নির্বাচনী ইশতেহারে পর্যটন খাত : ভবিষ্যৎ অর্থনীতির নকশা

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী ইশতেহার মানেই ভবিষ্যতের রূপরেখা। কোন খাতকে একটি রাজনৈতিক দল অগ্রাধিকার দিচ্ছে, সেটাই বলে দেয় তারা দেশকে কোন পথে এগিয়ে নিতে চায়। সেদিক থেকে এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে পর্যটন খাতকে গুরুত্ব দেওয়া নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হতে পারে।
যারা পর্যটনকে এখনো ‘বিলাসী খাত’ মনে করেন, তাদের জন্য বিশ্ব অভিজ্ঞতাই সবচেয়ে বড় জবাব। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় যখন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন পর্যটন শিল্প হতে পারে বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর ও টেকসই সমাধান।
পর্যটন এমন একটি শিল্প, যা সরাসরি ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। বিশ্বের বহু চিন্তাবিদ ও অর্থনীতিবিদ বহু আগেই পর্যটনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তির কথা বলেছেন।
অ্যাডাম স্মিথ তার Wealth of Nations গ্রন্থে সরাসরি পর্যটনের কথা উল্লেখ না করলেও সেবাখাত ও শ্রমনির্ভর অর্থনীতির যে ধারণা দিয়েছেন, আধুনিক পর্যটন শিল্প সেই দর্শনেরই বাস্তব প্রতিফলন। পর্যটন এমন একটি খাত, যেখানে মানবসম্পদই মূল শক্তি—যা বাংলাদেশের মতো শ্রমঘন অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্ট, পরিবহন, গাইড সেবা, হস্তশিল্প, স্থানীয় খাদ্য ও সংস্কৃতিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা—সব মিলিয়ে একটি শক্তিশালী ভ্যালু চেইন গড়ে ওঠে। নির্বাচনী ইশতেহারে পর্যটনকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তা তরুণ সমাজের জন্য বিশেষভাবে আশাব্যঞ্জক করে।
শিক্ষিত বেকারত্ব কমাতে এবং দক্ষ মানবসম্পদ কাজে লাগাতে পর্যটন শিল্প একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। ইশতেহারে পর্যটনকে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প হিসেবে উপস্থাপন এবং বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা সরকারের উন্নয়নমুখী দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন হয়
বিশ্ব উদাহরণে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। থাইল্যান্ড পর্যটনকে জাতীয় অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করে প্রতিবছর কোটি কোটি পর্যটক আকর্ষণ করছে। শুধু ব্যাংকক বা ফুকেট নয়, দেশটির গ্রামীণ অঞ্চলও পর্যটনের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। পর্যটন আজ থাইল্যান্ডের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস। বাংলাদেশ যদি কক্সবাজার, সিলেট বা পার্বত্য অঞ্চলকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করতে পারে, তবে একই সাফল্য অর্জন অসম্ভব নয়।
...হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্ট, পরিবহন, গাইড সেবা, হস্তশিল্প, স্থানীয় খাদ্য ও সংস্কৃতিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা—সব মিলিয়ে একটি শক্তিশালী ভ্যালু চেইন গড়ে ওঠে। নির্বাচনী ইশতেহারে পর্যটনকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তা তরুণ সমাজের জন্য বিশেষভাবে আশাব্যঞ্জক করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো শ্রীলঙ্কা। গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দেশটি পর্যটনকে পুনর্গঠনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। নিরাপত্তা জোরদার, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে তারা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পর্যটন খাতকে অর্থনীতির চালিকাশক্তিতে পরিণত করেছে। বাংলাদেশের নির্বাচনী ইশতেহারে নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পর্যটন গড়ে তোলার অঙ্গীকার থাকলে, তা বাস্তবসম্মত হতে পারে।
ইশতেহারে অবকাঠামো উন্নয়নের অনেক সময় জোর দেওয়া হয়, যা পর্যটন বিকাশের অন্যতম পূর্বশর্ত। সড়ক, রেল, নৌ ও বিমান যোগাযোগের উন্নয়ন শুধু পর্যটকদের যাতায়াতই সহজ করবে না, বরং স্থানীয় অর্থনীতিকেও গতিশীল করে। মালয়েশিয়া পর্যটন খাতে সাফল্য পেয়েছে মূলত পরিকল্পিত অবকাঠামো ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার কারণে। ‘ভিজিট মালয়েশিয়া’ ক্যাম্পেইন আজ একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড। বাংলাদেশও সঠিক পরিকল্পনায় একই পথে এগোতে পারে।
নির্বাচনী ইশতেহারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন উন্নয়ন। বিশ্বব্যাপী এখন দায়িত্বশীল পর্যটনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং সংস্কৃতির প্রতি সম্মান বজায় রেখে পর্যটন বিকাশের যে অঙ্গীকার ইশতেহারে করা হয়, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও ভারসাম্যপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় প্রকাশ করে।
আরও পড়ুন
পরিবেশ সংরক্ষণ ও পর্যটনের সমন্বয়ে কোস্টারিকা আজ বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। দেশটি ইকো-ট্যুরিজমকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত করে বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করেই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। বাংলাদেশের সুন্দরবন, হাওর অঞ্চল ও পাহাড়ি বনাঞ্চল ইকো-ট্যুরিজমের জন্য অসাধারণ সম্ভাবনাময়। নির্বাচনী ইশতেহারে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনের ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ সংরক্ষণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাও বাড়াবে।
পর্যটনে বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়টিও ইশতেহারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে রিসোর্ট, থিম পার্ক, কনভেনশন সেন্টার, ক্রজ ট্যুরিজম ও ইকো-লজ স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। এর ফলে একদিকে যেমন রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে বাংলাদেশ একটি বিনিয়োগবান্ধব পর্যটন গন্তব্যস্থল হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে।
ইশতেহারে পর্যটন বিপণন ও আন্তর্জাতিক প্রচার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক ডিজিটাল মার্কেটিং, ব্র্যান্ডিং ও আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলায় সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ, অতিথিপরায়ণ ও বৈচিত্র্যময় গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব।
এছাড়া গ্রামীণ ও কম পরিচিত পর্যটন গন্তব্যগুলো উন্নয়নের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতিও ইশতেহারের একটি ইতিবাচক দিক হতে পারে। এর ফলে শহরমুখী চাপ কমে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হয়। এই ক্ষেত্রে নেপাল একটি আদর্শ দৃষ্টান্ত।
পাহাড়ি গ্রামগুলোয় হোমস্টে ও কমিউনিটি-বেইজড ট্যুরিজম চালু করে তারা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আয় ও জীবনমান উন্নত করেছে। উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন উন্নয়নকে শুধু আয় বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলেছেন। পর্যটন শিল্প ঠিক সেই কাজটিই করে—স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে আয়, দক্ষতা ও আত্মমর্যাদার সুযোগ দেয়। গ্রামীণ ও কমিউনিটি-বেইজড ট্যুরিজমের ওপর জোর দেওয়ার মাধ্যমে নির্বাচনী ইশতেহার অমর্ত্য সেনের capability approach-এর সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইশতেহারে পর্যটন বিপণন ও আন্তর্জাতিক প্রচার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক ডিজিটাল মার্কেটিং, ব্র্যান্ডিং ও আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলায় সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ, অতিথিপরায়ণ ও বৈচিত্র্যময় গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব।
মধ্যপ্রাচ্যে দুবাই (সংযুক্ত আরব আমিরাত) প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও পর্যটনের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। পরিকল্পিত বিনিয়োগ, উদ্ভাবনী ধারণা ও আন্তর্জাতিক প্রচারণা তাদের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। নির্বাচনী ইশতেহারে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে পর্যটন বিনিয়োগ বৃদ্ধির ঘোষণা বাংলাদেশকেও সেই উন্নত ব্যবস্থাপনার পথে এগিয়ে নিতে পারে।
সমালোচকরা অনেক সময় বলেন, ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয় না। কিন্তু বাস্তবতা হলো—যেখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে, সেখানে বাস্তবায়নও সম্ভব। কয়েক দশকে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ খাতে যে অগ্রগতি হয়েছে, তা প্রমাণ করে পরিকল্পনা থাকলে উন্নয়ন সম্ভব। যদিও পর্যটন খাত অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। নীতিমালা সংস্কার, দক্ষতা উন্নয়ন, নিরাপত্তা জোরদার এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার—সব মিলিয়ে এটি একটি সমন্বিত উন্নয়ন দর্শনের প্রতিফলন হয়।
WTTC (২০২২) সালে প্রকাশিত মূল্যায়নে বলা হয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোয় পর্যটন খাত পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই পর্যায়েই দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে ভবিষ্যৎ পর্যটন প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়—যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত সম্ভাবনাময়।
সবদিক বিবেচনায় বলা যায়, নির্বাচনী ইশতেহারে পর্যটন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া একটি সাহসী, বাস্তবসম্মত ও বিশ্ব স্বীকৃত উন্নয়ন দর্শনের প্রতিফলন। বিশ্ব যেখানে এই পথে সফল, বাংলাদেশ সেখানে পিছিয়ে থাকবে—এমন কোনো যুক্তি নেই। বরং সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে পর্যটনই হতে পারে বাংলাদেশের আগামী অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
সামশাদ নওরীন : সহযোগী অধ্যাপক, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
