সশস্ত্র বাহিনীর ক্রমবিকাশমান ভূমিকা—একটি রাজনৈতিক সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, রাষ্ট্র গঠন এবং গণতন্ত্রের বিবর্তনে সশস্ত্রবাহিনীর একটি অনন্য এবং গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া সশস্ত্র বাহিনী সশস্ত্র যুদ্ধের অগ্রদূত, জাতীয় প্রতিরোধের প্রতীক, জাতি গঠন, শাসক, সার্বভৌমত্বের অভিভাবক, উন্নয়ন সহযোগী এবং কখনও কখনও রাজনৈতিক সংকটে মধ্যস্থতাকারীসহ বহুমুখী ভূমিকা রেখেছে।
১৯৭১ সালে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা একটি শক্তিশালী মিথ প্রতিষ্ঠা করে : তারা কেবল রাষ্ট্রের রক্ষক ছিল না বরং জাতির সার্বভৌমত্ব এবং পরিচয়ের সঙ্গে অন্তর্নিহিতভাবে যুক্ত ছিল। এই উত্তরাধিকার তাদের ওপর বিশাল নৈতিক কর্তৃত্ব এবং জাতির ভবিষ্যত পথচলায় একটি অনুভূত অংশীদারিত্ব অর্পণ করেছিল।
সরাসরি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যুদয়। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চের কাল রাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী “অপারেশন সার্চলাইট” এর নামে বাঙালি নিধন শুরু করে। তদানীন্তন পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী, ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস, পুলিশ এবং আধা সামরিক বাহিনীগুলোর বাঙালি ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সদস্যরা এবং সাধারণ জনগণ সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলে। বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের বিশেষ করে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক কর্নেল এম এ জি ওসমানী, মেজর জিয়াউর রহমান প্রমুখের প্রত্যক্ষ ভূমিকায় অভিযান সমন্বয়, গেরিলাদের প্রশিক্ষণ এবং প্রচলিত ও অনিয়মিত যুদ্ধ সুসংহত হয়।
২৭ মার্চ ১৯৭১ তারিখে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা, যা ওই সময়ে সমগ্র বাংলাদেশের জনসাধারণকে সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য অনুপ্রাণিত করেছিল; তা আজও স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশে বাতাসে অনুরনিত হয়।
১৯৭২ সালের অব্যবহিত পরের সময়কালে সশস্ত্র বাহিনী পুনর্গঠন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ডিমোবিলাইজেশন ও আনুষ্ঠানিক জাতীয় কাঠামোতে আত্মীকরণের পাহাড়সম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। আদর্শিক বিভাজন এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষায় বিভক্ত সশস্ত্র বাহিনী ধারাবাহিক সামরিক অভ্যুত্থান এবং পাল্টা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে নির্ণায়কের ভূমিকায় উঠে আসে।
১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে, সশস্ত্র বাহিনী বাংলাদেশ শাসনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিল। প্রথমে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে এবং পরে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের অধীনে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের রাজনীতি চালু করেন এবং জাতীয়তাবাদকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেন। তার নেতৃত্বে সামরিক বাহিনী প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সম্প্রসারিত হয় এবং রাজনৈতিক প্রভাব লাভ করে, একই সঙ্গে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনে। ১৯৮১ সালে তার হত্যা স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করে।
জেনারেল এরশাদ ১৯৮২ সালে ক্ষমতা দখল করেন এবং ১৯৯০ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। তার শাসনামলে সামরিক বাহিনীর বেসামরিক প্রশাসন ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জড়িত হওয়া প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মাধ্যমে সামরিক-সমর্থিত শাসনকে বৈধতা দেওয়া হয়। এই সময়ে সশস্ত্র বাহিনী রাজনীতি, শাসন ও পৃষ্ঠপোষকতার বেড়াজালে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান, যা সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে এবং সশস্ত্র বাহিনীর সমর্থনে হয়, এরশাদকে পদত্যাগে বাধ্য করে। এটি গণতান্ত্রিক শাসনের মোড় পরিবর্তন নির্দেশ করে এবং সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে।
