কেমন শহর চাই?

লিখতে বসে মনে হলো এই প্রশ্নটাই কি সঠিক? গোড়াতেই এই ভুল প্রশ্ন বা ভুল মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুই কি আমাদের অধিকাংশ সমস্যার মূল?
প্রশ্নটা হতে পারতো 'কাদের জন্য, কেমন জীবনযাপনের পরিবেশ চাই? 'কাদের জন্য' প্রশ্নে সুযোগ তৈরি হয় মানবকেন্দ্রিক (anthropocentric) চিন্তা থেকে বেরিয়ে বাস্তুতন্ত্রের অন্তর্গত সব প্রাণী ও উদ্ভিদকে নিয়ে ভাবার।
এই শহর আমাদের ভুলিয়ে দিয়েছে যে, মৌমাছি বিলুপ্ত হয়ে গেলে আমার পরিবেশ হয়ে পড়বে উদ্ভিদ শূন্য। শহর আমাদের ও আমাদের শিশুদের এমনভাবে প্রকৃতি বিযুক্ত করেছে যে বুড়িগঙ্গার দূষণ, পান্থকুঞ্জ ধ্বংস প্রক্রিয়া ও সামগ্রিক প্রকৃতির অবক্ষয় আমাদের ভেতরে কোনো প্রতিক্রিয়া তৈরি করে না।
আবার, 'কেমন পরিবেশ চাই' প্রশ্নে শহরকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে চিন্তা থেকে বেরনোর সুযোগ তৈরি হয়। কৃষি ভূমি, বনাঞ্চল থেকে শুরু করে গ্রাম, গঞ্জ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা শহর, বিভাগীয় শহর—এই যে বিভিন্ন মাত্রায় নির্মিত পরিবেশের সিস্টেম, তার থেকে বিচ্ছিন্ন করে ঢাকাকে দেখলে কি আমরা ঢাকার সমস্যা সমাধান করতে পারব?
তাই প্রশ্নটা বোধহয় 'কেমন শহর চাই?' না হয়ে হওয়া প্রয়োজন ‘কাদের জন্য কেমন জীবনযাপনের পরিবেশ হওয়া প্রয়োজন যেখানে গ্রাম ও শহর উভয়ই বাসযোগ্য হবে।’ যেমন স্থপতি মাজহারুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘আমি চাই আমার দেশকে উন্নয়নের এমন স্তরে এমনভাবে নিয়ে যেতে যেখানে গ্রামের লোকও টেলিভিশন দেখবে, পড়াশোনা করবে।’
ঢাকার জনবিস্ফোরণ নিয়ে যখন আমরা হা-হুতাশ করি, আমরা ভুলে যাই যে প্রান্তিক গ্রামীণ পরিবেশের প্রতি আমাদের দীর্ঘকালীন অমনোযোগ ও তার থেকে সৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয়, কর্মসংস্থান ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য অবকাঠামোর অভাব এর জন্য দায়ী।
তাই নতুন ব্যবস্থার এই দেশে ঢাকা বা যেকোনো শহরকে ‘কেমন দেখতে চাই’ ভাবতে গেলে চিন্তার শুরুটা হওয়া দরকার ঢাকার বস্তিতে আগত একজন জলবায়ু অভিবাসীর (climate migrant) গ্রামটা কেমন হওয়া দরকার।
কেন তাকে ঢাকার এই অমানবিক, অস্বাস্থ্যকর, অনিরাপদ পরিস্থিতিতে এসে জীবন ধারণ করতে হচ্ছে? তার শ্রমের বিনিময়ে শহরগুলো কি তার ন্যূনতম নাগরিক প্রয়োজন ও অধিকার নিশ্চিত করছে? এই চিন্তাগুলো ছাড়া ঢাকায় জনসংখ্যার চাপ কমানোর জন্য ‘বিকেন্দ্রীকরণ’-এর তত্ত্ব কোনো সুফল নিয়ে আনবে না।
যারা ঢাকায় চলে এসেছি বা দীর্ঘকাল ধরে বসবাস করছি, যারা ‘এ শহর যাদুর শহর, প্রাণের শহর’ গান গেয়ে নিজেদের প্রবোধ দেই, তাদের এবং এই শহরকে বাঁচানোর কোনো পথ কি আছে?
এমনই দুর্ভাগা এ শহর যেখানে চারপাশে পাঁচটা নদী ও অসংখ্য খালের ‘নীল নকশা’ থাকার পরও প্রতিটা জলপথকে নোংরা, উপেক্ষিত পেছনের গলির মতো অযত্নে রাখা হয়েছে, শোষণ করা হয়েছে...
