মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন কি নির্বাচনকে প্রভাবিত করে?

গণমাধ্যম যখন ক্রমশ ‘গণ’ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ক্ষমতার প্রতিধ্বনিতে পর্যবসিত হচ্ছে, তখনই নতুন অদৃশ্য-ভয়ংকর খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। সাংবাদিকতা, রাজনীতি ও নির্বাচনী গণতন্ত্র—এই তিনটি ক্ষেত্রেই এআই আজ ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নয়; এটি বর্তমানের কঠিন বাস্তবতা এবং আসন্ন বিপদের নাম।
বাজারে চ্যাটজিপিটির আগমন প্রযুক্তির দুনিয়ায় যতটা আলোড়ন তুলেছে, গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য তার অভিঘাত তার চেয়েও গভীর। সংবাদ লেখা, সম্পাদনা, শিরোনাম নির্মাণ, ছবি-ভিডিও জেনারেশন—সবকিছুই এখন এআইয়ের এক ক্লিকে সম্ভব।
কুয়েত নিউজের এআই সংবাদ পাঠিকা ‘ফেদাহ’, ওড়িশার কৃত্রিম উপস্থাপক ‘লিসা’ কিংবা বাংলাদেশের ‘অপরাজিতা’—এসব উদাহরণ দেখিয়ে দিয়েছে যে সংবাদপাঠক আর রক্তমাংসের মানুষ না হলেও চলে। মালিকপক্ষের জন্য এটি স্বপ্নের মতো—কোনো বেতন নেই, ছুটি নেই, শ্রম আইন নেই, প্রতিবাদ নেই।
প্রশ্ন হলো—গণতন্ত্রের জন্য এর মূল্য কত?
রসিকেরা বলেন, নিউজ প্রেজেন্টাররা এমনিতেই রোবট। স্ক্রিপ্টের বাইরে কিছু বলার সুযোগ নেই। কিন্তু এই ঠাট্টার ভেতরেই লুকিয়ে আছে ভয়ংকর সত্য। মানুষ যখন রোবটের মতো কাজ করে, তখন রোবটকে মানুষ বানিয়ে ফেলাই তো পরবর্তী ধাপ। এআই সেই ধাপকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জন্য আরও সহজ করে দিয়েছে।
...এআই-জেনারেটেড ফেসবুক পোস্ট, মিম, রিলস ও বট অ্যাকাউন্ট মুহূর্তেই জনমতকে বিষাক্ত করে তুলতে পারে।
নিকোলাস ডিয়াকোপুলোস (Nicholas Diakopoulos) ঠিকই বলেছেন—নিউজরুমে এআই ঢুকছে, সাংবাদিকতার ধরন বদলাচ্ছে। কিন্তু তিনি যা বলেননি, তা হলো—এই পরিবর্তন ক্ষমতার ভারসাম্যকেও বদলে দিচ্ছে। ২০১৯ সালে এলএসই প্রকাশিত বৈশ্বিক জরিপ বলেছিল, এআইয়ের প্রভাব হবে কাঠামোগত ও দীর্ঘস্থায়ী। আজ ২০২৬-এর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি, সেই কাঠামো দ্রুত রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই অস্ত্রের পরীক্ষাগার হতে পারে।
এআই এখন আর শুধু সংবাদ লেখে না; আবেগ তৈরি করে, ঘৃণা ছড়ায়, মিথ্যাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। ডিপফেক ভিডিওতে একজন প্রার্থীকে দিয়ে এমন কথা বলানো সম্ভব, যা তিনি কখনো বলেননি। এআই-জেনারেটেড ফেসবুক পোস্ট, মিম, রিলস ও বট অ্যাকাউন্ট মুহূর্তেই জনমতকে বিষাক্ত করে তুলতে পারে। নির্বাচনী সময়ে ভুয়া জরিপ, বানানো বক্তব্য, বিকৃত ছবি ও কৃত্রিম ট্রেন্ড দিয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করা এখন আর কল্পকাহিনি নয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—এই প্রোপাগান্ডার কোনো মুখ নেই, কোনো দায় নেই। প্রশ্ন করা যাবে না, জবাবদিহিও চাওয়া যাবে না। এআই নারদ যেমন দেবতাদের পক্ষ নিতো, আজকের এআই তেমনি ক্ষমতাবানদের পক্ষ নেবে—কারণ যা ডেটা পায়, তাকেই সত্য বানায়।
মহাভারতের নারদ ও সঞ্জয়ের কথা স্মরণ করছি। নারদ ছিলেন সর্বত্রগামী, সঞ্জয় ছিলেন সরাসরি সম্প্রচারক। কিন্তু আজকের এআই সাংবাদিক সেই পৌরাণিক চরিত্রের বিকৃত সংস্করণ। নারদের মতো সে গুজব ছড়ায়, আবার সঞ্জয়ের মতো ‘লাইভ’ আপডেট দেয়—তবে কোনো নৈতিকতা ছাড়াই। ভুল হলে সে ক্ষমা চায় না, কারণ তার লজ্জা নেই; পক্ষপাত হলে সে অনুশোচনা করে না, কারণ তার বিবেক নেই।
গণমাধ্যম যখন গণতন্ত্রের পাহারাদার না হয়ে ক্ষমতার কনটেন্ট ফ্যাক্টরিতে পরিণত হয়, তখন এআই সেই কারখানার নিখুঁত মেশিন হয়ে দাঁড়ায়। সাংবাদিকতা যদি সস্তা শ্রমে নেমে যায়, রাজনীতি যদি ডেটা ও অ্যালগরিদমের খেলায় রূপ নেয়, তবে নির্বাচন থাকবে কেবল আনুষ্ঠানিকতা—ভোট হবে, কিন্তু মত থাকবে না।
প্রশ্ন হলো, এআই আসবে কি না—সে তো এসেই গেছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি তাকে নিয়ন্ত্রণ করবো, নাকি সে-ই আমাদের রাজনীতি, সংবাদ ও গণতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করবে?
ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার পরীক্ষা নয়; এটি হবে বাংলাদেশের ডিজিটাল গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় নৈতিক পরীক্ষা। যদি এখনই এআই, ডিপফেক ও অ্যালগরিদমিক প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে সামাজিক ও নীতিগত প্রতিরোধ গড়ে না তোলা যায়, তবে আগামী দিনে ভোটকেন্দ্রে মানুষ থাকবে—কিন্তু সিদ্ধান্ত নেবে মেশিন।
মাঠের রাজনীতি থেকে এবার চোখ ফেরাই তত্ত্বীয় আলোচনায়। দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল প্রেক্ষাপটে তথ্য প্রবাহের গতি ইতিহাসে আর কখনো এত ত্বরান্বিত ছিল না। স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া ও এআই-চালিত প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তথ্য এখন রিয়েল টাইমে তৈরি হচ্ছে, ছড়িয়ে পড়ছে ও দ্রুত রূপান্তরিত হচ্ছে।
আরও পড়ুন
সুযোগ যেমন বিশাল, তেমনি চ্যালেঞ্জও ভয়াবহ। মিথ্যা খবর (fake news), ভুল তথ্য (misinformation), উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তি (disinformation) এবং অ্যালগরিদম-নির্ভর ইকো চেম্বার গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে গভীর সংকটে ফেলছে। এই সংকট বুঝতে ক্রিস্টিয়ান ফুকস (Christian Fuchs)-এর সমালোচনামূলক রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
নিউ মিডিয়া তাত্ত্বিক ও গবেষক ক্রিস্টিয়ান ফুকস তার বই Social Media: A Critical Introduction (2014)–এ যুক্তি দেন, সোশ্যাল মিডিয়াকে কেবল অংশগ্রহণমূলক বা গণতান্ত্রিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখা একটি ভ্রান্ত রোমান্টিকতা। তার মতে, ফেসবুক, ইউটিউব বা এক্স (টুইটার) হলো মূলত “corporate surveillance machines”, যেখানে ব্যবহারকারীরা একযোগে কনটেন্ট প্রডিউসার ও ডেটা শ্রমিক।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এটি আরও স্পষ্ট। তরুণদের বিপুল অংশ রাজনৈতিক মতামত, মিম, ভিডিও ও আবেগ তৈরি করছে—কিন্তু সেই আবেগ ও মতামত অ্যালগরিদমের মাধ্যমে ফিল্টার হয়ে যাচ্ছে। কোন পোস্ট ভাইরাল হবে, কোনটি চাপা পড়বে—তা নির্ধারণ করছে প্ল্যাটফর্মের অস্বচ্ছ অ্যালগরিদম, নাগরিক যুক্তি নয়। ফুকস একে বলেন “algorithmic power over public discourse.”
Digital Labour and Karl Marx (2014)–এ ফুকস দেখান, ব্যবহারকারীরা বিনা পারিশ্রমিকে যে কনটেন্ট তৈরি করে, সেটিই প্ল্যাটফর্মের মূল পুঁজি। নির্বাচনী রাজনীতিতে এই ডিজিটাল শ্রম সরাসরি প্রোপাগান্ডায় রূপ নেয়। বাংলাদেশে নির্বাচনের সময় দেখা যায়—স্বেচ্ছাসেবী অনলাইন অ্যাক্টিভিজম, দলীয় ট্রোল গ্রুপ, কিংবা ‘দেশপ্রেমিক’ ডিজিটাল ক্যাম্পেইন—সবই নাগরিক শ্রমকে রাজনৈতিক অস্ত্রে রূপান্তর করে।
এআই যুক্ত হলে এই প্রক্রিয়া আরও বিপজ্জনক হয়। কারণ তখন মানবীয় আবেগের ওপর তৈরি করা কনটেন্টকে মেশিন আরও দ্রুত, আরও নিখুঁতভাবে পুনরুৎপাদন করতে পারে। ফুকস-এর Communication and Capitalism (2020) গ্রন্থে তিনি দেখান, সোশ্যাল মিডিয়া কীভাবে জাতীয়তাবাদ, ঘৃণা ও ‘আমরা বনাম তারা’ বয়ানকে পুঁজি করে। অ্যালগরিদম এমন কনটেন্টকেই বেশি ছড়ায়, যা আবেগপ্রবণ, বিভাজনমূলক ও উত্তেজক।
বাংলাদেশে ধর্ম, মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব—এই সংবেদনশীল বিষয়গুলো কেন্দ্র করে প্রায়ই ইকো চেম্বার তৈরি হয়। ব্যবহারকারীরা ভিন্নমত শুনতে অভ্যস্ত থাকে না। ফুকস একে বলেন “ideological enclosure of communication.” এর ফল হলো-গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় বিতর্ক ও মতভিন্নতা সংকুচিত হয়ে পড়ে।
আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল প্রেক্ষাপটে তথ্য প্রবাহ এত দ্রুত কখনো ছিল না। সুযোগ বড়, চ্যালেঞ্জও বড়। মিথ্যা সংবাদ, ভুল তথ্য, অ্যালগরিদম-নির্ভর ইকো চেম্বার-সবই আমাদের সমর্থনমূলক ও যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণকে হুমকির মুখে ফেলে।
বাংলাদেশে নাগরিকদের, বিশেষ করে যুবসমাজকে, তথ্যের সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ শেখানো জরুরি। উৎসের বিশ্বাসযোগ্যতা বোঝা, পক্ষপাত শনাক্ত করা, ডেটা ও অ্যালগরিদমের প্রভাব অনুধাবন করা—এসব ছাড়া ডিজিটাল নাগরিকত্ব অসম্ভব।
নির্বাচনী সময়ে ভুয়া জরিপ, বানানো বক্তব্য, বিকৃত ছবি ও কৃত্রিম ট্রেন্ড দিয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করা এখন আর কল্পকাহিনি নয়। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—এই প্রোপাগান্ডার কোনো মুখ নেই, কোনো দায় নেই। প্রশ্ন করা যাবে না, জবাবদিহিও চাওয়া যাবে না।
ক্রিস্টিয়ান ফুকস আমাদের শেখান, প্রযুক্তি কখনো নিরপেক্ষ নয়। নিউ মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়া গণতন্ত্রের হাতিয়ারও হতে পারে, আবার কর্তৃত্ববাদের শক্তিশালী অস্ত্রও হতে পারে। প্রশ্ন তাই প্রযুক্তি আছে কি না নয়—প্রশ্ন হলো, কার হাতে, কোন স্বার্থে, কোন কাঠামোর ভেতরে প্রযুক্তি কাজ করছে।
