উগান্ডার নির্বাচন ও খাবারের মেন্যুতে মুলা রাখার দায়িত্ব

উগান্ডায় ইলেকশন হয়েছে ১৫ জানুয়ারির ২০২৬। নির্বাচনে অনিবার্যভাবেই নির্বাচিত হয়েছে ইউভেরি কাগুতা মুসেভেনি (Yoweri Kaguta Museveni)। তিনি অনিবার্যভাবে নির্বাচিত হয়েছেন কেন বলছি, তার কারণ হচ্ছে তিনি সেই ১৯৮৬ থেকে আজকে পর্যন্ত পরপর সাতবার নির্বাচন করে সাতবারই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন।
না, প্রথমবার তিনি নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্রপতি হননি। মুসেভেনি সেই ইদি আমিনের সময় থেকেই উগান্ডায় গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকারের জন্যে সংগ্রাম করেছেন, সশস্ত্র লড়াই করেছেন। উগান্ডায় এবং পূর্ব আফ্রিকায় অন্যান্য দেশে তিনি খুবই পরিচিত এবং মান্যগণ্য নেতা। ইদি আমিনের পতনের পেছনে মুসেভেনির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
ইদি আমিনের পর যিনি উগান্ডার শাসক ছিলেন তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে, আন্দোলনে জিতে তিনি প্রথম রাষ্ট্রপতি পদ গ্রহণ করেন। নির্বাচনগুলো হয়েছে, তারপর থেকে সাতবার। এই সাতবারই মুসেভেনি ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করেছেন এবং প্রতিবারই তিনি কারচুপি করে নির্বাচিত হয়েছেন। কারচুপির জন্যে ব্যবহার করেছেন মিলিটারি, পুলিশ, মিলিশিয়া ও বেসামরিক প্রশাসন—সব।
উগান্ডার সংবিধানে একসময় রাষ্ট্রপতি পদে এক ব্যক্তি কতবার নির্বাচিত হতে পারবে, কত বয়স পর্যন্ত নির্বাচন করতে পারবে এইসব বিধিবিধান ছিল। মুসেভেনি এইসব বিধানই পরিবর্তন করেছেন নিজের প্রয়োজনে।
মুসেভেনি কি ভালো মানুষ, নাকি মন্দ মানুষ? একদম মন্দ মানুষ বলি কী করে! ১৯৮৬ সালে তিনি যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন তারপর থেকে উগান্ডার কিছু উন্নয়ন হয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচনের আগে ইলেকশন ক্যাম্পেইনের খবরে দেখা গেছে একাশি বছর বয়সী মুসেভেনি আমাদের হিমুর মতো হলুদ জামা গায়ে মাথায় ইয়া বড় একটা ক্রিকেটারদের মতো সাদা হ্যাট পরে ক্যাম্পেইন করছেন হাটে মাঠে ঘাটে শহরে বন্দরে, তার সভায় লোকজন আসছে।
খুব যে অজনপ্রিয় নেতা সেটা তো বলার উপায় নেই। কিন্তু মুশকিল হয়েছে নির্বাচন মানে তো মানুষের মতামতের অসঙ্কোচ প্রকাশ- সেটা হচ্ছে না। এর মানে হচ্ছে যে, তিনি এবং তার দল ওরা যত উন্নয়নই করুক আর যত মহৎ তাদের উদ্দেশ্য হোক না কেন- উগান্ডার মানুষ তাকেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে চাচ্ছেন কিনা সেই সিদ্ধান্তে তো পৌছনো যাচ্ছে না। কেননা নির্বাচনটা তো ঠিকঠাক হচ্ছে না।
এইবারের নির্বাচনে কী হয়েছে, মুসেভেনির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ববি ওয়াইন। তিনি একসময় মুসেভেনির সহযোগী ছিলেন, এখন তিনি বিপক্ষে চলে গেছেন। ওর একটা আফ্রিকান নাম আছে, কিন্তু ববি ওয়াইন নামেই তিনি তার দেশে সর্বত্র পরিচিত। তিনি ঠিকমতো নির্বাচনী প্রচারণাও করতে পারেননি।
