গ্যাস বিস্ফোরণে দগ্ধ হওয়া শুধু দুর্ঘটনা নয়, নগর নিরাপত্তার অশনি সংকেত

চট্টগ্রামের হালিশহরে গ্যাস লাইন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। এতে দগ্ধ হয় ৯ জন। ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ঢাকার হাজারীবাগে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ, শিশুসহ দগ্ধ ৪ জন। এই সংবাদ আমাদের নগর জীবনে নীরব বিপদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
রান্নাঘর, বাথরুম কিংবা সরু গলির নিচে বসানো গ্যাস সঞ্চালন লাইন—যা আধুনিক জীবনের স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতীক—সেই ব্যবস্থাই যখন মুহূর্তে অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়, তখন তা কেবল দুর্ঘটনা নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনার গভীর ত্রুটির ইঙ্গিত।
চট্টগ্রামের ঘটনায় প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে জমে থাকা গ্যাসে স্ফুলিঙ্গের সংযোগ থেকে বিস্ফোরণ ঘটে, আর হাজারীবাগের ঘটনায় ঘরের ভেতরে গ্যাসের গন্ধ টের পাওয়ার পরও যথাযথ সতর্কতা না নেওয়ায় আগুন ধরে যায়। দুটি ঘটনাই দেখায়, গ্যাস লিকেজ কেবল প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা নয়—এটি নজরদারি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নাগরিক সচেতনতার সমন্বিত ঘাটতির ফল।
বাংলাদেশের বড় মহানগরগুলো বিশেষত ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর দ্রুত নগরায়ণের চাপে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে। পুরোনো পাইপলাইন, অপরিকল্পিত সংযোগ, অবৈধ লাইন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব মিলিয়ে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিভিন্ন গণমাধ্যম ও ফায়ার সার্ভিসের প্রতিবেদন বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় গ্যাস লিকেজ ও বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। আবাসিক ভবনে জমে থাকা গ্যাস, ভূগর্ভস্থ লাইনের ফাটল, কিংবা স্যুয়ারেজ লাইনের সঙ্গে গ্যাস লাইনের সংযোগজনিত ত্রুটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি করছে।
২০২১ সালে ঢাকার মগবাজারের ওয়্যারলেস এলাকায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ এবং ২০২০ সালে নারায়ণগঞ্জের একটি মসজিদে গ্যাস জমে বিস্ফোরণের ঘটনা স্মরণ করলেই বোঝা যায়—এই ঝুঁকি কতটা বাস্তব ও প্রাণঘাতী।
গ্যাস লিকেজের পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ কাজ করে—
প্রথমত, বহু পুরোনো পাইপলাইন এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে, যেগুলোর আয়ুষ্কাল অনেক আগেই শেষ হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, দ্রুত নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন হয়নি।
তৃতীয়ত, অবৈধ সংযোগ ও নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহারের কারণে পাইপলাইনে চাপের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
চট্টগ্রামের ঘটনায়ও ধারণা করা হচ্ছে, কোনো একটি সংযোগস্থলে ফাঁক তৈরি হয়ে গ্যাস দীর্ঘসময় ধরে জমেছিল। হাজারীবাগের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একটি ছোট লিকেজও কয়েক মিনিটে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, কারণ সেখানে বায়ু চলাচল সীমিত এবং ঘরগুলো ঘনিষ্ঠভাবে নির্মিত।
এই সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর ঘনবসতিপূর্ণ মেগাসিটিগুলোয়ও একই ধরনের ঝুঁকি বিদ্যমান। ভারতের দিল্লি ও মুম্বাইতে পাইপড ন্যাচারাল গ্যাস (পিএনজি) ব্যবহারের বিস্তার ঘটলেও মাঝেমধ্যে লিকেজ ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
দিল্লিতে আবাসিক ভবনে জমে থাকা গ্যাস থেকে বিস্ফোরণের একাধিক ঘটনা সংবাদ শিরোনাম হয়েছে, যেখানে তদন্তে দেখা গেছে নিয়মিত পরিদর্শনের ঘাটতি ও পুরোনো ভালভ ব্যবস্থাই ছিল প্রধান কারণ।
পাকিস্তানের করাচিতেও গ্যাস লাইন বিস্ফোরণে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে; সেখানেও অবৈধ সংযোগ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণকে দায়ী করা হয়। এসব শহরের অভিজ্ঞতা দেখায়, কেবল গ্যাস সরবরাহের সম্প্রসারণই উন্নয়ন নয়—নিরাপত্তা মানদণ্ড কঠোরভাবে বাস্তবায়নই প্রকৃত অগ্রগতি।
বিশ্বের উন্নত শহরগুলোয় গ্যাস নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় গ্যাস ডিটেক্টর, স্মার্ট মিটারিং সিস্টেম এবং নিয়মিত লিকেজ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের মহানগরগুলোয় এখনো অনেক পরিবার জানেই না, রান্নাঘরে গ্যাস ডিটেক্টর স্থাপন কতটা জরুরি। আবার অনেক ভবনে নির্মাণের সময় গ্যাস লাইনের মান যাচাই করা হয় না। ফলে একটি ছোট ফাটল বা ঢিলা সংযোগই প্রাণঘাতী বিস্ফোরণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
চট্টগ্রামের হালিশহর ও ঢাকার হাজারীবাগের গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনা কেবল দুটি পৃথক দুর্ঘটনা নয়; এটি নগর নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য অশনি সংকেত। নগরবাসী যখন প্রতিদিন ঘরে ফিরে নিরাপত্তা প্রত্যাশা করে, তখন তাদের রান্নাঘরই যদি ঝুঁকির কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তবে সেই সমাজে নিরাপত্তাবোধ ভেঙে পড়ে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এর প্রভাব কম নয়। একটি বিস্ফোরণ মানে শুধু প্রাণহানি নয়; চিকিৎসা ব্যয়, সম্পদের ক্ষতি, ব্যবসায়িক স্থবিরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা—সব মিলিয়ে বড় সামাজিক ক্ষতি।
এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। গ্যাস সঞ্চালন লাইনের মানোন্নয়ন, পুরোনো পাইপলাইন দ্রুত প্রতিস্থাপন, নিয়মিত নিরাপত্তা অডিট এবং অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি—গ্যাসের গন্ধ পেলে তাৎক্ষণিকভাবে চুলা বা বৈদ্যুতিক সুইচ ব্যবহার না করা, জানালা খুলে বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করা এবং দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো—এসব মৌলিক সতর্কতা বহু প্রাণ বাঁচাতে পারে।
নগরায়ণ অনিবার্য, গ্যাসভিত্তিক জ্বালানিও আধুনিক জীবনের অংশ। কিন্তু নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে সেই সুবিধা সম্প্রসারণ আত্মঘাতী। চট্টগ্রামের হালিশহর ও ঢাকার হাজারীবাগের দগ্ধ মানুষের আর্তনাদ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অবহেলা আর বিলম্বের মূল্য চড়া।
এখনই যদি অবকাঠামো সংস্কার, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত না করা যায়, তবে এ ধরনের মর্মান্তিক সংবাদ ভবিষ্যতেও আমাদের তাড়া করবে। নিরাপদ নগর গড়ে তোলার প্রশ্নে আর কোনো অবহেলার সুযোগ নেই।
এম এম বাদশাহ্ : প্রধান বার্তা সম্পাদক, বাংলা টিভি; সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশন (ক্র্যাব)
[email protected]