বাংলাদেশের মতো উদীয়মান ডিজিটাল সমাজে যদি মিডিয়া সাক্ষরতা, নৈতিক সাংবাদিকতা ও অ্যালগরিদমিক স্বচ্ছতা একসাথে নিশ্চিত করা না যায়, তবে এআই–নির্ভর নিউ মিডিয়া গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে না—বরং নীরবে ক্ষয় করবে।
নিউ মিডিয়া ও এআই–নির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থার সবচেয়ে বিপজ্জনক রাজনৈতিক ফলাফলগুলোর একটি হলো হেইট স্পিচের স্বাভাবিকীকরণ ও ত্বরান্বিত বিস্তার। বাংলাদেশে ধর্ম, জাতিসত্তা, লিঙ্গ, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা মুক্তিযুদ্ধের ব্যাখ্যাকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে ঘৃণাভাষা ছড়ায়, তা আর কেবল ব্যক্তিগত বিদ্বেষের প্রকাশ নয়—এটি অ্যালগরিদম-চালিত দৃশ্যমানতার ফল।
ক্রিস্টিয়ান ফুকস যাকে বলেন “the political economy of online hatred”—যেখানে ঘৃণামূলক কনটেন্ট বেশি এনগেজমেন্ট আনে, ফলে প্ল্যাটফর্ম সেটি বেশি ছড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশে ফেসবুক ও ইউটিউবের নিউজফিডে উসকানিমূলক ভিডিও, বিকৃত উদ্ধৃতি বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিম দ্রুত ভাইরাল হয়, কারণ এগুলো আবেগ, ভয় ও ক্ষোভকে পুঁজি করে। এআই যুক্ত হলে এই ঘৃণার চাষ আরও পরিশীলিত হয়—ভাষা হয় মার্জিত, কিন্তু বার্তা থাকে বিষাক্ত; ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীর পক্ষে তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আরও উদ্বেগজনক হলো, নির্বাচনী রাজনীতি ও ক্ষমতার লড়াইয়ে হেইট স্পিচ এখন কৌশলগত অস্ত্র। বাংলাদেশে দেখা যায়, অনলাইন ট্রল নেটওয়ার্ক ও বট অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা মতাদর্শকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’, ‘ধর্মবিরোধী’ বা ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফুকসের ভাষায়, এটি “digital nationalism and exclusionary communication”—যেখানে ঘৃণা জাতীয় স্বার্থের নামে বৈধতা পায়। এর ফলে গণতান্ত্রিক বিতর্ক সংকুচিত হয়, ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয় এবং নাগরিকরা আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক নীরবতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে হেইট স্পিচ মোকাবিলা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি মিডিয়া সাক্ষরতা, প্ল্যাটফর্ম জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক নৈতিকতার সম্মিলিত লড়াই—না হলে ডিজিটাল বাংলাদেশে ঘৃণাই হয়ে উঠবে সবচেয়ে দৃশ্যমান ‘জনমত’।
রাজীব নন্দী : সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, নিউ মিডিয়া ও পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন গবেষক
[email protected]