...একটি রাষ্ট্র তখনই আধুনিক রাষ্ট্র হয়ে ওঠে যখন সেখানে সরকার নির্বাচিত হয় জনগণের মতামতের ভিত্তিতে। কেননা রাষ্ট্র কোনো কর্পোরেশন নয় যে লাভ নিশ্চিত করলেই এর উদ্দেশ্য চরিতার্থ হবে।
তার লোকজনের ওপর নানা জায়গায় হামলা হয়েছে। ওর অনেক সমর্থক জেলে আটকা। এমনকি তার বাড়িতেও একাধিকবার হামলা চালিয়েছে উগান্ডার মিলিটারি ও মিলিশিয়া বাহিনীর লোকজন। উগান্ডার যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার, তিনি হচ্ছেন ওদের সামরিক বাহিনীর প্রধানের মনোনীত।
সামরিক প্রধান যিনি, তিনি আবার মুসেভেনির পুত্র। ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়েছে—উগান্ডার ইলেকশনের খবর যদি আপনি সার্চ করেন অন্তর্জালে, দেখতে পাবেন বিচিত্র সব ভিডিও, যেখানে কেন্দ্র দখল করা হচ্ছে, লোকজন ইচ্ছেমতো ব্যালট বাক্স ভর্তি করছে এইসব।
ভোট গণনা, ফলাফল ঘোষণা এইসব নিয়েও উগান্ডায় এর আগে নানা কাণ্ড হয়েছে। একবার তো নাকি মোট ভোট পড়েছিল একশতে একশ—অর্থাৎ সব ভোটাররাই নাকি ভোট দিয়েছে। কয়েক বছরে আবার মুসেভেনির সরকার কয়েকটা রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডের ওপর নানারকম নিষেধাজ্ঞা আরোপও করেছে। ফলে চাইলেও সব রাজনৈতিক মতের লোকজন নির্বাচনও করতে পারছে না।
এই অবস্থায় কি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়? হয় না। এই কথা যদি মুসেভেনির দলের নেতাকর্মীদের বলেন তারা তেড়ে আসবে। ওরা আপনাকে যুক্তি দেখাবে যে, আমাদের নেতা মুসেভেনি তো দেশের উন্নয়ন করেছে, দেশের অর্থনীতি উন্নত হয়েছে, মানুষের কল্যাণ হচ্ছে। তাছাড়া মুসেভেনি হচ্ছে উগান্ডার যে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সেই বিপ্লবের নেতা।
ইদি আমিনের বিরুদ্ধে সেই জঙ্গল-যুদ্ধ থেকে শুরু করে পরবর্তীতে গণতন্ত্র উত্তরণের সংগ্রাম সবকিছুরই নেতা তিনি। উগান্ডার মানুষ স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি পেয়েছে। তিনি না থাকলে বিপ্লবের চেতনা নষ্ট হয়ে যেত। সুতরাং মুসেভেনি যে বারবার নির্বাচিত হচ্ছেন এটা তো ঠিকই আছে—মুসেভেনির সরকার, বারবার দরকার। এই বক্তব্য তারা প্রতিষ্ঠা করেছিল।
এইভাবে কি আসলে রাষ্ট্র চলে? না। এভাবে কোনো আধুনিক রাষ্ট্র চলতে পারে না। একটি রাষ্ট্র তখনই আধুনিক রাষ্ট্র হয়ে ওঠে যখন সেখানে সরকার নির্বাচিত হয় জনগণের মতামতের ভিত্তিতে। কেননা রাষ্ট্র কোনো কর্পোরেশন নয় যে লাভ নিশ্চিত করলেই এর উদ্দেশ্য চরিতার্থ হবে।
কর্পোরেশনের কোনো হৃদয় থাকে না, প্রতিটি রাষ্ট্রের একটি হৃদয় থাকে। রাষ্ট্র কেবল লাভ লোকসানের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় না, রাষ্ট্র পরিচালিত হতে হয় মানুষের আবেগ, অনুভূতি ও আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে। সেই আবেগ অনুভূতি ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হয় নির্বাচনের মাধ্যমে।
