স্মার্ট কৃষি যখন প্রত্যাশা

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মানবসভ্যতার উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ইন্টারনেট অব থিংস (IoT), বিগ ডাটা, রোবোটিক্স, ড্রোন প্রযুক্তি ও স্মার্ট সেন্সরের সমন্বয়ে গড়ে উঠছে এক নতুন ডিজিটাল বিশ্ব। এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরের প্রভাব শুধু শিল্প ও সেবা খাতেই সীমাবদ্ধ নয়; কৃষি, যা মানবজীবনের মৌলিক ভিত্তি, তাও গভীরভাবে রূপান্তরের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর কৃষি আজ বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আবাদযোগ্য জমি হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, শ্রম সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার চাপ কৃষিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। প্রচলিত কৃষি ব্যবস্থায় এসব সমস্যার টেকসই সমাধান ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তি কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।
ডিজিটাল ও স্মার্ট কৃষির মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হচ্ছে। সয়েল সেন্সর দিয়ে মাটির পুষ্টি ও আর্দ্রতা পরিমাপ, ড্রোনের মাধ্যমে সার ও বালাইনাশকের নির্ভুল ব্যবহার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে রোগ-পোকা পূর্বাভাস এবং বিগ ডাটার বিশ্লেষণে ফলন পূর্বানুমান, এসবই আগামীর কৃষিকে আরও দক্ষ, লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব করে তুলছে।
ফলে কৃষি আর শুধু অভিজ্ঞতা-নির্ভর পেশা নয়; এটি রূপ নিচ্ছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর এক আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থায়। এই বাস্তবতায় চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও আগামীর কৃষি বিষয়টি কেবল প্রযুক্তিগত আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষকের জীবনমান উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জাতীয় অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই আগামীর কৃষিকে বুঝতে হলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপট, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জসমূহ সমন্বিতভাবে অনুধাবন করতে হবে।
কৃষিতে আগামীর ভাবনা:
বিশ্ব আজ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস (IoT), বিগ ডাটা, রোবোটিক্স ও ড্রোন প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিটি স্তরে আমূল পরিবর্তন এনে দিচ্ছে। এই পরিবর্তনের ঢেউ কৃষিকেও স্পর্শ করেছে গভীরভাবে। ঐতিহ্যগত অভিজ্ঞতা ও অনুমান নির্ভর কৃষি ব্যবস্থা ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে তথ্যভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও স্মার্ট কৃষিতে। আগামীর কৃষি আর শুধু মাঠের শ্রম নয়, বরং ডেটা, বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিণত হচ্ছে।
ডিজিটাল ও স্মার্ট কৃষির পথে বাংলাদেশ:
ডিজিটাল ও স্মার্ট কৃষির মূল শক্তি হলো তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। আগে কৃষক মাটির অবস্থা, সেচের প্রয়োজন কিংবা সারের মাত্রা নির্ধারণ করতেন অভিজ্ঞতা ও অনুমানের ওপর ভিত্তি করে। এতে অনেক সময় অতিরিক্ত সার ও পানি ব্যবহার হতো, যা একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়াত, অন্যদিকে পরিবেশ ও মাটির ক্ষতি করত।
প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিকে টেকসই ও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হলো যুব সমাজ, যুবক ও যুবতিদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা। আজকের যুবসমাজ প্রযুক্তি-সচেতন, উদ্ভাবনী চিন্তায় পারদর্শী এবং দ্রুত নতুন ধারণা গ্রহণে সক্ষম।
এখন সয়েল সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাটির রিয়েল-টাইম পুষ্টিমান (NPK), আর্দ্রতা, pH, তাপমাত্রা ও লবণাক্ততা জানা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে জমির প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী সার ও পানি প্রয়োগ করা যায়, যা উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি অপচয় ও পরিবেশগত ক্ষতি কমায়।
অন্যদিকে, ড্রোন প্রযুক্তি কৃষিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। ড্রোনের মাধ্যমে নির্ভুলভাবে সার, বীজ, পানি ও বালাইনাশক স্প্রে করা সম্ভব হচ্ছে। এতে একদিকে শ্রম ও সময় সাশ্রয় হচ্ছে, অন্যদিকে মানুষের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমছে। বিশেষ করে বালাইনাশক স্প্রে করার সময় কৃষক যে স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি হন, ড্রোন ব্যবহারে তা অনেকাংশে হ্রাস পাচ্ছে। একই সঙ্গে ড্রোন ফসলের ওপর নজরদারি করে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা চিহ্নিত করতে পারে, ফলে পুরো জমিতে নয়, শুধু প্রয়োজনীয় স্থানে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আগামীর কৃষির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। AI-ভিত্তিক মডেল ও অ্যাপ্লিকেশন ফসলের রোগ-পোকা শনাক্তকরণ, আবহাওয়া বিশ্লেষণ এবং রোগের আগাম পূর্বাভাস দিতে সক্ষম। কৃষক যদি আগেভাগেই জানতে পারেন কোনো রোগ বা পোকার আক্রমণ হতে পারে, তাহলে তিনি সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
এতে ক্ষতির পরিমাণ কমবে এবং অতিরিক্ত বালাইনাশক ব্যবহারের প্রবণতাও হ্রাস পাবে। এভাবে AI কৃষিকে আরও টেকসই ও পরিবেশবান্ধব করে তুলছে।
একই সঙ্গে বিগ ডাটা বিশ্লেষণ কৃষি ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বহু বছরের আবহাওয়া তথ্য, মাটির ডেটা, ফসলের ফলন, বাজারদর ও কৃষি ব্যবস্থাপনার তথ্য বিশ্লেষণ করে ফলনের পূর্বানুমান করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে কৃষক শুধু উৎপাদনের সিদ্ধান্তই নয়, বাজারজাতকরণ ও লাভ-লোকসানের পরিকল্পনাও আগেভাগে করতে পারছেন। নীতিনির্ধারকদের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগাম পরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হয়।
কৃষিতে যুবক ও যুবতিদের সম্পৃক্ততা:
প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিকে টেকসই ও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হলো যুব সমাজ, যুবক ও যুবতিদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা। আজকের যুবসমাজ প্রযুক্তি-সচেতন, উদ্ভাবনী চিন্তায় পারদর্শী এবং দ্রুত নতুন ধারণা গ্রহণে সক্ষম।
আরও পড়ুন
স্মার্টফোন, অ্যাপস, সেন্সরভিত্তিক চাষাবাদ, ডিজিটাল মার্কেটিং ও ই-কমার্সের মাধ্যমে তারা কৃষিকে একটি আধুনিক ও লাভজনক পেশায় রূপ দিতে পারে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব প্রযুক্তির মাধ্যমে যুবক-যুবতীরা ফসলের রোগ-পোকা পূর্বাভাস, সঠিক সময়ে সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন খরচ কমানো এবং বাজার সংযোগ সহজ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গ্রাম থেকে শহরমুখী কর্মসংস্থানের চাপ কমাতে আধুনিক কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপ, এগ্রি-টেক উদ্যোগ ও উদ্যোক্তা তৈরিতে যুব সমাজই হতে পারে চালিকাশক্তি। একই সঙ্গে নারীদের অংশগ্রহণ কৃষিতে নতুন মাত্রা যোগ করে, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করে।
অতএব, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব যুগে কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে এবং ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুব শক্তিকে দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ ও নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে কৃষির মূল স্রোতে সম্পৃক্ত করাই একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ।
ডিজিটাল কৃষি বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ:
বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে স্মার্ট কৃষির গুরুত্ব আরও বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অনিয়মিত বৃষ্টি, খরা, লবণাক্ততা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। এই বাস্তবতায় ডিজিটাল কৃষি প্রযুক্তি কৃষকদের জন্য একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি শুধু উৎপাদন বাড়ায় না, বরং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় সহায়তা করে এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করে।
আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি গ্রহণে প্রাথমিক বিনিয়োগ বড় বাধা। তাই প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য স্বল্পসুদ বা সুদমুক্ত ঋণ, লিজিং সুবিধা ও কিস্তিভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
তবে স্মার্ট কৃষির এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রযুক্তির উচ্চ মূল্য, দক্ষ জনবলের অভাব, প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ার সীমাবদ্ধতা এখনো বড় বাধা। তাই প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব, কৃষক প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও বিস্তার।
ডিজিটাল কৃষি বাস্তবায়নে করণীয়:
আইনি ও নীতিগত জটিলতা দূরীকরণ: কৃষিতে AI, IoT, ড্রোন ও স্মার্ট যন্ত্র ব্যবহারে বিদ্যমান লাইসেন্স, অনুমোদন ও বিধিনিষেধ সহজ ও কৃষকবান্ধব করতে হবে। বিশেষ করে ড্রোন ব্যবহারে স্পষ্ট গাইডলাইন ও মাঠপর্যায়ে অনুমতির প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি।
সহজ ও সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা: আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি গ্রহণে প্রাথমিক বিনিয়োগ বড় বাধা। তাই প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য স্বল্পসুদ বা সুদমুক্ত ঋণ, লিজিং সুবিধা ও কিস্তিভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ইনস্যুরেন্স: ড্রোন, স্মার্ট মেশিন ও সেন্সরভিত্তিক যন্ত্রপাতির জন্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনামূলক ইনস্যুরেন্স সুবিধা থাকলে কৃষকের আস্থা বাড়বে এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে আগ্রহ তৈরি হবে।
যন্ত্রপাতির সহজ প্রাপ্যতা ও সার্ভিস সেন্টার: উপজেলা বা ব্লক পর্যায়ে স্মার্ট যন্ত্রপাতির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ ও দ্রুত সার্ভিস দেওয়ার জন্য নির্ভরযোগ্য সার্ভিস সেন্টার গড়ে তোলা জরুরি।
প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন: কৃষকদের জন্য হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, ডেমো প্লট, TOT কর্মসূচি এবং যুবকদের মাধ্যমে প্রযুক্তি সহায়তা কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে, যাতে প্রযুক্তি ব্যবহারের জ্ঞান মাঠপর্যায়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই করণীয়গুলো বাস্তবায়ন করা গেলে প্রান্তিক ও অবশিষ্ট কৃষকরাও চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ভিত্তিক আধুনিক কৃষির অংশীদার হতে পারবে। এতে উৎপাদন বাড়বে, খরচ কমবে এবং টেকসই ও লাভজনক কৃষি ব্যবস্থার দিকে দেশ এগিয়ে যাবে।
সবশেষে বলা যায়, আগামীর কৃষি মানেই ডিজিটাল ও স্মার্ট কৃষি। যেখানে তথ্য হবে সিদ্ধান্তের ভিত্তি, প্রযুক্তি হবে কৃষকের সহায়ক এবং কৃষি হবে লাভজনক, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব। অভিজ্ঞতার সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে কৃষিকে আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থায় রূপান্তর করাই হবে ভবিষ্যৎ কৃষির মূল লক্ষ্য।
সমীরণ বিশ্বাস : কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
[email protected]
