মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায় যেভাবে

বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যদি সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়, তবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকারই দায়িত্ব গ্রহণ করুক না কেন, তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে—দেশের নাগরিকদের জন্য মানসম্মত, ন্যায্য ও আর্থিকভাবে সুরক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
স্বাস্থ্য খাতকে যদি কেবল একটি ‘সামাজিক সেবা’ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তা হবে একটি গুরুতর নীতিগত ভুল। স্বাস্থ্য আসলে মানব পুঁজি উন্নয়নের ভিত্তি, শ্রম উৎপাদনশীলতার চালিকাশক্তি এবং দারিদ্র্য হ্রাস ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বশর্ত।
একটি অসুস্থ জনগোষ্ঠী নিয়ে কোনো দেশই দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না। এই বাস্তবতায় পরবর্তী সরকারের প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত একটি বাস্তবভিত্তিক, অর্থায়ন-সমর্থিত এবং রূপান্তরমূলক স্বাস্থ্য নীতির রূপরেখা গ্রহণ।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অর্থায়নের সবচেয়ে বড় সংকট হলো অতিরিক্ত আউট-অব-পকেট (OOP) ব্যয়। সরকারি ও আন্তর্জাতিক হিসাব অনুযায়ী মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭০–৭৫ শতাংশই জনগণকে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হয়; বাস্তবে এই হার আরও বেশি।
এর ফলে প্রতি বছর লাখ লাখ পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের ধাক্কায় দরিদ্র বা আরও দরিদ্র হয়ে পড়ছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য কভারেজের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এই ব্যয় মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৩০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা জরুরি।
অন্যদিকে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক সাত শতাংশের কাছাকাছি, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। কম বরাদ্দের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্বল পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন অদক্ষতা, জনবল সংকট ও সরবরাহ ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা। এর ফলেই সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ওপর মানুষের আস্থা ক্রমাগত কমছে এবং মানুষ বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল বেসরকারি সেবার দিকে ঝুঁকছে।
স্বাস্থ্য খাতকে যদি কেবল একটি ‘সামাজিক সেবা’ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তা হবে একটি গুরুতর নীতিগত ভুল। স্বাস্থ্য আসলে মানব পুঁজি উন্নয়নের ভিত্তি, শ্রম উৎপাদনশীলতার চালিকাশক্তি এবং দারিদ্র্য হ্রাস ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বশর্ত।
এই প্রেক্ষাপটে একটি বিষয় স্পষ্ট—বিচ্ছিন্ন বা খণ্ডিত সংস্কার দিয়ে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত স্বাস্থ্য অর্থায়ন কৌশল, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য।
বর্তমান শ্রমবাজার কাঠামো, কর-জিডিপি অনুপাত এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বিবেচনায় আগামী এক দশকের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সামাজিক স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থা চালু করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে স্বাস্থ্য বীমার পথ বন্ধ। বরং করভিত্তিক অর্থায়নকে শক্তিশালী করে, নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য ধাপে ধাপে বীমাভিত্তিক ব্যবস্থার সূচনা করাই হবে বুদ্ধিমান নীতি।
পরবর্তী সরকারের জন্য সবচেয়ে কার্যকর নীতি হতে পারে একটি তিন স্তরবিশিষ্ট স্বাস্থ্য অর্থায়ন কাঠামো গ্রহণ।
প্রথম স্তর: প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে সম্পূর্ণভাবে করভিত্তিক অর্থায়নের আওতায় এনে বিনামূল্যে ও ন্যায্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন সাব-সেন্টার ও ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার সেন্টারগুলো একীভূত কাঠামোর মধ্যে এনে একটি শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কর্তৃপক্ষের অধীনে পরিচালনা করা জরুরি। এই স্তরে বিনিয়োগ বাড়ালে রোগ প্রতিরোধ, প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় হ্রাস—তিনটিই একসঙ্গে সম্ভব।
আরও পড়ুন
দ্বিতীয় স্তর: মধ্যবর্তী সেবা ও ফ্যামিলি হেলথ কার্ড
প্রাথমিক সেবার বাইরে ভর্তি রোগী সেবা, মাতৃস্বাস্থ্য ও মৌলিক জরুরি সেবার জন্য একটি ‘ফ্যামিলি হেলথ কার্ড’ চালু করা যেতে পারে, যেখানে পরিবার প্রতি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত সেবা নিশ্চিত থাকবে।
এতে মানুষ হঠাৎ বড় ব্যয়ের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পাবে এবং সরকারি ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বাড়বে। সরকারি হাসপাতাল হবে মূল সেবাদানকারী; প্রয়োজন হলে তালিকাভুক্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে কৌশলগতভাবে সেবা ক্রয় করা যেতে পারে।
তৃতীয় স্তর: গুরুতর রোগ ও দুর্ঘটনাজনিত সেবা
ক্যান্সার, কিডনি রোগ, স্ট্রোক বা বড় দুর্ঘটনার মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসার জন্য একটি জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল গঠন করা সময়ের দাবি।
এই তহবিলের অর্থায়ন আসতে পারে জাতীয় বাজেটের পাশাপাশি উদ্ভাবনী উৎস থেকে—যেমন মোবাইল ফোন ব্যবহারে ক্ষুদ্র লেভি, তামাক ও ক্ষতিকর খাদ্যের ওপর স্বাস্থ্য কর এবং কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল। এতে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবার আর্থিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবে।
সরকারি ও আন্তর্জাতিক হিসাব অনুযায়ী মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭০–৭৫ শতাংশই জনগণকে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হয়; বাস্তবে এই হার আরও বেশি।
এই অর্থায়ন কাঠামো কার্যকর করতে হলে কয়েকটি মৌলিক সংস্কার ছাড়া বিকল্প নেই। এর মধ্যে রয়েছে পাবলিক ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট বিধিমালার সংস্কার, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় আর্থিক ও প্রশাসনিক নমনীয়তা, ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং জনবল প্রণোদনার পুনর্বিন্যাস। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে।
পরবর্তী সরকারের সামনে প্রশ্ন একটাই—স্বাস্থ্য খাতকে কি তারা সত্যিকার অর্থে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে চায়? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তবে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবাকে নাগরিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সাহসী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
করভিত্তিক অর্থায়ন জোরদার করা, উদ্ভাবনী রাজস্ব উৎস কাজে লাগানো এবং ধাপে ধাপে কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমেই বাংলাদেশ একটি ন্যায্য, কার্যকর ও টেকসই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।
স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ আসলে ব্যয় নয়—এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে ফলপ্রসূ বিনিয়োগ। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।
ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ : অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
