয়ে কূটনীতিক হিসেবে আবারো সাফল্য দেখালেন মোদি। এর মধ্য দিয়ে তিনি সবাইকে বুঝিয়ে দিলেন মাত্র ২০ মিনিটের সফরে খুব সহজে একত্রে বাঁধা যায় কয়েক কোটি মানুষ। বিনি সুতার এমন কানেকটিভিটি সত্যিই বিরল।  

প্রসঙ্গক্রমে আবারো ফিরতে হচ্ছে মোদির সফর নিয়ে জয়শংকরের সংবাদ সম্মেলনে। সেখানে তিনি বলছিলেন, ভারত বাংলাদেশের সম্পর্ক গৎবাঁধা সম্পর্কের ঊর্ধ্বে। অবকাঠামোগত সংযুক্তির ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশকে তাদের পররাষ্ট্রনীতির প্রথম প্রতিবেশী সূত্র অনুসরণ করছে। তিনি আরও জানান, যোগাযোগের ক্ষেত্রে কেবল দক্ষিণ এশিয়াতেই নয়, ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলেও মূল প্রতিবেশী এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে। পাশাপাশি তিনি অবকাঠামো যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইস্ট অ্যাক্টের কথা বলছিলেন। তিস্তাসহ ৭টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন নিয়েও কথা বলছিলেন তিনি। এখনকার আলোচনায় যেহেতু দুই দেশের মানুষে মানুষে যোগাযোগের প্রসঙ্গটা উজ্জ্বল হয়ে উঠছে, সেহেতু পানি বণ্টন এবং সামাজিক যোগাযোগের ওপর কিছুটা আলো ফেলা যেতে পারে।

ভারত বাংলাদেশের সম্পর্ক গৎবাঁধা সম্পর্কের ঊর্ধ্বে। অবকাঠামোগত সংযুক্তির ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশকে তাদের পররাষ্ট্রনীতির প্রথম প্রতিবেশী সূত্র অনুসরণ করছে।

জয়শংকর বলছিলেন, অমীমাংসিত হেন বিষয় নেই যা নিয়ে দুই দেশ কাজ করছে না। কিন্তু ইদানীং কালের গণমাধ্যম এবং মোদির সফরের আলোচ্যসূচি মিলিয়ে দুই দেশের পানি ব্যবস্থাপনা ইস্যুতে আলোচনা হওয়ার খুব সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। যদিও মোদির এবারের সফরটি একেবারেই শুভেচ্ছা সফর। তাই নিয়মানুযায়ী এখানে সমঝোতা স্মারক ছাড়া কোনো চুক্তি হওয়ার সুযোগ নেই। তবুও যৌথ নদী কমিশনের সাম্প্রতিক বৈঠকের ওপর ভিত্তি করে জোর আলোচনা হলে একটা দীর্ঘ সমস্যা সমাধানের দিকে কিছুটা হলেও তো এগোয়।

আর যেখানে এবারের সফরের কাঠামোর মধ্যে দুই দেশের মানুষে মানুষে যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, সেখানে পানি চুক্তি বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা স্বাভাবিক। কারণ দুই দেশের নদী পাড়ে কোটি কোটি মানুষ পানির অব্যবস্থাপনা নিয়ে কষ্টে আছেন। একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় আলোচনার পথ ধরে সেই দীর্ঘ বঞ্চিত মানুষের মধ্যে একটা আত্মিক যোগাযোগ হতে পারে। নদী পাড়ের এই মানুষগুলো দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের যেকোনো বৈঠকের দিকে সবসময় চেয়ে থাকে তীর্থের কাকের মতো।

পলাশ আহসান ।। গণমাধ্যমকর্মী

Link copied