শীত ও বায়ু দূষণে নারী-শিশু বেশি আক্রান্ত হয় কেন?

শীতকাল আসলেই চারদিকের পরিবেশ হয় শুষ্ক। এই শুষ্ক পরিবেশে বাড়ে বায়ু দূষণ। বায়ু দূষণে সব বয়সী শিশু, নারী, পুরুষ আক্রান্ত হয়, তবে বেশি আক্রান্ত হয় শিশু ও নারী। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কলকারখানার ধোয়া এবং নগরায়ন সাথে ধূমপায়ীদের আধিক্যের কারণে বায়ু দূষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ক্ষতিকর পদার্থ বাতাসে মিশে যাওয়ার ফলে বায়ু দূষিত হচ্ছে এবং এই দূষিত বায়ু শ্বাসের মাধ্যমে যখন আমরা গ্রহণ করি তখন শরীরে প্রবেশ করে আমাদের ফুসফুসকে প্রথমে দুর্বল করে দেয় এবং পরবর্তীতে শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বায়ু দূষণের প্রভাবে আমাদের জলবায়ুও মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। শীতকালের শুষ্ক আবহাওয়া দূষণের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।
বায়ু দূষণের ফলে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। দূষিত পরিবেশে বেশিদিন থাকার কারণে মস্তিষ্কের গ্রে মেটার-এর ঘনত্ব কমে যেতে পারে, যা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাকে কমিয়ে দেয় এবং এর ফলে হতাশা বা আচরণে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। বায়ু দূষণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে তোলে তাই বারবার ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শ্বাসতন্ত্রের রোগ সৃষ্টি হয়।
দুই বছর আগের একটা ঘটনা মনে পড়লে আমি এখনো স্মৃতিকাতর হই। সন্ধ্যা হলে বয়স্ক একজন নারী আমাদের বাসায় আসত কাজে সাহায্য করার জন্য এবং দেখা হলে খুব সুন্দর করে মিষ্টি হাসি দিয়ে জানতে চাইত আমি কেমন আছি। শীতের সময় আমার প্রিয় খাবার ছিল চালের রুটি আর নারকেল দিয়ে রান্না করা হাঁসের মাংস বা চিংড়ি মাছের ঝোল। উনি এটা জানতো তাই মাঝে মাঝেই শখ করে চালের রুটি বানাতো।
ছোটবেলায় শীতের সময় বাড়িতে বেড়াতে গেলে পিঠা, রুটি এগুলো খুবই আনন্দ নিয়ে একসাথে সবাই মিলে খেতাম কিন্তু এখন তো বাড়িতে কেউ নেই, তাই গ্রামের বাড়ি আর যাওয়া হয় না। কিন্তু আমাদের বাসায় যিনি সাহায্য করতে আসতেন উনি আমাকে তাদের মতোই আদর করে পিঠা বানিয়ে দিতেন।
ওনার চিকিৎসা আমি করতাম, শীতে গরম কাপড় দিতাম কিন্তু উনি অসুস্থ হলে কিছুতেই হাসপাতালে যেতে চাইতেন না। আমাকে বলতেন যে, আমি যা ওষুধ দেবো তাই খাবেন কিন্তু হাসপাতালে যাবেন না।
একদিন শীতের সময় হঠাৎ বাসায় এসে আম্মাকে বললেন যে, চালের রুটি বানাবেন এবং তাই করলেন। বানিয়ে আমাকে খুব যত্ন করে খেতে দিলেন আর যাওয়ার সময় বলে গেলেন দুইদিন পর এসে আমাকে আবারও বানিয়ে দেবেন। সেই যে গেলেন আর ফিরে এলেন না।
বাড়ি গিয়ে শীতে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন কিন্তু তার ছেলেমেয়ে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারেননি, উনি বাসায় মারা গিয়েছিলেন। ওনার মৃত্যু সংবাদ শোনার পর খুব কষ্ট হচ্ছিল। শীতকাল এলেই ওনার কথা খুব মনে পড়ে।
সবাই উনার মতো নন, নারীরা ঘরের কাজ করতে গিয়ে কিছুতেই নিজের কথা ভাবতেই চায় না। নিজের প্রতি অবহেলা আর ঠিকমতো যত্ন না নেওয়ার জন্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ফলে মৃত্যু ঝুঁকি অনেক বেশি বেড়ে যায়।
আরও পড়ুন
কেউ কর্মক্ষেত্রে বা কেউ পথে চলতে গিয়ে ঠিকমতো যদি গরম কাপড় পরিধান না করে বের হয় তখন তাকে ঠান্ডায় কাবু করে, অসুস্থ হতে হয়। তখন স্বাস্থ্যতন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে যেমন নিউমোনিয়া। যাদের হাঁপানি আছে তাদের তীব্রতা আরও বেশি বেড়ে গিয়ে খারাপের দিকে যেতে পারে।
