শীতের শীতবস্ত্র

“স্নান সমাপন করিয়া যখন
কূলে উঠে নারী সকলে
মহিষী কহিলা, ‘উহু! শীতে মরি,
সকল শরীর উঠিছে শিহরি,
জ্বেলে দে আগুন ওলো সহচরী--
শীত নিবারিব অনলে।’’’
রবীন্দ্রনাথের ‘সামান্য ক্ষতি’ (রচনা: ১৯৩৮) কবিতায় কাশীর রাজমহিষী করুণা মাঘের শীতে সখীদের নিয়ে নদীতে অবগাহন শেষে শীত কমাতে কিছু দরিদ্রের পর্ণকুটিরে আগুন জ্বালাতে তার সখীদের নির্দেশ দেন। মালতী নামে এক সখী এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানালেও অন্যরা মেনে নেয়।
দরিদ্র কিছু প্রজার কুটিরে আগুন ধরিয়ে, উত্তাপ উপভোগ করে রাজপ্রাসাদে ফিরলে ক্রুদ্ধ রাজা মহিষীকে দণ্ড দেন। দরিদ্র প্রজারা ইতিমধ্যেই রাজাকে নালিশ জানিয়েছিলেন। ন্যায়বিচারক রাজার আদেশে রানীর দেহ থেকে তার দামি বসন-ভূষণ খুলে, ভিখারিনীর বেশ পরিয়ে, প্রাসাদ থেকে নির্বাসন দেওয়া হয়। কিছুদিন পথে পথে গরিব প্রজার কষ্ট বুঝে আর মনের পরিবর্তন ঘটলেই শুধু রানী প্রাসাদে ফিরতে পারবেন।
শুধু কি দরিদ্র প্রজা? শীতে ঘর গরম করার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ জ্বালানি কাঠ ও গরম কাপড়ের অভাবে মারা গেছেন দরিদ্র স্কটিশ কবি রবার্ট বার্নস, যার অমর, কালজয়ী গীতবাণী ও সুর-মণ্ডিত একাধিক গানের ভাবানুবাদ করেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।
যার একাধিক গানের সুর আজ সারা পৃথিবীর কোটি কোটি গ্রাহকের মোবাইল ফোনে রিং টোন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে অভাব ও শৈত্য রবার্ট বার্নসের মৃত্যুর কারণ বলে মনে করা হয়। তার ভুবন-বিখ্যাত কয়েকটি গানের মধ্যে রয়েছে—
“Ye banks and braes o' bonnie Doon” (যার বাংলা ভাবানুবাদ হলো ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে’) বা (যার বাংলা ভাবানুবাদ হলো ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ এবং প্রতি বছর ৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাতে গোটা ইংরেজি ভাষী দুনিয়ায় এই গানের সুর বেজে ওঠে) বা ‘My Love is a Red Red Rose’। অবশ্য সারা পৃথিবীতেই ২৫ জানুয়ারি বা এই কবির জন্মদিনে ‘বার্নস নাইট’ পালন করা হয়। শীত বাস্তবিকই এতটা নিষ্করুণ!
রাজধানীসহ সারা দেশেই তীব্র শৈত্যপ্রবাহ চলছে। হুট করেই যেন এক রূপোলী কুয়াশার চাদরে আবৃত হয়ে পড়েছে পুরো শহর। বিত্তশালী মানুষের মনে এই শৈত্য বা কুয়াশা প্রবাহ ক্ষণিকের রোমান্টিকতা জাগিয়ে তুললেও আমাদের দেশের ‘না অতি শীত না অতি গরম’ আবহাওয়ার সাধারণ মানুষের জন্য এই অবিরত কুয়াশা ও তীব্র শীত খুব কি সুখকর?
শিশু, বৃদ্ধ এবং শ্রমজীবী মানুষেরই যেন বিশেষ করে দুর্ভোগের শেষ নেই। আর নগরীর বহুতল ভবনের বদলে গ্রামের খড় বা টিনের ঘর, শহরের ঝুপড়ি বস্তি বা নিতান্ত পথে বাস করেন যারা? কয়েক দিনের টানা কুয়াশা প্রবাহে সকাল ও সন্ধ্যায় রাস্তা-ঘাটে যানবাহন চলাচলেও সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
আরও পড়ুন
জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে যখন আরব অঞ্চলে তুষারপাত ও মেরু দেশে বরফ গলার সূত্রপাত দেখা দিচ্ছে, বাংলাদেশেও কী এবারের শীতে অকল্পনীয় ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে? মাঝে আবার রাতের বেলা শুরু হলো মৃদু কুয়াশা বৃষ্টি। যেন রুশ কবি মায়াকোভস্কির কবিতায় শৈত্য নিয়ে লেখা সেই অমোঘ পঙ্ক্তির আবহ ছড়িয়ে পড়েছে আমাদের বাংলাদেশেও—
“...কিন্তু পৃথিবী যেখানে
ঝাপসা হতে থাকে তুন্দ্রার দিগন্তরেখায়,
নদীগুলো যেখানে দর কষাকষি করে উত্তুরে বাতাসের সাথে…”
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে যে, ২১ জেলায় শৈত্যপ্রবাহ শীতে কাঁপছে দেশ। এর মধ্যে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ যশোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৮। এছাড়া সর্বনিম্ন তাপমাত্রা চুয়াডাঙ্গায় ৮, রাজশাহীতে ৮ দশমিক ৪, ভোলা ও খুলনায় ৮ দশমিক ৫, মাদারীপুর ও খেপুপাড়ায় ৯, বরিশালে ৯ দশমিক ১ এবং সাতক্ষীরায় ৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয়েছে।
বিবিসি বাংলা-এর এক প্রতিবেদনে আবার বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশে সাধারণত শীত পড়ে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে। এসময় হিমালয়ের পাদদেশ থেকে ঠাণ্ডা বাতাস উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এসময় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কমে যায়। ফলে শীত অনুভূত হয়।
২০২২ সালের ‘জনসংখ্যা ও গৃহ শুমারি’ প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট ২২,১৮৫ জন গৃহহীন মানুষ রয়েছেন। এদের ভেতর ঢাকাতেই ১০,০০০-১৫,০০০ গৃহহীন মানুষ আছেন যাদের জীবন কাটে পথে। এই শীতে কেমন আছেন তারা?
বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫ (১)-এ নাগরিকদের ‘জীবনের মৌলিক চাহিদা সমূহ বিশেষত: খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয় বা বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা’ পাওয়ার দাবি পূরণ করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক কর্তব্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সংবিধানের বাণী আর কতটুকুই বা পূরণ হয়?
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ থেকে নেপালের মতো একাধিক রাষ্ট্রে ‘জেন-জেড বা জেন-জি’ প্রজন্ম বিদ্যমান শাসন-ব্যবস্থা উপড়ে ফেলে, রীতিমতো অভ্যুদয় ঘটিয়েছে। আমরা- পূর্ববর্তী প্রজন্মের মানুষেরা হয়তো এত বিস্ফোরণ ঘটাতে পারিনি।
তবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই ‘প্রগতির পরিব্রাজক দল (প্রপদ)’-এর মতো ছোট ছোট পাঠচক্রের পক্ষ থেকেও পোস্টার ছাপিয়ে, প্রতি শীতে কখনো পার্বত্য চট্টগ্রাম আবার কখনো উত্তর বাংলার শীতার্ত মানুষের জন্য টিম গঠন করে শীতবস্ত্র নিয়ে গেছে যত দুর্গম জায়গায়। তারুণ্যের এই ইতিবাচক উচ্ছ্বাস এখনো নিশ্চিত রয়েছে। তাহলেই রাষ্ট্র হিসেবে অত ভয়ের কিছু নেই।
আসুন, ‘বিপ্লব’ বা ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ তো অনেক ভারি ভারি শব্দ। সবার আগে বাড়ির পাশের গলিতে একটি গোটা শীত রাত জমে পার করা শিশুকে বাসার পুরোনো কম্বল বা আপনারই ব্যবহৃত পুরোনো কাপড় দিয়ে আমরা জীবনের ইতিবাচকতার জয়গান শুরু করি।
অদিতি ফাল্গুনী : কবি, কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক
