নতুন বছরে প্রত্যাশা, আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ

দেখতে দেখতে আরও একটি বছর কেটে গেল। আমাদের ব্যক্তিজীবন থেকে ঝরে গেল আরও একটি বছর। বাংলাদেশেরও বয়স বাড়লো এক বছর। ৫৪ বছরের প্রাপ্তবয়স্ক আমাদের এই দেশ, পেছনে হাজার বছরের সংগ্রামী ইতিহাস দেশটির ফাউন্ডেশন।
বিদায়ী এই বছরে নানা ঘটনা, দুর্ঘটনা, অঘটন সবমিলিয়ে আমাদের ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন একাকার হয়ে গেছে। যেদিন রাতে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও ছায়ানটে আগুন দিলো উত্তেজিত জনতা, সেই নির্ঘুম রাতে আমি ঘুমন্ত সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে ভীষণ অসহায়ত্ব বোধ করছিলাম।
মনে হচ্ছিল, আমরা যারা সন্তানের পিতা-মাতা তারা প্রত্যেকে অভিশপ্ত, আমাদের প্রতি মুহূর্তে সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ নয়, তাদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। যারা নিঃসন্তান, কখনো সন্তান হবে না, তাদের সেই মুহূর্তের জন্য সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছিল। এমন রাত আমাদের জীবনে প্রায়ই আসে, এমনই দুর্ভাগ্য আমাদের।
৫৪ বছরে আমরা বসবাসের জন্য নিরাপদ একটা দেশ তৈরি করতে পারিনি। নানা কিছু ‘নেই নেই’-এর মধ্যে অভাব অনটন আছে, সমস্যা আছে, সংকট আছে কিন্তু যেটা আরও তীব্রভাবে আছে সেটা হলো নিরাপত্তাহীনতা। কেন এই নিরাপত্তাহীনতা?
সুন্দরবনের বাঘ তো দেশের ভেতরে প্রবেশ করে সব মানুষ ধরে ধরে খেয়ে ফেলছে না! ফিলিস্তিনের মতো যুদ্ধাক্রান্তও না আমরা। তাহলে কেন এদেশের মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে সবসময়? কার কারণে, কাছ কাছ থেকে এই নিরাপত্তাহীনতা?
ভাই ভাইয়ের কাছে নিরাপদ না। প্রতিবেশী প্রতিবেশীর কাছে নিরাপদ না। ব্যবসায়ীর কাছে নিরাপদ না ক্রেতা। শিক্ষকের কাছে নিরাপদ না শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীর কাছে নিরাপদ না শিক্ষক। নেতার কাছে নিরাপদ না কর্মী। শিশুর নিরাপত্তা নেই বড়দের কাছে। নারীর নিরাপত্তা নেই সমাজে, পরিবারে।
মোটকথা, মানুষ মানুষের কাছে নিরাপদ না। মানুষের কাছে মানুষের নিরাপত্তাহীনতা। এই মানুষ শত্রুদেশের নাগরিক না, স্বদেশেরই। যে দেশের মানুষ সবাই মিলে শ্রেণি-জাত-ধর্ম ভুলে একসঙ্গে লড়াই করে, শহীদ হয়ে, এই দেশটা স্বাধীন করেছে।
স্বাধীনতার এত বছর পর এসে আমরা দেখি, সেই দেশের রাজনীতিতে একটা দলের পতন হলে সেই দলের নেতাকর্মী-সমর্থক সবাইকে আত্মগোপনে চলে যেতে হয়। তাদের বাড়িঘরে আগুন জ্বলে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লুট হয় এবং আবার যখন ক্ষমতার পালাবদল হবে তখনো বর্তমান ক্ষমতাসীনদের অনুরূপভাবে আত্মগোপনে চলে যেতে হবে। তাদেরও অনুরূপ পরিণতি হবে। এমনই হিংসাত্মক বিদ্বেষপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি লালন করছে পক্ষ বিপক্ষের সব দল।
পঞ্চাশ বছরের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিচার বিভাগ স্বাধীন হলো না। নির্বাহী বিভাগ স্বাধীন হলো না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পার্টিঅফিস বানিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। পার্টি অফিস বানানো হয়েছে অন্যান্য দপ্তর থেকে শুরু করে পুলিশ দপ্তরকে।
