ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন : আগামীর শিক্ষাচিন্তা ও আমাদের প্রত্যাশা

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশ। আপাত দৃষ্টিতে অধিক জনসংখ্যা দেশের উন্নয়নের পথে অন্তরায় মনে হলেও আমরা বাংলাদেশের এই বিপুল সংখ্যক জনসংখ্যার মাঝেই খুঁজি সম্ভাবনার অবারিত দুয়ার।
দেশের এই বিশাল জনগোষ্ঠী জনসম্পদে পরিণত করতে পারলে খুব দ্রুতই আমরা উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। বিশাল এই জনগোষ্ঠী দক্ষ ও কর্মক্ষম মানবসম্পদে পরিণত করতে হলে, তাদের উন্নত প্রশিক্ষণ আর দক্ষতার উন্নয়ন জরুরি।
আর এজন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা। সেই অনুযায়ী পরিকল্পিত বিনিয়োগের মাধ্যমে আমাদের দেশের জনগোষ্ঠী জনসম্পদে রূপান্তরের মধ্যেই অন্তর্নিহিত রয়েছে গোটা দেশের উন্নয়ন।
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আগামীর বাংলাদেশেকে আমরা কোথায় দেখতে চাই তার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠবে জাতীয় নির্বাচনে। যার মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচিত করে আমরা জাতিসত্তার উন্নয়ন কাজের ম্যান্ডেট দেবো। কিন্তু তার পূর্বসূত্র হিসেবে দেশের জনগণ দেখবে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে কী বলছে?
পূর্ববর্তী সময়গুলোয় যদিওবা নির্বাচনী ইশতেহারে কে-কী বলেছে তা মানুষ গুরুত্ব না দিলেও বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রার যুগে দেশের সাধারণ জনগণ অনেক বেশি সচেতন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তাদের নির্বাচনী বক্তব্যে কী বলছে, কীইবা তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, এমনকি কী বলে ভোট চাওয়ার আশ্বাস দিচ্ছে সেটিও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিয়ে আসে।
চায়ের দোকান থেকে শুরু করে পাঁচতারকা হোটেলের লবি বা অন্যকোনো স্থান সর্বত্রই সমান তালে আলোচনা কিংবা ভাবনা অব্যাহত আছে।
নির্বাচনে অংশ নেওয়া অনেক রাজনৈতিক দল ইতিমধ্যেই তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে আবার কেউ কেউ প্রকাশ করবে। আবার কেউবা জোটগতভাবে প্রকাশ করবে। তবে দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয় গুরুত্ব সহকারে অগ্রাধিকার বৃদ্ধিতে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছি।
আগামীতে যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসবে তাদের উচিত দেশের শিক্ষা নিয়ে নতুনভাবে ভাবা এবং ভাবনাগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন করা। সেটা করার জন্য প্রথমেই সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে বিদ্যমান শিক্ষা সংশ্লিষ্ট নীতি এবং আইন সমূহের আধুনিকীকরণ করা জরুরি।
আবার নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষাখাত কেমন হওয়া প্রয়োজন সে ব্যাপারে বেশকিছু গোলটেবিল আলোচনা ও বিশেষজ্ঞ মতামত প্রকাশিত হয়েছে। এগুলোর সমন্বয়ে আগামীতে যারা রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করতে যাচ্ছে তাদের যেসব বিষয়াদি বিবেচনা করা প্রয়োজন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
যেহেতু শিক্ষা মানুষের জন্য সুযোগ নয় বরং একজন মানুষের অধিকার যা রাষ্ট্র ও সংবিধান স্বীকৃত। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদে অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয় ও চিকিৎসার পাশাপাশি শিক্ষাকে মৌলিক প্রয়োজন হিসেবে স্বীকৃত দেওয়া হয়েছে। ১৭ অনুচ্ছেদে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার কথা বলা হয়েছে এবং আরও বলা রয়েছে রাষ্ট্র তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।
আগামীতে যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসবে তাদের উচিত দেশের শিক্ষা নিয়ে নতুনভাবে ভাবা এবং ভাবনাগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন করা। সেটা করার জন্য প্রথমেই সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে বিদ্যমান শিক্ষা সংশ্লিষ্ট নীতি এবং আইন সমূহের আধুনিকীকরণ করা জরুরি।
আমাদের ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতি র চর্চার পাশাপাশি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সম্পন্ন সুনাগরিক তৈরি করবে বিষয়টি বিবেচনায় রেখে শিক্ষার ভিত্তি সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, পেশাগত শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় (মাদরাসা) শিক্ষাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রকে সমানুপাতিক হারে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি।
নীতি এবং আইনের আধুনিকীকরণ ও যথাযথ প্রয়োগের জন্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষাবিদসহ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বয়ে পরিকল্পনা প্রণয়নে ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন
আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতির চাহিদার সাথে সংগতি রেখে এবং উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক শিক্ষাক্রম, তদনুযায়ী পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নে যথাযথ ভূমিকা রাখা।
আমাদের দেশে চলমান বিভিন্ন ধারার শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় ও সমতা সাধন করা প্রয়োজন। যেমন ব্রিটিশ কারিকুলামে পরিচালিত ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা শিক্ষা বিশেষ করে কওমি শিক্ষার্থীদের সাধারণ শিক্ষার সাথে ব্রিজিং নিশ্চিত করা। উচ্চ শিক্ষা খাতে গবেষণার পর্যাপ্ত সুযোগ নিশ্চিত করা।
প্রাথমিক শিক্ষার সুষম উন্নয়নে যেসব অন্তরায় বিদ্যমান সেগুলো বাস্তবসম্মত সমাধানের রূপরেখা প্রণয়ন জরুরি। সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে সম্মানিত শিক্ষকদের আন্তরিকতা বাড়াতে এবং পেশাদারিত্বের মনোভাব তৈরি করতে শিক্ষকদের পরামর্শ যথাযথভাবে গ্রহণ করা, শিক্ষাসংক্রান্ত যেকোনো নীতি বা সিদ্ধান্তগ্রহণে শিক্ষক সমাজের প্রতিনিধি তথা শিক্ষাবিদদের অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করতে হবে।
মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে শিক্ষক—শিক্ষার্থী ও আদর্শ অনুপাত, শ্রেণিকক্ষ উন্নয়ন, শিক্ষণ—শিখন পদ্ধতির উন্নয়নসহ শিক্ষায় জনঅংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা স্কুল মিল কর্মসূচিকে সর্বজনীন করা, শিক্ষায় সব ধরনের বৈষম্য নিরসন করার জন্য একীভূত পরিকল্পনা নিতে হবে।
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানোকে সুনিশ্চিত করা, আমাদের দেশে শিক্ষার্থীদের জন্য বিষয়ভিত্তিক পেশা বা কর্মক্ষেত্র তৈরি করাকে গুরুত্ব প্রদান করা, উচ্চশিক্ষায় উন্নতমানের গবেষণার জন্য সুযোগ ও বরাদ্দ প্রদান করা সেইসাথে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের র্যাঙ্কিং বৃদ্ধিতে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০—এর লক্ষ্যমাত্রা ৪ অর্জনের জন্য বাস্তবমুখী কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। একইসাথে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদী কর্ম পরিকল্পনা হাতে নেওয়া এবং সুনির্দিষ্ট ভিশনকে সামনে রেখে এগিয়ে যাওয়া তথা বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে।
শিক্ষাখাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে যথেষ্ট পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিতকরণ এবং শিক্ষায় অধিক পরিমাণে বিনিয়োগের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। আমাদের দেশে শিক্ষায় অর্থায়ন হতাশাব্যঞ্জক। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ সবচেয়ে কম। শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য অবশ্যই শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৭ শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দ রাখার বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত করতে হবে।
আমাদের দেশে শিক্ষায় অর্থায়ন হতাশাব্যঞ্জক। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ সবচেয়ে কম। শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য অবশ্যই শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
শিক্ষা নিয়ে চিন্তা করা প্রয়োজন সর্বাগ্রে কেননা শিক্ষাখাতের উন্নয়ন সুনিশ্চিত করা গেলেই সত্যিকারভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। ১৮ কোটির বিশাল জনগোষ্ঠী দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে হলে শিক্ষাখাতের উন্নয়নের বিকল্প নেই। শিক্ষাখাতের অগ্রগতির মাঝেই অন্তর্নিহিত রয়েছে শিল্প, বাণিজ্য, অর্থ, চিকিৎসা, সামরিক, পররাষ্ট্রসহ সব খাতের অগ্রযাত্রা। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর তাদের ইশতেহারে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার বলে মনে করছি।
অবাধ তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রযাত্রার যুগে বাংলাদেশের নাগরিকরা অনেক বেশি সচেতন তারা দেশের আগামীর নেতৃত্বে তাদেরই নিয়ে আসবে যারা প্রকৃত অর্থেই বাংলাদেশের উন্নয়নকে নিয়ে ভাবে আর এই ভাবনার বহিঃপ্রকাশ তথা প্রতিফলন ঘটে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের মধ্য দিয়েই।
আর দিনশেষে দেশের জনগণই মূল্যায়ন করবে তাদের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির অর্জন কতটুকু হলো যার রূপরেখা হচ্ছে ইশতেহার। সুন্দর হোক আগামীর বাংলাদেশ সেখানে নিশ্চিত হবে প্রকৃত সমতায়।
সৈয়দ মো. সিয়াম : সহকারী অধ্যাপক, শিক্ষা বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়