১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর সশস্ত্র বাহিনী সরাসরি রাজনৈতিক শাসন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে আসে এবং বেসামরিক কর্তৃত্বের অধিনস্ত হয়। সামরিক নেতৃত্ব আরও পেশাদার ও সাংবিধানিক ভূমিকা গ্রহণ করে, যার লক্ষ্য প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে স্থানান্তরিত হয়। নির্বাচন তত্ত্বাবধানের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গভীর অবিশ্বাসের প্রতিফলন। এই অবিশ্বাসের সময়ে, বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আশেপাশে, সামরিক বাহিনী নিরপেক্ষ অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করে এবং সহিংসতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এছাড়া এই সময়ে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ সশস্ত্র বাহিনীর আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও পেশাদার মনোভাব বৃদ্ধি করে।
১৯৯০-এর পর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হস্তক্ষেপ ঘটে ২০০৬-০৭ সালের রাজনৈতিক সংকটে, যখন নির্বাচনী প্রশাসন নিয়ে বিরোধ ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে, নির্বাচন স্থগিত করে এবং একটি উচ্চাভিলাষী দুর্নীতি-বিরোধী অভিযান শুরু করে। যদিও সশস্ত্র বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা গ্রহণ করেনি, তাদের সমর্থনই অন্তর্বর্তীকালীন শাসনকে টিকিয়ে রাখে। এই সময়কাল সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক স্থিতিশীলকারী ও সংকট ব্যবস্থাপক হিসেবে ক্ষমতা প্রদর্শন করে। তবে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের মাধ্যমে ইতিবাচক পদক্ষেপ রাখে।
২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সশস্ত্র বাহিনী প্রকাশ্য রাজনীতির বাইরে থেকেছে, নির্বাচিত সরকারের অধীনে কাজ করছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে সামরিক উপস্থিতির উদ্দেশ্য ছিল সহিংসতা নিরসন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা। সমালোচকরা সশস্ত্র বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবু প্রতিষ্ঠান হিসেবে সশস্ত্র বাহিনী সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এড়িয়ে গেছে, যা পূর্ববর্তী দশকগুলো থেকে উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতি। নির্বাচনের বাইরে সামরিক বাহিনী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান ও সীমান্ত নিরাপত্তায় ভূমিকা সম্প্রসারণ করেছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, মহামারী ও মানবিক সংকটে সেবা প্রদান করার ক্ষেত্রে এটি অতুলনীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে আস্থা অর্জন করেছে।
২০২৪ সালের গণ অভ্যুত্থানের সময় সশস্ত্র বাহিনী পুনরায় সংকটকালিন ত্রাতা, স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং গণতন্ত্র পুনঃরুদ্ধারের বহুমুখী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। অপরাপর সংকটের চাইতে এবারে সশস্ত্র বাহিনীর অনন্য ভূমিকা দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। আজ সশস্ত্র বাহিনীর বৈধতা রাজনৈতিক ক্ষমতার চেয়ে পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও জনসেবার ওপর নির্ভর করে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ২০২৫ সালের জটিল গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি পর্যন্ত, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী দেশের গণতান্ত্রিক ব্যর্থতায় দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও গণতন্ত্র পুনঃরুদ্ধারে অগ্রণী দায়িত্ব পালন করেছে। তারা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা, অস্থিরতার সময় শাসক এবং পরে সাংবিধানিক শৃঙ্খলা ও নির্বাচনী নিরাপত্তার অভিভাবক। তাদের যাত্রা জাতীয়তাবাদ, সামরিক প্রভাব ও গণতান্ত্রিক শাসনের মধ্যে সমন্বয় সাধনের বাংলাদেশের বৃহত্তর সংগ্রামের প্রতিফলন। সামনে চ্যালেঞ্জ হলো এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করা—সশস্ত্র বাহিনীকে শক্তিশালী কিন্তু অরাজনৈতিক, ক্ষমতাশালী কিন্তু বেসামরিক কর্তৃত্বের অধীন রাখা। এভাবে তারা স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিদাতা ও সার্বভৌমত্বের রক্ষক হিসেবে মুল্যায়িত হবে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাহেদুর রহমান, এনডিসি, পিএসসি, ডিরেক্টর জেনারেল, ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