পরিবেশ রক্ষায় ও বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে নতুন সরকারের অঙ্গীকার ও প্রত্যাশা

একবিংশ শতাব্দীতে মানবসভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিবেশ সংরক্ষণ ও বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ এখন বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বায়ু দূষণের কারণে প্রতি বছর পৃথিবীতে প্রায় ৭০ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে এর বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮.১ ট্রিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশে এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫-২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বায়ু দূষণের ফলে দেশের জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধি প্রতি বছর প্রায় ৪.৪ শতাংশ হ্রাস পাচ্ছে। আইকিউএয়ার (IQAir) এর সাম্প্রতিক তথ্যমতে, ঢাকা শহর প্রায়ই বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে এবং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা PM₂.₅ এর মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার চেয়ে গড়ে ১০-১৫ গুণ বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল ল অ্যান্ড পলিসি, কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল আর্থ সায়েন্স ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক (সিআইইএসআইএন) এবং ম্যাকল মেক বেইল ফাউন্ডেশন যৌথভাবে বিশ্বের ১৮০টি দেশের পরিবেশের অবস্থা নিয়ে ২০২৪ সালে একটি ইনডেক্স প্রকাশ করে। এতে বায়ুমান, বিশুদ্ধ পানি, নিরাপদ স্যানিটেশন, জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং কার্বন নিঃসরণের মতো বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। ওই ইনডেক্সে পরিবেশ স্কোর ধরা হয় ১০০, যেখানে বাংলাদেশের স্কোর মাত্র ১৫ এবং ১৭২তম স্থানে অবস্থান করছে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) ২০২৫ সালের গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্সে ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণকারী নতুন সরকারের সামনে এই ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় মোকাবিলাই এখন প্রধান জাতীয় চ্যালেঞ্জ।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, প্রতি বছর বিশ্বে বায়ু দূষণের ফলে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের (সিআরইএ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বায়ুদূষণে প্রতিবছর ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জন মানুষ মারা যাচ্ছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিএনপি তাদের ২০২৬ সালের ইশতেহারে পরিবেশকেন্দ্রিক পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছে।
বনায়নের ক্ষেত্রে সরকার ‘সবুজ বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা দেশের মোট বনভূমি ২৫ শতাংশে উন্নীত করতে সাহায্য করবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে, নারী, যুব এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সমান অংশগ্রহণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৩৫০,০০০ এরও বেশি ‘গ্রিন জব’ বা সবুজ কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে। একই সাথে, ১০,০০০ নতুন নার্সারি উদ্যোক্তা তৈরি করা হবে, যার ফলে ২৫০,০০০ এরও বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
বৃক্ষরোপণকে বৈজ্ঞানিক এবং টেকসই করার জন্য, একটি ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা-নির্দেশিত ‘ভূমি তালিকা মানচিত্র’ চালু করা হবে, যা অঞ্চলের উপর ভিত্তি করে প্রজাতি নির্ধারণে উপযুক্ত জমি সনাক্ত করতে সহায়তা করবে। নদী, খাল, চর এবং মেঘনা মোহনায় নবগঠিত দ্বীপগুলোতে দ্রুত বৃক্ষরোপণের জন্য বিশেষায়িত ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, যা দেশব্যাপী সবুজায়নকে ত্বরান্বিত করবে।
নদী তীর এবং খালের তীরে একটি ‘গ্রিন ক্যানেল ব্যাংক মডেল’ চালু করা হবে, যেখানে বৃক্ষরোপণ, জৈব-উদ্ভাবনের মাধ্যমে একটি নতুন সবুজ অর্থনীতি তৈরি করা হবে। নগর পার্ক, ফুটপাতের ধারে এবং খেলার মাঠের পাশে উপযুক্ত গাছ লাগানো হবে এবং ভবন নির্মাণ বিধিমালায় বাধ্যতামূলক ‘গ্রিন মেট্রিক্স’ মান অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
প্রধান শহরগুলোতে, ‘সবুজ ভবন সার্টিফিকেশন’ ব্যবস্থা এবং কর প্রণোদনার মাধ্যমে ছাদ বাগানসহ বনায়নকে উৎসাহিত করা হবে। কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে বাংলাদেশের বার্ষিক এক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত কার্বন ক্রেডিট আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বিএনপি এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেবে। তিনটি প্রধান ক্ষেত্র (শক্তি, কৃষি এবং বর্জ্য) থেকে কার্বন নির্গমন কমাতে একটি পরিমাপ, প্রতিবেদন এবং যাচাইকরণ (Measurement, Reporting & Verification-MRV) ব্যবস্থা চালু করা হবে, সেই সাথে পুনঃবনায়নও করা হবে, যার মাধ্যমে বিএনপি দেশে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কার্বন বাণিজ্য বাজার প্রতিষ্ঠা করবে।
২০৩০ সালের মধ্যে, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের কমপক্ষে ২০ শতাংশ সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎ এবং বর্জ্য থেকে শক্তির মতো নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করা হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে হ্রাস করে একটি গ্রিন এনার্জি-নির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে।
ধীরে ধীরে সারা দেশে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা হবে, যার মাধ্যমে বর্জ্য থেকে জ্বালানি ও জৈব সার উৎপাদন করা হবে এবং পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণমুক্ত হবে। বিএনপির লক্ষ্য হলো একটি পরিষ্কার, নিরাপদ এবং অর্থনৈতিকভাবে পুনরুজ্জীবিত বাংলাদেশ, যেখানে বর্জ্য একটি নতুন সম্পদে পরিণত হবে এবং পরিবেশ হলো উন্নয়নের শক্তি। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে, বিএনপি একটি ‘সার্কুলার ফিউচার মডেল’ প্রতিষ্ঠা করবে, যেখানে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরিত করা হবে।
নগরায়ন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, শিল্পকারখানার নির্গমন, যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলাবালি এবং বর্জ্য পোড়ানোর ফলে বায়ুর মান ক্রমাগত অবনতি হচ্ছে। একটি কার্যকর ও দায়িত্বশীল সরকার চাইলে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিবেশ ও বায়ুর গুণগত মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে পারে।
বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ অনুসারে নির্দিষ্ট জেলা এবং অঞ্চলে উপাদান পুনরুদ্ধার কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। উপরন্তু, ইলেকট্রনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতিটি বিভাগে ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য কারখানা স্থাপন করা হবে, যেখান থেকে মূল্যবান ধাতু সংগ্রহ করা হবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে, আনুষ্ঠানিক খাতে ২০০,০০০ অনানুষ্ঠানিক কর্মীকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
দেশব্যাপী বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় থ্রি আর (হ্রাস, পুনর্ব্যবহার, পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ) নীতি বাস্তবায়ন করা হবে, যার মাধ্যমে পাঁচ বছরের মধ্যে প্লাস্টিক বর্জ্য ৩০ শতাংশ হ্রাস করা হবে। বিএনপি সরকার শিল্প ও মানব বর্জ্য দ্বারা দূষিত ভূমি এবং জলাশয় পুনরুদ্ধার করবে। বর্জ্য থেকে শক্তি প্রকল্প চালু করা হবে, যা শহরের জ্বালানি চাহিদা পূরণ করবে এবং দূষণ কমাবে।
অতিরিক্তভাবে, বর্জ্য এবং প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার থেকে জৈব সার উৎপাদনের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্ষতিকারক প্লাস্টিক এবং বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ধীরে ধীরে নিষিদ্ধ করা হবে এবং শিল্প ও গৃহস্থালিতে পরিবেশবান্ধব বিকল্প উপকরণের ব্যবহার উৎসাহিত করা হবে। ঢাকা শহরকে দূষণের কবল থেকে রক্ষা করার জন্য দ্রুত, উপযুক্ত এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দেশের শহরগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থাপনা দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নদী ও জলাশয় রক্ষায় নবনির্বাচিত সরকার ‘নদী বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানকে সামনে রেখে শিল্প-কারখানার বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা রোধ করতে প্রতিটি টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানায় অনলাইন মনিটরিং সমৃদ্ধ স্মার্ট ইটিপি (ETP) স্থাপন করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা সরাসরি পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যাসহ ঢাকার চারপাশের নদীগুলো দখলমুক্ত করে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে সেগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন, পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে ১৯৯৭ সালের ‘ইউনাইটেড নেশনস ওয়াটার কনভেনশন’ স্বাক্ষরসহ তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়ন; যৌথ নদী কমিশনকে (JRC) শক্তিশালীকরণের মতো পদক্ষেপের উল্লেখ রয়েছে ইশতেহারে।
