ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা, খামেনির মৃত্যু, এরপর কী?

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ভোরে ইসরায়েলের বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই খামেনিকে তাদের মূল শত্রু হিসেবে অভিহিত করে আসছিল এবং তাদের ভাষায় একটি কার্যকর পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরের পথে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে বড় বাঁধা।
একইসাথে নিহত হয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান, বিপ্লবী গার্ড রেজিমেন্টের প্রধানসহ কমপক্ষে ৩০ জন শীর্ষস্থানীয় নেতা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই হামলার মধ্য দিয়ে তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন এবং এর ফলে ইরানের নেতৃত্বের বোধোদয় হবে বলে উল্লেখ করেছেন।
২০২৫ সালের জুন মাসে প্রথমে ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের ওপর হামলা, ইরানের দিক থেকে প্রতিরোধমূলক পাল্টা আক্রমণ এবং এরপর ইসরায়েলের হামলাকে সমর্থন করে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বি-২ বোমারু বিমান হামলা করে ইরানের পরমাণু স্থাপনার ক্ষতিসাধন এবং এর বিপরীতে ইরানের পক্ষ থেকে আবারও কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটি লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা এবং একইসাথে ইসরায়েলের একাধিক স্থানে হামলা চালিয়ে উল্লেখযোগ্য ক্ষতিসাধনের পর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতির ঘোষণাকে একটি কৌশল হিসেবে তখন থেকেই অনুমান করা যাচ্ছিল।
সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এই যুদ্ধকে প্রলম্বিত না করার একটাই উদ্দেশ্য ছিল, আর সেটা হচ্ছে তাদের প্রস্তুতির অভাব। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যেখানে ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন চাচ্ছিল, সে লক্ষ্যে উপনীত হতে হলে তাদের প্রস্তুতির বাকি অংশটুকু সারতেই এই কয়মাসে তারা মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি সেরে ফেলে।
এই হামলার সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য ইসরায়েলের স্বার্থে রক্ষা হলেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে, বিশেষ করে সৌদি আরব, কাতার এবং আরব আমিরাতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সুসম্পর্কের ফলে এই দেশগুলোর জন্যও ইরানকে একটি পরোক্ষ হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে আসছিল।
মাঝের কিছুদিন আলোচনার নামে একটি নাটক মঞ্চায়ন করা হলো, ইরানের ভেতরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে উসকে দেওয়া হলো, যার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পরিকল্পিত হামলাকে একধরনের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করল।
প্রশ্ন উঠছে ব্যাপকভাবে, কেন এই হামলা, এটি কি অনিবার্য ছিল? এর পেছনের কারণগুলো খুঁজে দেখতে গেলে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় সেটা হচ্ছে নিকট অতীতে হামাস-ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাত, যেখানে প্রায় আড়াই বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে ইসরায়েল হামাসের সাথে যুদ্ধ করে গাজাকে এক অর্থে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার পরও হামাসের অনমনীয় মনোবল।
এর নেপথ্যের শক্তি ইরান, যারা বছরের পর বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে হামাস, হুতি এবং হিজবুল্লাহর মতো সংগঠনগুলোকে সহায়তা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের বিপক্ষে একটি শক্ত প্রতিরোধ করতে চেয়েছে। আর এসবই হয়েছে খামেনির প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায়।
এখানে ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে তিনটি বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিকল্প হিসেবে কাজ করছে—
প্রথমত, খামেনি এবং ইরানের বিজ্ঞানী এবং শীর্ষস্থানীয় কমান্ডারদের হত্যা করা;
দ্বিতীয়ত, এটির সাথে ইরানের শাসন ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানো;
তৃতীয়ত, এই দুটির যেকোনো একটি অর্জন করা।