রাজনৈতিক কর্মী আর আমলার মধ্যে কে বেশি দলদাস আলাদা করা কঠিন হয়ে গেছে। একজন পুলিশের প্রধান যার হাতে দেশের জনমানুষের প্রাণ ও সম্পদের নিরাপত্তার দায়িত্ব, তিনিই হয়ে উঠেছেন লুটপাটের নেতা। অবৈধ সম্পদের পাহাড় বানিয়েছেন। সম্পত্তি দখল আর অর্থ পাচার করে দেশ ছেড়েছেন।
...ক্ষমতাভিত্তিক রাজনীতি কখনো সুনাগরিক তৈরি করে না। আদর্শভিত্তিক রাজনীতি সেই কাজ করে। বাংলাদেশে সেই রাজনৈতিক পরিবেশ আমরা কখনোই পাইনি। পেয়েছি বিভেদের রাজনীতি।
এমন একটা দেশ আমরা পেয়েছি, যে দেশের অধিকাংশ মানুষ জান্নাতে বা স্বর্গে যেতে চান সততা, নৈতিকতা ও ন্যায়নিষ্ঠতার জোরে না; ধর্মানুভূতির জোরে। এই কারণে ধার্মিক বা ধর্মপ্রাণ মানুষের দেশে আমরা ন্যায্যতাভিত্তিক রাষ্ট্র পাইনি, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ পাইনি। পেয়েছি একটা ধর্মানুভূতি-ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র।
একটি রাষ্ট্র (পড়ুন সরকার) মানুষের সন্তুষ্টি অর্জন করবে তার সুশাসন, সম্পদের সুষম বণ্টন, দুর্নীতিমুক্ত, জবাবদিহিতামূলক প্রশাসনব্যবস্থা ইত্যাদির মাধ্যমে। কিন্তু রাষ্ট্র (পড়ুন সরকার) যদি নিজে জনগণের বিশ্বাসকে পুঁজি করে, সংখ্যাগুরু জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাসকে নিজের বিশ্বাস হিসেবে প্রতিমুহূর্তে জাহির করতে যায়, সংখ্যাগুরু জনগণকে প্রতিনিয়ত বোঝাতে চেষ্টা করে তার ধর্ম রাষ্ট্র (পড়ুন রাষ্ট্রীয় কর্তাব্যক্তিরা) চর্চা করে, তখন সেই রাষ্ট্রের কাছ থেকে আর সুশাসন প্রত্যাশা করা যায় না।
অথচ মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের প্রত্যয় ছিল অসাম্প্রদায়িক, সুশাসন ও ন্যায্যতাভিত্তিক রাষ্ট্রকাঠামো তৈরি করা। সেই কাঠামোর স্বরূপ তুলে ধরতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতার মূল কথাটি হলো : খাঁটি মুসলমান, খাঁটি হিন্দু, খাঁটি খ্রিস্টান বা খাঁটি বৌদ্ধ তৈরি করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নয়। তার দায়িত্ব সুনাগরিক তৈরিতে সাহায্য করা।’
ক্ষমতাভিত্তিক রাজনীতি কখনো সুনাগরিক তৈরি করে না। আদর্শভিত্তিক রাজনীতি সেই কাজ করে। বাংলাদেশে সেই রাজনৈতিক পরিবেশ আমরা কখনোই পাইনি। পেয়েছি বিভেদের রাজনীতি। আমাদের রাজনীতি ধর্মীয় বিভেদ তৈরি করেছে, শ্রেণিবৈষম্য সৃষ্টি করেছে, অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর জন্য বাঙালি জাতীয়তাবাদকে আগ্রাসী জাতীয়তাবাদে পরিণত করেছে, আধুনিক বিজ্ঞান-চেতনার পরিবর্তে পশ্চাৎপদ ধ্যানধারণার পৃষ্ঠপোষকতা করেছে।
আগামীতে আমরা নতুন সময়ে এসবের ধারাবাহিকতা চাই না। আমরা সত্যিকার অর্থে নতুন বাংলাদেশ চাই। বদলে যাওয়া বাংলাদেশ। খুব বেশি কিছু না, আধুনিক সিঙ্গাপুরের নির্মাতা লি কুয়ান ভগ্ন রাষ্ট্র সংস্কারের বেসিক হিসেবে যে তিনটি নীতি অবলম্বন করেছিলেন, আমি সেই তিনটি নীতিমালার বাস্তবায়ন চাই এদেশে।
