অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিক নতুন সরকার

দেশের মানুষের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে নতুন সরকার নির্বাচিত হলো। জনগণের ভোটাধিকারের প্রয়োগ এবং আপাতদৃষ্টিতে সর্বস্তরের মানুষের স্বস্তি এই বার্তাই দেয় যে এমন একটি শুভক্ষণের জন্য ছিল দীর্ঘ অপেক্ষা।
সদ্য বিদায় নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামল নিয়ে রয়েছে বিস্তর বিতর্ক। তাদের ভাষায়, একটি ফ্যাসিবাদী সরকারের উত্তরসূরি হয়ে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশকে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশের দিকে নিয়ে যেতে বেশ কয়েকটি সংস্কার কমিশনের কর্মকাণ্ড সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
বাস্তবে বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব পায়নি বরং এটাই সর্বজনগ্রাহ্য হয়েছে যে সংস্কারের নামে সময়ক্ষেপণ করে তারা নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থে কাজ করেছে। ফলত দুর্নীতি এবং দুঃশাসন রোধ করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে এ সবকিছুই বেড়েছে অনেক বেশি মাত্রায়, সেই সাথে বেড়েছে মব/নৈরাজ্যের নামে বিচারহীনতার সংস্কৃতি।
নির্বাচন বিলম্বিত করতেও ছিল নানামুখী প্রচেষ্টা। বলা যায়, এসবকিছুর বিপরীতে নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রবল গণ-ইচ্ছার কাছে অবশেষে মাথানত করতে হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারকে।
নতুন নির্বাচিত সরকারকে অভিনন্দন। ব্যাপক জনসমর্থন যেমন একটি নির্দিষ্ট দলের প্রতি জনগণের আস্থার প্রতিফলনকে তুলে ধররে, একইভাবে এর মধ্যদিয়ে জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে এবং মৌলিক কিছু আশা-আকাঙ্ক্ষা, যা এতদিন অধরা থেকে গেছে—সেগুলো পূরণের ক্ষেত্রে একধরনের দায়িত্ববোধকেও স্মরণ করিয়ে দেয়।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সৃষ্টির পর থেকে বলা যায় অধিকাংশ সময়ই বিরাজ করেছে অগণতান্ত্রিক পরিবেশ, যা স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত একটি জাতির মৌলিক ইচ্ছাগুলো বাস্তবায়িত হয়ে দেয়নি। গণতান্ত্রিক পরিবেশে নির্বাচিত হয়েও একটি সরকার কীভাবে স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে, এর দৃষ্টান্ত নিকট অতীতে আমরা দেখেছি।
তারপরও এদেশের সাধারণ মানুষ গণতন্ত্রকামী, যার প্রতিফলন ঘটেছে আন্দোলন-সংগ্রাম, বিপ্লব এবং নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। এসব কিছু বিবেচনায় এবারের নির্বাচিত সরকারের প্রতি তাই জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি।
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে প্রবল দুর্নীতির মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতি যে ধ্বসে যেতে যাচ্ছিল, এর থেকে উত্তরণে অন্তর্বর্তী সরকারের কি অবদান রয়েছে, তা নিয়ে জনমনে রয়েছে অনেক বিভ্রান্তি। তবে দৃশ্যত আমরা এই সময়টায় দেখেছি বৈদেশিক বিনিয়োগে প্রবল ভাটা, যার মধ্য দিয়ে বেড়েছে মূল্যস্ফীতি এবং জনদুর্ভোগ।
এমন অবস্থায় এসে নতুন সরকারের প্রথম কাজই হবে দেশের এই ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা মেরামতে কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন। ছেঁটে ফেলতে হবে অপ্রয়োজনীয় পরিকল্পনা এবং কমাতে হবে সরকারি ব্যয়। সেই সাথে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, নতুন মুদ্রানীতি প্রণয়ন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে অসাধু সিন্ডিকেট চক্র ভেঙে ফেলা এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন রোধে কঠিন হতে হবে।
বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে কার্যকর বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যেতে হবে। দেড় বছর সময়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হারে বিনিয়োগ কমেছে। সেগুলো আবার ফেরত আনার সাথে সাথে নতুন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে নতুন অর্থমন্ত্রীকে চমক দেখাতে হবে।
দেশের অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হচ্ছে শ্রমবাজার। দেশের মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশের বেশি বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে, যার মধ্যে কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই অবস্থানকারীদের সংখ্যা ১ কোটির অধিক। এই শ্রমিকদের মধ্যে আবার ৫৮ লাখ নিয়োজিত রয়েছেন সৌদি আরবে, ২৪ লাখ আরব আমিরাতে, ১৯ লাখ ওমানে এবং আরও কিছু রয়েছেন অন্যান্য দেশে।
আরও পড়ুন
নব্বইয়ের দশক থেকে মালয়েশিয়াও আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। তবে বিভিন্ন সময়ে সেখানে শ্রমিক পাঠানো নিয়ে কিছু অস্থিরতা দেখা গেছে। দেশটিতে আরও অধিক সংখ্যায় বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানোর সম্ভাবনা থাকলেও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কারণে তা হয়ে উঠছে না।