সরকার দেশব্যাপী ২০,০০০ কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন করার মহাপরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। পরিবহন খাতের দূষণ রোধে বিএনপির ২০২৬ সালের ইশতেহারে ‘স্মার্ট ট্রান্সপোর্টেশন’ ব্যবস্থার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে যানজট নিরসন এবং গণপরিবহনকে আরও কার্যকর ও সহজলভ্য করার জন্য গণপরিবহন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও উন্নত করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ লক্ষ্যে, ঢাকার আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল এবং অবৈধ ট্রাক স্ট্যান্ডগুলো ধীরে ধীরে শহরের বাইরে উপযুক্ত স্থানে স্থানান্তর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। দুই চাকার গাড়ির জন্য পৃথক লেন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। রাস্তাঘাট এবং ফুটপাত দখলমুক্ত করা হবে এবং অনিরাপদ, ধীরগতির এবং অনুপযুক্ত যানবাহন ধীরে ধীরে অপসারণ করা হবে।
জনসাধারণ-বেসরকারি অংশীদারিত্বের আওতায় এবং যানজট কমাতে পরিবেশবান্ধব কর্মসূচির অংশ হিসেবে, রাজধানী ঢাকায় একটি মোবাইল অ্যাপ-ভিত্তিক বিশেষ রাইড-শেয়ারিং সাইকেল পরিষেবা চালু করা হবে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য শহরেও এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের পরিবেশ সচেতন করতে স্কুল পাঠ্যক্রমে ‘সবুজ স্বেচ্ছাসেবা’ যুক্ত করা হবে। ‘জলবায়ু যুব ফেলো’ চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে নির্বাচনী অঙ্গীকার করেছে।
নগরায়ন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, শিল্পকারখানার নির্গমন, যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলাবালি এবং বর্জ্য পোড়ানোর ফলে বায়ুর মান ক্রমাগত অবনতি হচ্ছে। একটি কার্যকর ও দায়িত্বশীল সরকার চাইলে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিবেশ ও বায়ুর গুণগত মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে পারে।
এবারের নির্বাচিত সরকার যদিও বায়ু ও শব্দ মান রক্ষায় কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা উল্লেখ করেনি। এক্ষেত্রে সরকারকে বায়ু ও শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণের একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রকাশ করে এবং সেই অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দূষণের সাথে সম্পৃক্ত সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন বিভাগ, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকারের মতো সব বিভাগের সমন্বয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।
এছাড়াও বায়ু, শব্দ ও পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং কঠোর আইনি প্রয়োগের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে হবে। এই ক্ষেত্রে বায়ু দূষণ রোধে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হবে ‘ক্লিন এয়ার অ্যাক্ট’ বা ‘নির্মল বায়ু আইন’ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা। উক্ত আইনে নির্দিষ্ট সময়সীমা, লক্ষ্য (যেমন পাঁচ বছরে PM₂.₅ ৩০ শতাংশ কমানো), দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা এবং বাজেট নির্ধারণ থাকতে হবে।
এই আইনের আওতায় সরকারকে প্রথমেই ঢাকার চারপাশের অবৈধ ইটভাটাগুলো সম্পূর্ণভাবে উচ্ছেদ করতে হবে এবং সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিক জিগজ্যাগ বা হাইব্রিড হফম্যান কিলন প্রযুক্তির ইট পোড়ানোর পদ্ধতিকে উৎসাহিত করতে হবে। এছাড়াও দূষণের উৎসভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইসাথে শিল্পখাতে কঠোর পরিবেশগত মানদণ্ড কার্যকর করতে হবে এবং শিল্প-কারখানার ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে ‘ইলেক্ট্রস্ট্যাটিক প্রিসিপিটেটর’ (ESP) প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে যাতে ক্ষতিকারক কণা বাতাসে মিশতে না পারে।
এক্ষেত্রে শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন মনিটরিং সিস্টেম (Continuous Emission Monitoring System - CEMS) এবং বায়ু দূষণ সম্পর্কিত পূর্বাভাস পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে, যা দূষণ নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর হবে। যানবাহন থেকে নির্গমন কমাতে সরকারকে ডিজেলচালিত পুরোনো ও অনুপযুক্ত গাড়ি ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করতে হবে এবং বাধ্যতামূলক ফিটনেস সার্টিফিকেট কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