যেকোনো আধুনিক রাষ্ট্রেই মানুষের কিছু মৌলিক অধিকার থাকে। এগুলোর মধ্যে থাকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনীতি বা অন্য যেকোনো সংঘ-সমিতি করার স্বাধীনতা, ব্যবসা বাণিজ্য বা পেশার স্বাধীনতা, আইনের চোখে সমতার অধিকার এইরকম নানা অধিকার।
...রাষ্ট্র কেবল লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় না, রাষ্ট্র পরিচালিত হতে হয় মানুষের আবেগ, অনুভূতি ও আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে। সেই আবেগ অনুভূতি ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হয় নির্বাচনের মাধ্যমে।
নির্বাচন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় যদি রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের মধ্যে যারা শক্তিশালী তারা কোনো না কোনোভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে তাহলে নাগরিকদের সেইসব অধিকারের অনেকগুলোই সরাসরি বিঘ্নিত হয়। যেমন একটা দেশে যদি একটা রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে নির্বাচন ডাকা হয় তাহলে সেই দলের সমর্থকদের মতপ্রকাশের অধিকার তো বিঘ্নিত হয়ই, এমনকি সেই দলের বিরোধী যারা তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও খর্ব করা হয়। কীভাবে?
এই যে মুসেভেনির কথা আমরা বলছি, কয়েকটা দলকে নিষিদ্ধ করে তিনি কী করেছেন? তিনি উগান্ডার মানুষের পছন্দকে সীমিত করে এনেছেন। রাশিয়ার কৌতুকটা তো আপনাদের মনে আছে।
সোভিয়েত জমানায় ইউরোপ থেকে যাওয়া এক লোক মস্কোর এক রেস্টুরেন্টে ঢুকেছে ডিনার করবে বলে। ওয়েটারকে বললেন, তোমাদের নাকি খাবারের কোনো বৈচিত্র্য নেই, যা দাও তাই খেতে হয়? ওয়েটার রেগে গিয়ে বললেন, এইগুলো সব বুর্জোয়াদের অপপ্রচার, এই যে দেখুন মেন্যু, কত খাবার। পশ্চিমা লোকটি মেন্যু খুলে দেখলেন, সেখানে হরেক রকমের খাবার—বাঁধাকপির স্যুপ, বাঁধাকপির রোল, বাঁধাকপির কোফতা, বাঁধাকপি ফ্রাই, বাঁধাকপির পুডিং এইরকম করে মোট সাতাশটা পদ।
এইরকম হলে তো আর মানুষকে পছন্দের সুযোগ দেওয়া হলো না। দেশের বয়োজ্যেষ্ঠরা মনে করতে পারে যে না, মাংস খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্যে ভালো না বা মুলা খাওয়া পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্যে ক্ষতিকর। রাষ্ট্র তো আর কেবল বয়োজ্যেষ্ঠদের বা পণ্ডিতদের নয়। মানুষকে পছন্দ করার সুযোগ দিতে হয়।
আপনি যদি মেন্যু থেকে মুলা বাদ দেন, তাহলে আপনি অধিকার হরণ করলেন, যারা মুলা পছন্দ করে না ওদের অধিকারও হরণ করলেন, যারা মুলা খেতে চায় না ওদের অধিকারও গেল। কেউ যদি মুলা খেতে না চায়, সিদ্ধান্তটা তাকেই নিতে দিতে হয়। এইটাই গণতন্ত্র।
ইমতিয়াজ মাহমুদ : আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট
