ফেব্রুয়ারি, যেন ‘ব্র্যাকেটবন্দি’ এক মাসের নাম

‘এসেছে ভাষার মাস/বক্তৃতাতে হবে চাষ/অন্য মাসে ভাষা নেই!/ভাষা কেবল ফাল্গুনেই।’—এগুলো কল্পিত কবি এবং কবিতার চরণ। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাস এলেই ভাষা নিয়ে যে অনুষ্ঠান সর্বস্ব আয়োজন সম্পন্ন হয়, উদ্ধৃত চরণগুলো যেন তারই ইঙ্গিতবহ। কয়েকটি মাস এবং কিছু তারিখ আছে, যেগুলো উচ্চারণের সাথে সাথেই উদ্ভাসিত হয় বাঙালির বিসর্জন ও অর্জনের ইতিহাস।
ফেব্রুয়ারি এবং একুশ তেমনই এক ইতিহাসের স্মারক। আত্মত্যাগ ও অর্জনের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে নানা আয়োজন যেমন প্রয়োজন, তেমনি আনুষ্ঠানিকতাও থাকা দরকার। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের মতো মৌলিক ঘটনাকে কেবলই অনুষ্ঠান সর্বস্ব করে তোলা যেন বাঙালির বহু ‘আত্মঘাতী প্রবণতারই’ অন্যতম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাচ্ছে। এই প্রবণতা বহু বছর ধরেই চলমান।
সাতচল্লিশে ভারতবর্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ‘স্বপ্নরাষ্ট্র’ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরই কেন বাঙালির ভাষাকে কেন্দ্র করে অমন প্রগতিশীল একটি আন্দোলন করতে হয়েছিল? সেই ইতিহাস খুঁজতে গেলে আমরা দেখি, সবার রাষ্ট্র পাকিস্তান সবার অধিকার তো দূরের কথা, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকেই অধিকার-বঞ্চিত করতে তৎপর হয়ে উঠেছে। ১৯৪৮ সালে শুরু হয়ে বিভিন্ন পর্যায় শেষে ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে।
তরুণদের তাজা প্রাণে রাজপথ রক্তাক্ত হয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ওপর ভাষা আন্দোলনের প্রভাব ছিল বহুমাত্রিক। এর মধ্যে প্রধান হয়ে উঠেছিল শিক্ষিত ও উঠতি মধ্যবিত্তের ওপর বিপুল সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব এবং একুশে ফেব্রুয়ারির পর ভাষা আন্দোলন গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের মাঝে সৃষ্ট ছাত্রহত্যাকে মেনে না নেওয়া-জনিত ক্ষোভ।
সেই ক্ষোভ ও ‘স্বজন’ হারানোর বেদনার বিষয়টি সেই সময় গ্রামগঞ্জের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান-প্রাঙ্গণে গড়ে ওঠা শহীদ মিনার এবং ‘শহীদ স্মৃতি অমর হোক’ স্লোগান অন্তত সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। ১৯৫৬ সালে উর্দুর পাশাপাশি অন্যতম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর? তাজা প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত সেই রাষ্ট্রভাষা আজ প্রায় সাড়ে সাত দশক পর, স্বাধীন বাংলাদেশে আদৌ মাথা উঁচু করে রয়েছে নাকি সংশয় ও সংকটের মধ্যে রয়েছে, তার কিছু বাস্তবতা সামনে আনা এ লেখার অন্যতম উদ্দেশ্য।
রাষ্ট্রভাষা বাংলার সদ্গতি বনাম দুর্গতির শঙ্কা
মাত্র ৩.২৭ শতাংশ উর্দুভাষীর বিপরীতে ৫৬ শতাংশ মানুষের ভাষা হিসেবে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্তি সেই সময় বাঙালিদের জন্য ছিল বিরাট অর্জন। আর একাত্তরে স্বাধীনতালাভের পরই সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর ভাষা বাংলাকে বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর দেশে হাজারও স্কুল-কলেজে বাংলাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চর্চার পদক্ষেপও নেওয়া হয়।
স্বাধীনতার অনেক আগে থেকেই কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিভাগ চালু ছিল, যেখানে ভয়ডরহীনভাবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলা বিষয়ের নতুন নতুন পাঠ্যক্রম চালু করা হয়। তবু এর মধ্যেও রয়ে যায় ‘প্রকৃত’ গলদ। ভাষা আন্দোলনকারীদের অন্যতম দাবি ছিল সর্বস্তরে বাংলা চালুকরণ। সেটা আজ অবধি বাস্তবায়িত হয়নি।
এমনকি বিষয়টি আদতে কোনো গুরুত্ব বহন করে কি না, তা যেন রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের মধ্যে ন্যূনতম বিবেচনাতেও নেই। অথচ ‘ভাষা আন্দোলন কেবল ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ছিল না; ছিল একটি জাতিগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার মহৎ সংগ্রাম। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই এ দেশের মানুষ স্বাধিকার আন্দোলন রচনা করে এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।’
...বাংলা নিয়ে অনেকে আবেগের কথা বলেন। আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই, তাহলে দেখবো, বাংলা ভাষা কখনোই উচ্চবিত্ত এবং প্রভাবশালী মানুষের হিসেবে স্বীকৃতি বা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।
ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক বলতেন, মাতৃভাষা কেবল রাষ্ট্রভাষা হলেই হয় না। যদি রাষ্ট্রভাষা দেশের জাতীয় ভাষা হিসেবে গণ্য না হয় এবং তা যদি দেশের মানুষের কর্মসংস্থান তথা জীবিকার ভাষা না হয়ে ওঠে, তবে কেবল খাতায়-কলমে থেকে তেমন কোনো কল্যাণ নেই।
পৃথিবীতে যত উন্নত জাতি রয়েছে, তারা উন্নত হয়েছে তাদের নিজেদের মাতৃভাষায় জ্ঞান চর্চা করেই। আজকের দিনেও কথাটা প্রাসঙ্গিক হিসেবে বিবেচিত। আর প্রাসঙ্গিক বলেই ‘ভাষার মাস’ ফেব্রুয়ারি এলেই সামনে আসে সর্বস্তরে বাংলা চালুর প্রসঙ্গ, বিশ্বের চতুর্থ বা পঞ্চম বৃহত্তম ভাষা হিসেবে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলা চালু করার মতো উচ্চাভিলাষী প্রকল্প চালুর বিষয়।
বিশেষত, উচ্চ আদালতে বাংলার ব্যবহার না-থাকা নিয়ে হয় বেশ হইচই।
এই দাবি আসে এই জন্য যে, আদালতে উপস্থিত বাদী-বিবাদীদের অধিকাংশই বাংলা ভিন্ন অন্য ভাষা বুঝতে সক্ষম নন। কিন্তু হইচই করা মানুষগুলো একথা বিবেচনায় আনেন না যে, বিচারকদের অধ্যয়নের ভাষা হলো ইংরেজি, যুক্তিতর্কের বেশিরভাগই সম্পন্ন হয় ইংরেজিতে, তাহলে তারা রায় কীভাবে বাংলায় দেবেন?
আরও পড়ুন
বাংলায় রায় চাইলে আগে তাদের উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হওয়া চাই বাংলা। তাছাড়া উচ্চ আদালতে বাংলায় রায় কিংবা সর্বস্তরে বাংলা চালু সম্ভব নয়। তবে সর্বস্তরে বাংলা চালু করা আদৌ সম্ভব? সর্বস্তরে বাংলা চালু হলে সমস্যা বাড়বে নাকি কমবে? এর উত্তরে যাওয়ার আগে বলা দরকার, আদতে পৃথিবীতে অসম্ভব বলে তেমন কিছু নেই।
তবে বাংলা নিয়ে অনেকে আবেগের কথা বলেন। আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই, তাহলে দেখবো, বাংলা ভাষা কখনোই উচ্চবিত্ত এবং প্রভাবশালী মানুষের হিসেবে স্বীকৃতি বা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। মধ্যযুগে মুসলমানদের দীর্ঘ শাসনামল থেকে শুরু করে ইংরেজদের ঔপনিবেশিক শাসনামলে বাংলা ছিল নিচু শ্রেণি মানুষের ভাষা।
এমনকি ইংরেজবিরোধী আন্দোলনকালে—শ্রোতাদের বেশিরভাগ ইংরেজি না-জানা থাকলেও—কংগ্রেসের বাঙালি নেতৃবৃন্দ বক্তৃতায় বেশিরভাগ সময় ইংরেজিই ব্যবহার করতেন। সাতচল্লিশের পর পাকিস্তানিরা সংখ্যা কম হলেও তারা ছিল উচ্চবিত্ত, ক্ষমতাধর এবং অবাঙালি মুসলমান। আর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালনাতেও আস্তে আস্তে বাংলা অবহেলিত হতে হতে ব্রাত্যই হয়ে উঠেছে।
ইদানীং শুধু উচ্চবিত্ত নয়, কৃষক বা শ্রমজীবী পরিবার থেকে শিক্ষিত কেউ নগরকেন্দ্রিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হলে কিংবা জুতসই সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করলেই সে বাংলাকে নামিয়ে দেয় দ্বিতীয় সারিতে কিংবা অবজ্ঞার স্তরে। কারণ অফিসে নিয়মিত কর্মযজ্ঞ, যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে বাংলাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বরং রাষ্ট্র ক্রমশ বাংলাকে ‘ভাষার মাস’ হিসেবে ফেব্রুয়ারিকে কেবল ব্র্যাকেটবন্দি করে আনুষ্ঠানিকতার কারণেই স্মরণ করছে। আগে যেটা ছিল স্মরণ, শোক ও প্রতিবাদের তারিখ, এখন সেটি যেন কেবল উদযাপনের দিন।
বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় অবশ্যম্ভাবী ভূমিকা যাদের, এখনো তাদের বেশিরভাগেরই আগমন ঘটে গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে। ধীরে ধীরে তারা নগরমুখী হন এবং দায়িত্বশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। মুশকিল হলো, দায়িত্ব পেয়ে তারাই ভুলে যান অতীতকে। তাদের দ্বারাই শুরু হয় বাংলা-অবজ্ঞা।
এভাবেই প্রজন্ম-পরম্পরায় বাংলা স্বাধীন দেশেও ‘অপর’ হয়ে উঠছে। অবশ্য তাদেরও অভিযুক্ত করে লাভ নেই। কারণ, যদি রাষ্ট্র পরিচালনাকারী রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সদিচ্ছা না থাকে, রাষ্ট্র যদি সংবিধানস্বীকৃত রাষ্ট্রভাষার যথাযথ ব্যবহার নিয়ে নীতিগত অবস্থান সুস্পষ্ট না করে, তবে তার অধীন ব্যক্তিগণের কাছ থেকে সুনজর আশা করা বৃথা।
ইদানীং শুধু উচ্চবিত্ত নয়, কৃষক বা শ্রমজীবী পরিবার থেকে শিক্ষিত কেউ নগরকেন্দ্রিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হলে কিংবা জুতসই সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করলেই সে বাংলাকে নামিয়ে দেয় দ্বিতীয় সারিতে কিংবা অবজ্ঞার স্তরে।
একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়। করোনাকালে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশ থেকে করোনার কার্যকর ভ্যাকসিন ক্রয়ে চুক্তি সম্পন্ন করেছিল। তার মধ্যে ছিল চীন ও রাশিয়া। দুই দেশের কূটনীতিকরা তাদের চুক্তি সম্পন্ন করেন তাদের রাষ্ট্রভাষায় অর্থাৎ মেন্ডারিন এবং রুশ ভাষায়। আর বাংলাদেশের পক্ষে সেই চুক্তি সম্পন্ন করা হয় ইংরেজিতে; তাও আবার সংশ্লিষ্ট ভাষার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপকের সাহায্যে তা অনুবাদ করার মধ্য দিয়ে।
প্রতিষ্ঠানের নামকরণে উপেক্ষিত বাংলা
কোনো একজন কবির লেখায় পড়েছিলাম, ষাট বা সত্তর দশকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে ঘুরে ঘুরে ইংরেজিতে লেখা সাইনবোর্ড বা প্রতিষ্ঠানের নাম বা দোকানের নাম দেখলে মানুষকে বোঝাতেন এবং বাংলায় নাম লিখতে উৎসাহিত করতেন। কিন্তু বর্তমানে রাজধানীসহ সারা দেশের বেশির ভাগ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা শপিংমলের দিকে তাকালে ইংরেজি-ভিন্ন অন্য কোনো নাম চোখে পড়ে খুব কম। কেউ কেউ বাংলা নাম ব্যবহার করেন বটে। তবে ইংরেজি হরফে। অথচ রোমান হরফে বাংলা লেখার বিরুদ্ধে পঞ্চাশের দশকে তীব্র প্রতিবাদ হয়েছিল বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে।
আদতে কোনো দেশের রাজনীতি যদি সে-দেশের ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধারণ না করে, তবে কোনো কাঠামো প্রতিষ্ঠা লাভ করে না, কিছুই সঠিকভাবে বিকশিত হয় না। যেমন খেয়াল করলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, বাংলাদেশের বেশিরভাগ বড় রাজনৈতিক দল তাদের নাম হিসেবে বাংলাকে গ্রহণ করেনি।
বাংলাদেশের বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নাম হিসেবে বাংলাকে বর্জন করেছে। বাংলাদেশের অনেক টেলিভিশন চ্যানেল তাদের নাম হিসেবে বাংলাকে বর্জন করেছে। খুব হাস্যকর লাগে তখন, যখন দেখা যায় ইংরেজি নামাঙ্কিত চ্যানেলে, ইংরেজি শিরোনামের অনুষ্ঠানে আলোচনা হয় ‘সর্বস্তরে বাংলা চালু কত দূর’ ইত্যাদি নিয়ে!
আমরা যদি সত্যি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চাই, তাহলে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে, জীবিকার ভাষা হিসেবে সরকারি-বেসরকারি দপ্তরসহ সর্বস্তরের বাংলা ভাষা প্রচলনে রাষ্ট্রীয় মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তবেই জানানো হতে পারে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা। আর না হলে ফেব্রুয়ারি কেবলই ব্র্যাকেটবন্দি ভাষার হিসেবেই উদযাপিত হতে থাকবে। ভাষাশহীদদের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা জানাই।
ড. ইসমাইল সাদী : সহকারী অধ্যাপক, স্কুল অব জেনারেল এডুকেশন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়