বর্তমানে সেখানে রয়েছেন প্রায় ১৪ লাখ শ্রমিক। এর বাইরে অ-আরব এবং পশ্চিমা দেশগুলোয়ও বাংলাদেশি দক্ষ শ্রমশক্তি পাঠানোর সুযোগ রয়েছে, যা আমাদের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণে সাহায্য করে আমাদের অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে পারে। নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী এবং শ্রম/বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রীদের সমন্বয়ে কার্যকর প্রচেষ্টা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনয়নে দরকার দক্ষ এবং মেধা সম্পন্ন পররাষ্ট্রনীতি। বর্তমান সরকারের সেই সক্ষমতা রয়েছে বলে মনে করা যায়। সরকার এবং দলের ভেতরে রয়েছেন একাধিক যোগ্য ব্যক্তিত্ব, যারা আমাদের পররাষ্ট্রনীতিকে একটি ভারসাম্যের মধ্য দিয়ে পরিচালনা করতে সক্ষম।
পররাষ্ট্রনীতির মুখ্য উদ্দেশ্যই হোক অর্থনৈতিক কূটনীতি, আর এ লক্ষ্যে দরকার সব অংশীজনের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক। তারেক রহমান তার নির্বাচনোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এ নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে একই কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন, আর তা হচ্ছে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি তার পররাষ্ট্রনীতিকে পরিচালনা করতে ইচ্ছুক।
প্রায় দেড় বছরের বেশি সময় মেয়াদি অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব পালনের পর একটি নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠা এবং এই নতুন সরকারকে ঘিরে শুধু দেশের সাধারণ মানুষই নয়, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ও আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নির্বাচিত সরকারকে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ভারতকে অবশ্যই আস্থায় রাখতে হবে, কারণ ভারতকে বাস্তবিকভাবে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করাও প্রয়োজন, কারণ উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে তাদের সঙ্গে আমাদের অনেক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় রয়েছে। এশিয়ার উদীয়মান শক্তি হিসেবে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন নতুন সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে, সেই সাথে রয়েছে রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ধরে রাখার বিষয়টিও।
এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে ভারত-পাকিস্তান এবং যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র চীনের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিবেচনায় বাংলাদেশ এই সবগুলো দেশের সাথে কীভাবে ভারসাম্যপূর্ণ বিষয় বজায় রাখতে সক্ষম হবে সেটি একটি বড় ভাবনার বিষয়।
সেই সাথে রয়েছে আরও দুটি বড় চ্যালেঞ্জ—
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র থেকে জিএসপি সুবিধা ফিরিয়ে আনার বিষয়;
এবং দ্বিতীয়ত, ২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে অনুন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে মর্যাদা পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ, যা একটি অর্জন হলেও এর মধ্য দিয়ে বৈদেশিক বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য হারে কোটামুক্ত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবো আমরা।
এক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতাকে তুলে ধরতে প্রয়োজন কার্যকর এবং দূরদর্শী অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং কূটনৈতিক তৎপরতা। সরকারের পক্ষ থেকে অর্থনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সার্বিক বিষয়গুলোর নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।
এসব কমিটিগুলোয় অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। একই সাথে এসব বিষয় নিয়ে নির্দিষ্ট সময় অন্তর নাগরিক সংলাপের আয়োজন করতে পারলে জনআকাঙ্খাকেও ধারণ করে সরকারের পক্ষে কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
নির্বাচনোত্তর সময়ে তারেক রহমান তার প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দের বাসায় গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন, যা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি বিরল উদাহরণ। তিনি চাইছেন রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে গিয়ে সবাইকে নিয়ে জাতীয় স্বার্থে কাজ করে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে। অনেক শুভকামনা রইল নতুন সরকারের জন্য।
ড. ফরিদুল আলম : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়