প্রথমে মেনে নেই যে, আমি লিখছি এবং আপনি পড়ছেন—আমরা এই শহরের ১০-২০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর মধ্যে পড়ি। বাকি ৮০ শতাংশের মধ্যে আছে আপনার-আমার গৃহকর্মী, গাড়িরচালক, ময়লা সংগ্রহকারী মানুষগুলো, আপনার-আমার বাড়ির নিচের সবজি বিক্রেতা, রাস্তার ড্রেইন ও ম্যানহোল পরিষ্কার করা গোষ্ঠী এবং আরও অনেকে। শহরে মানব সমাজের ইকোসিস্টেমে যাদের প্রত্যেকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।
শহর যদি এমন একটা জায়গা হয় যেখানে একটা জনগোষ্ঠী একত্র ভাবে থাকে এবং তাদের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও চিন্তা ভিত্তিক উপায় কাজ করার জন্য যা যা দরকার সেগুলো সরবরাহ করা হয়, তাহলে ঢাকায় কি সেই সামগ্রিক জনগোষ্ঠী নিয়ে ভাবা হচ্ছে?
তাহলে করণীয় কী? চলুন গতানুগতিক সেক্টরাল অবকাঠামো ভিত্তিক চিন্তা থেকে বেরিয়ে অন্যভাবে ভাবা যায় কিনা। সাম্প্রতিক সময়ে ভবিষ্যৎ শহরের রূপরেখা সংক্রান্ত কিছু ধারনা আলোচিত হচ্ছে, যেমন ন্যায্য নগর (just city), টেকসই নগর (sustainable city), অন্তর্ভুক্তিমূলক নগরায়ন (inclusive urbanization)।
আমার দৃষ্টিতে এইসব ধারণা বা তত্ত্ব একে অন্যের সাথে সম্পর্কিত এবং শুধুমাত্র অবকাঠামো পরিকল্পনা এসব তত্ত্বের বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট নয়। বরং অবকাঠামো কীভাবে শহরের সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর ও অনাগত প্রজন্মের প্রাত্যহিক জীবনকে সুবিধাজনক, আরামদায়ক, স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ অভিজ্ঞতার দিকে নিয়ে যেতে পারে, মনোযোগ সেদিকে দেওয়া প্রয়োজন।
আমরা দিচ্ছি কি? রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দুর্নীতি এসব ছাড়াও পরিকল্পনার দর্শন বা প্রক্রিয়াতে কি কোনো সমস্যা হচ্ছে?
বিগত দুই তিন দশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে পরিবহন অবকাঠামো। অথচ নাগরিকদের চলাচলের অভিজ্ঞতা তারপরও এত করুণ কেন? এই ধরুন এমআরটি’র মতো পরিবহন অবকাঠামো। প্রায় ওপর থেকে স্পেস শিপের মতো অবতরণ করা এই স্টেশনগুলো কি আশেপাশের এলাকার সাথে সেকেন্ডারি বা টারশিয়ারি যানবাহন, আচ্ছাদিত হাঁটার যোগ্য ফুটপাত দিয়ে সম্পর্কিত?
আরও পড়ুন
আপনার বাসা থেকে স্কুল পড়ুয়া বাচ্চা অথবা আপনার বয়স্ক মা এমআরটি স্টেশন পর্যন্ত কীভাবে বৃষ্টিতে না ভিজে, নিরাপদে পৌঁছাতে পারবে, সেই অভিজ্ঞতা পরিকল্পনার অংশ না হলে আমাদের নগরায়ন জীবন বিচ্ছিন্নই থেকে যাবে।
এরপর আসি বাসস্থানের প্রশ্নে। এমআরটি বা বাসের মতো সুলভ গণপরিবহন ব্যবস্থা যেসব নিম্ন বা মধ্য আয়ের মানুষদের জন্য জরুরি, তাদের জন্য গণপরিবহন রুটের কাছাকাছি সাশ্রয়ী আবাসন নেই কেন? যে শহরে প্রায় ৩৭ শতাংশ জনগোষ্ঠী আরবান স্লাম না শহুরে বস্তি থাকে এবং ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠী অনানুষ্ঠানিক কাজে জড়িত, সেখানে এদের বাসস্থানগুলো আমাদের দৃষ্টি ও মনোযোগ থেকে অদৃশ্য হয়ে থাকে কেন?