প্রথমত—যে কোনো মূল্যে দুর্নীতিকে হারাতে হবে। শাসনক্ষমতায় যারা থাকবেন তারা আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে নিজের দলীয় কর্মীদেরও দুর্নীতির কারণে জেলে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত থাকবেন।
দ্বিতীয়ত—যেকোনো মূল্যে নির্বাহী বিভাগকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থেকে শতভাগ মুক্ত করে মেধানির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রভাবও যেন নির্বাহী বিভাগকে আক্রান্ত করতে না পেরে তেমন সিস্টেম গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত—শাসকগোষ্ঠীকে মনে রাখতে হবে, ‘একটি দেশ পারিবারিক ব্যবসা নয়।’ রাষ্ট্রকে প্যাট্রিমোনিয়াল স্টেটে পরিণত করা যাবে না। শুধু পরিবার না, দলীয় লোকজনের ক্ষমতাও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শাসনক্ষমতায় যে দল থাকবে, সে দল জনতার কাছে দায়বদ্ধ, দলের নেতাকর্মীর কাছে না। বরঞ্চ দলের নেতাকর্মীদের রাষ্ট্রাচারের প্রতি আনুগত্য এবং আত্মত্যাগের ভেতর দিয়ে জনগণের প্রতি সেই দায় মেটানো হবে। রাজনীতি হবে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নয়, সেবামূলক পেশা।
...এমন একটা দেশ চাই যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপত্তার জন্য ভিনদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা ভাবতে হবে না। এমন একটা রাজনৈতিক ব্যবস্থা চাই যেখানে ক্ষমতা পরিবর্তনের সাথে সাথে কোনো বাড়িতে আগুন জ্বলবে না, লুট হবে না কোনো কারখানা।
আমার প্রত্যাশা অনেকের কাছে অবাস্তব বলে মনে হতে পারে। কেউ কেউ ভাবতে পারেন আমি ইউটোপিয়ান চিন্তা করছি। কিন্তু আমার বিশ্বাস, দেশের প্রতিটি মানুষ এটাই প্রত্যাশা করেন। প্রতিটি রাজনৈতিক দল এই প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় আসে।
আমি সেই অর্থে নতুন কিছু বলিনি। যে আকাঙ্ক্ষা সামনে রেখে ত্রিশ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছে, জনযুদ্ধে অংশ নিয়েছে কোটি কোটি জনতা, আমি সেই আকাঙ্ক্ষার কথা উচ্চারণ করেছি মাত্র। যে কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখে কালে কালে সংগ্রাম করেছে এদেশের মানুষ, আমি তাদের স্বপ্নের কথা বলেছি। এই স্বপ্ন আমাদের জাতিগত স্বপ্ন, এই আকাঙ্ক্ষা আমাদের সমষ্টিক আকাঙ্ক্ষা।
আগামী বছর এবং আগামী দিনগুলোয় আমি এই কালেক্টিভ আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন চাই। এমন একটা রাষ্ট্র চাই যেখানে সন্তানের নিশ্চিন্ত ঘুমন্ত চেহারা দেখে আমাকে আতঙ্কিত হতে হবে না।
এমন একটা দেশ চাই যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপত্তার জন্য ভিনদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা ভাবতে হবে না। এমন একটা রাজনৈতিক ব্যবস্থা চাই যেখানে ক্ষমতা পরিবর্তনের সাথে সাথে কোনো বাড়িতে আগুন জ্বলবে না, লুট হবে না কোনো কারখানা। এমন একটা সমাজ চাই যেখানে বিরোধীপক্ষও মুক্তমত প্রকাশের স্বাধীনতা পাবে। মোটের উপর আমি একটা মানবিক রাষ্ট্র চাই। সবচেয়ে বিপরীত মত ও পথের লোকটাকেও যাতে জন্তু মনে না হয়। সবাইকে আমি মানুষ হিসেবে দেখতে চাই।
শুভ হোক ২০২৬—আমাদের জন্য, এদেশের জন্য এবং এ পৃথিবীর জন্য।
মোজাফ্ফর হোসেন : কথাসাহিত্যিক