দেশে উন্নয়ন হচ্ছে, আমরা আমাদের দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি কিন্তু এই উন্নয়ন করতে গিয়ে আমাদের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি কতটা বাড়ছে-তা কি ভাবছি? পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা এখন বায়ু দূষণজনিত রোগের শিকার বেশি।
এছাড়া গর্ভাবস্থায় নারীদের বায়ু দূষণের প্রভাবে বিভিন্ন ধরনের শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা দেখা দেয়, বিশেষ করে বায়ু দূষণ এবং ঠান্ডার প্রভাবে গর্ভস্থ ভ্রূণের বেশি সমস্যা দেখা দেয়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অপরিণত অবস্থায় জন্মগ্রহণ, কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ। হাঁপানি ও ফুসফুসের রোগসহ বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যগত সমস্যা তো আছেই।
শীতকালে সবচেয়ে বেশি হয় সর্দি-কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও ত্বকের সমস্যা। কারণ নারী ও শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং ঠান্ডা, শুষ্ক বাতাসের কারণে ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। জ্বর, শ্বাসকষ্ট বা কাশি বেশি হলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি এবং ডাক্তারের পরামর্শ মতো হাসপাতালে ভর্তি হওয়া উচিত।
শিশুদের জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত। ঘরে ও বাইরে থাকাকালীন পর্যাপ্ত গরম পোশাক, পুষ্টিকর খাবার, বুকের দুধ এবং কুয়াশায় বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের না করার মাধ্যমে এই ঝুঁকি কমানো যায়।
শীতকালে হাসপাতালগুলোয় ভিড় বাড়তে থাকে রোগীদের, বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, হাঁপানি, চোখ ও ত্বকের নানা সমস্যা নিয়ে। শীতকালীন বায়ু দূষণ শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকট কারণ স্বাস্থ্য ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। দূষিত বাতাস শ্বাসনালীর মাধ্যমে যখন আমরা গ্রহণ করি তখন স্বাভাবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়।
ফলে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সহজেই সংক্রমণ ঘটাতে পারে। হাঁপানি ও COPD রোগীদের ক্ষেত্রে শীতকাল হয়ে ওঠে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়। বিশেষ করে হাঁপানি যাদের আছে তারা বেশি শ্বাসকষ্ট অনুভব করে।
এই সংকট থেকে উত্তরণে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব পর্যায়ে উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রয়োজনে মাস্ক ব্যবহার করা জরুরি। ঘরের ভেতর বাতাস পরিষ্কার রাখতে জানালা-দরজা নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং ধুলাবালি কমানো দরকার। শীতে কুসুম গরম পানি পান, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং শিশুদের টিকা সময়মতো দেওয়া উচিত।
শিশুদের ধূমপানের ধোঁয়া থেকে দূরে রাখতে হবে, কারণ পরোক্ষ ধূমপান বায়ু দূষণের মতোই ক্ষতিকর।
এছাড়া বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া বিকল্প নেই। অবৈধ ইটভাটা বন্ধ, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহার এবং শিল্পকারখানায় নির্গমন নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা একই সঙ্গে দূষণের মাত্রা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। শীতকালীন বায়ু দূষণ নীরব ঘাতকের মতো নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্য অকেজো করে দিচ্ছে।
প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ে যাবে। সুস্থ নারী ও শিশু মানেই সুস্থ সমাজ—এই সত্যটি উপলব্ধি করেই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
ডা. আয়শা আক্তার : উপ-পরিচালক, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট টিবি হাসপাতাল, ঢাকা