ভাবুন তো, আপনার গৃহস্থালির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, আপনার গৃহকর্মী। বেতন বাড়াতে চাইলে আমরা অনেকেই যখন বিরক্ত হই, আমরা কি খতিয়ে দেখি সে কোথায় থাকে? সেই ঘরের ভাড়া কত? প্রচণ্ড বৃষ্টি ও বন্যার সময় তার ঘর যখন পানিতে ডুবে যায়, তার বাচ্চারা যখন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়, সে কাজে কামাই করে, আপনার জীবন ও অর্থনৈতিক কাজকর্মও কিন্তু স্থবির হয়ে পড়ে।
তাই আমার আপনার গৃহকর্মীর জন্য ন্যূনতম স্বাস্থ্যসম্মত, নিরাপদ, সাশ্রয়ী বাসস্থান, নিরাপদ চলাচলের পথ ও পরিবহন শুধুমাত্র গৃহকর্মীর নাগরিক অধিকার নয়, আপনার ও আপনার গৃহকর্মীর যে সম্মিলিত সামাজিক-অর্থনৈতিক ইকো সিস্টেম, তার সুস্বাস্থ্যের জন্যও জরুরি।
আর যদি প্রকৃতি ও নির্মিত পরিবেশ মিলিয়ে ঢাকা শহরের সার্বিক স্বাস্থ্য ও আত্মার দিকে তাকাই, অসুস্থ টার্মিনালকে দেখতে পাই। এমনই দুর্ভাগা এ শহর যেখানে চারপাশে পাঁচটা নদী ও অসংখ্য খালের ‘নীল নকশা’ থাকার পরও প্রতিটা জলপথকে নোংরা, উপেক্ষিত পেছনের গলির মতো অযত্নে রাখা হয়েছে, শোষণ করা হয়েছে এবং যথারীতি, শহরের জনগোষ্ঠীর প্রাত্যহিক জীবনযাপনের অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে চিন্তা করা হয়নি।
নির্বাচনের এই মরশুমে আবারও আমরা তাকিয়ে আছি আগামী নেতৃত্বের দিকে। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে, নারী হিসেবে আমিসহ অন্যান্য পেশার মানুষদের মূল চাওয়াগুলো বোধহয় একটি সুস্থ, প্রকৃতি সংযুক্ত, নিরাপদ বসবাস, কাজ-চলাচলের জন্য উপযুক্ত ন্যায্য পরিবেশ, ও তার ব্যবস্থাপনা কাঠামো।
মা হিসেবে আমরা চাই আমাদের সন্তান যেন নিদেনপক্ষে শুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নেয়, বিশুদ্ধ পানি পায়, নিরাপদ খাদ্য পায় এবং নিরাপদে হেঁটে স্কুল ও খেলার মাঠ পর্যন্ত যেতে পারে। অনেক বেশি চাওয়া কী?
এই পরিবেশে থাকবে যার যার আয় অনুযায়ী ন্যূনতম সুস্থ ও নিরাপদ বাসস্থানের নিশ্চয়তা, নিরাপদ গণপরিবহন ও চলাচলের পথ; সম্মানজনক ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ, দূষণমুক্ত জল, বায়ু; বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগকালীন সুরক্ষা ব্যবস্থা।
মা হিসেবে আমরা চাই আমাদের সন্তান যেন নিদেনপক্ষে শুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নেয়, বিশুদ্ধ পানি পায়, নিরাপদ খাদ্য পায় এবং নিরাপদে হেঁটে স্কুল ও খেলার মাঠ পর্যন্ত যেতে পারে। অনেক বেশি চাওয়া কী?
ড্যানিশ স্থপতি ও নগর পরিকল্পক ইয়ান গেইল বলেছেন, আমরা যদি নিরাপদ স্বাস্থ্যকর এবং টেকসই শহর চাই, তাহলে আমাদের সর্বাগ্রে শিশুদের কথা শুনতে হবে। এর অর্থ হচ্ছে, নগরের পরিবেশগত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে হবে শিশুদের।
ঢাকার মতো সেসব শহর যেগুলো শুধুমাত্র পুরুষ, প্রাপ্তবয়স্ক, কর্মক্ষম ও গাড়িতে চলা মানুষদের জন্য তৈরি হয়েছে, সেখানে শিশুদের প্রতি সচেতনতা একই সাথে অন্যান্য প্রান্তিক ও সংবেদনশীল জনগোষ্ঠী, যেমন কিশোর, নারী, প্রতিবন্ধী, প্রবীণ ও উদ্বাস্তু—তাদের প্রয়োজন ও নাগরিক অধিকারের দিকেও আমাদের দৃষ্টি ফেরাবে।
প্রকৃতি ও মানবসমাজের ইকোসিস্টেম, মানব সমাজের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ইকো সিস্টেম ও তার সব অংশীদারের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা যেন হয় ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনা ও বিন্যাসের নিয়ামক।
ড. নবনীতা ইসলাম : সহযোগী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়; সদস্য, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের (বাস্থই)