ব্যাপকভাবে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক বাস এবং রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে উন্নত করতে হবে। সিএনজি ও হাইব্রিড প্রযুক্তি উৎসাহিত করা এবং ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমাতে আধুনিক গণপরিবহন সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সাইকেল লেন ও পথচারীবান্ধব নগর পরিকল্পনা গড়ে তুলতে হবে। এতে বায়ু দূষণকারী গ্যাস নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে।
নির্মাণকাজ ও সড়কের ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধি প্রয়োগ করতে হবে। নির্মাণস্থলে নেট ব্যবহার, নিয়মিত পানি ছিটানো এবং খোলা ট্রাকে বালু পরিবহন নিষিদ্ধ করতে হবে। শহরের প্রধান সড়কগুলো নিয়মিত পরিষ্কার এবং সবুজ বেষ্টনী তৈরির মাধ্যমে ধুলা কমানো সম্ভব। পরিবেষ্টক বায়ু (Ambient Air) দূষণের পাশাপাশি গৃহ অভ্যন্তরীণ বায়ু দূষণের মানমাত্রা ও নির্ধারণ করতে হবে।
নগরাঞ্চলে ‘বর্জ্য পৃথকীকরণ’ বা সোর্স সেগ্রিগেশন বাধ্যতামূলক করতে হবে, যেখানে পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদাভাবে সংগ্রহ করা হবে। প্লাস্টিক দূষণ রোধে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক (Single-use Plastic) নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি পাটের তৈরি সোনালী ব্যাগের মতো পচনশীল পণ্যের ব্যাপক বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে সরকারি ভর্তুকি প্রদান করা জরুরি।
নির্মাণকাজ ও সড়কের ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধি প্রয়োগ করতে হবে। নির্মাণস্থলে নেট ব্যবহার, নিয়মিত পানি ছিটানো এবং খোলা ট্রাকে বালু পরিবহন নিষিদ্ধ করতে হবে। শহরের প্রধান সড়কগুলো নিয়মিত পরিষ্কার এবং সবুজ বেষ্টনী তৈরির মাধ্যমে ধুলা কমানো সম্ভব।
নদীগুলো দখল ও দূষণমুক্ত করতে সরকারকে ‘জিরো ডিসচার্জ’ নীতি অনুসরণ করতে হবে, অর্থাৎ কোনো প্রকার অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা যাবে না। প্রতিটি বৃহৎ শিল্পাঞ্চলে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (CETP) স্থাপন এবং সেগুলোর কার্যকারিতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি করতে হবে।
পাশাপাশি, উপকূলীয় অঞ্চলে ‘সবুজ দেওয়াল’ বা ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল গড়ে তোলা এবং নগরাঞ্চলে ‘আরবান ফরেস্ট্রি’ বা নগর বনায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের মোট বনভূমি দ্রুত ২৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত সুরক্ষার জন্য সরকারকে সব ধরনের বিদ্যুৎ প্লান্টকে (লাল, কমলা শ্রেণি) Real Time Monitoring প্রযুক্তি ব্যবহার করে দূষণ নির্গমনের মাত্রা পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখলে দূষণের নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।
পাইরোলাইসিস প্লান্ট ও চারকোল প্রস্তুত শিল্পকে লাল শ্রেণিভুক্ত করা উচিত। জীবাশ্ম জ্বালানি বা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে থেকে পর্যায়ক্রমে সরে এসে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা সরকার নির্ধারণ করেছে সেটি বাস্তবায়নে কার্যকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্পগুলোয় বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হবে। নির্মাণাধীন মেগা প্রকল্পগুলোয় ধূলিকণা নিয়ন্ত্রণে ‘কন্টিনিউয়াস এয়ার মনিটরিং স্টেশন’ (CAMS) এর সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে এবং জনসাধারণের জন্য স্মার্টফোনে রিয়েল-টাইম বায়ু মানের তথ্য পাওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে।
শিক্ষা কারিকুলামে প্রাথমিক স্তর থেকেই পরিবেশ শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবেশ ক্যাডার ও পুলিশ প্রবর্তনের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় কাজে লাগানোর অনুরোধ থাকবে নতুন সরকারের কাছে। এর পাশাপাশি হাইকোর্টের নির্দেশ বাস্তবায়ন এর মাধ্যমে বায়ু দূষণ রোধে বিশেষ ভূমিকা রাখা যেতে পারে। পরিবেশ আদালতগুলো আরও শক্তিশালী করে দূষণকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের বাজেট বরাদ্দ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পূর্ববর্তী সরকারগুলো পরিবেশ সম্পর্কিত অঙ্গীকার করলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা ও সমন্বয়ের অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। বর্তমান সরকারের নিকট তাদের গৃহীত পরিবেশ সম্পর্কিত অঙ্গীকার সমূহ রক্ষার জন্য আমরা দৃঢ়ভাবে আশা ব্যক্ত করছি।
ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার : ডিন, বিজ্ঞান অনুষদ; অধ্যাপক, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ; যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং চেয়ারম্যান, বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)