১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামী বিপ্লবোত্তর ৪৭ বছরের মধ্যে প্রায় ৩৭ বছর পর্যন্ত এই আয়াতুল্লাহ খামেনিই ইরানের বিপ্লবী সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং দেশটির শাসন কাঠামোর সবচেয়ে বড় প্রতীকে পরিণত হন।
ধারণা করা হচ্ছে যে, খামেনির মৃত্যু পরবর্তী ইরান তার বিপ্লবী আদর্শকে খামেনির মতো করে ধরে রাখতে সচেষ্ট হবে না। ২০২৫ সালের জুন মাসের হামলাতে ইরানের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিজ্ঞানী এবং কমান্ডার নিহত হওয়ার পর এবারের হামলায় সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাসহ আরও যে গুরুত্বপূর্ণ নেতারা প্রাণ হারালেন, বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে ইরান কি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ শক্তির কাছে একটি অসম শক্তি হয়ে পাল্টা হামলা চালিয়ে যুদ্ধের ময়দানে অবস্থান করবে, নাকি কোনোভাবে আপস-রফার মধ্য দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাইবে, সেটা নির্ভর করছে অনেকগুলো বিষয়ের ওপর।
পরিস্থিতি বলছে, এমন অবস্থায় ইরানের পক্ষে খুব বেশি সময় যুদ্ধের ময়দানে টিকে থাকা সম্ভব নয়। ইসরায়েল যেমন তাদের যেকোনো প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে পায় এবং আজকের এই অবস্থায় নিজেকে একটি অদম্য শক্তিতে পরিণত করতে পেরেছে, ইরানের সাথে রাশিয়া এবং চীনের কৌশলগত সম্পর্কের পরও তাদের নিষ্ক্রিয়তা কিংবা কেবলমাত্র আনুষ্ঠানিক বিবৃতি ছাড়া প্রত্যক্ষ কোন ভূমিকা না রাখা আসলে ইরানকে অনেকটা অসহায় করে ফেলেছে।
এই হামলার সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য ইসরায়েলের স্বার্থে রক্ষা হলেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে, বিশেষ করে সৌদি আরব, কাতার এবং আরব আমিরাতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সুসম্পর্কের ফলে এই দেশগুলোর জন্যও ইরানকে একটি পরোক্ষ হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে আসছিল।
এখানে আরও উল্লেখ করতে হয় যে, বহির্বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ৮০টি সামরিক ঘাঁটির মধ্যে ১৯টির অবস্থান এই মধ্যপ্রাচ্যে। ফলে অনেকগুলো অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় এখানে কাজ করেছে।
ইরানের প্রধান লক্ষ্য ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র, সেইদিক দিয়ে তাদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনকারী দেশগুলোর সাথে তারা এ পর্যন্ত কোনো সুসম্পর্ক স্থাপন করতে পারেনি।
ওআইসি বা আরব লীগ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফিলিস্তিন ইস্যু নিয়ে ইরানের চিন্তাভাবনার সাথে সহমত পোষণ করতে পারেনি, উপরন্তু তাদের কাছেও ইরানকেই মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির পথে একমাত্র বাধা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছিল।
ট্রাম্পের আগের মেয়াদে দেশগুলো আব্রাহাম চুক্তিতে স্বাক্ষর করে ইসরায়েলের সাথে সুসম্পর্ক করতে সম্মত হয়েছিল। এর সাথে রয়েছে এইসব আরব দেশগুলোর একনায়কতান্ত্রিক শাসনকাঠামো টিকিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের মেজাজ অনুযায়ী চলা। এ সবকিছুই ইরানের দুর্ভাগ্যের জন্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।
প্রশ্ন হচ্ছে ইরান এখন কী করবে? খামেনির মৃত্যু পরবর্তী সময়ে ইরান রাষ্ট্রটিকে পরিচালনার জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে, যে কাউন্সিল খুব শিগগির বিকল্প নেতৃত্ব ঠিক করবে।
এরই মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ইরানের বিকল্প নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় বসতে চাইছে এবং তিনিও এমন চাওয়াকে স্বাগত জানাবেন বলে জানিয়েছেন।
অনেকেই ধারণা করছেন যে, খামেনির মৃত্যুর জের ধরে একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের সূচনা ঘটতে যাচ্ছে। পরিস্থিতি যদি সেদিকেই যায়, তাহলে ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে এতদিন ধরে দানা বেঁধে থাকা সরকারবিরোধী বিক্ষোভ তীব্রতর হতে পারে, তারা এর জন্য সরকারের বর্তমান কাঠামোকে দায়ী করতে পারে।
কী হবে এই আলোচনার বিষয়বস্তু, এমন কৌতূহলের একমাত্র জবাব হচ্ছে ইরানের শাসনকাঠামোকে যদি টিকে থাকতে হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া অনুযায়ী তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ কর্মসূচি পরিত্যাগ করতে হবে এবং একই সাথে ইসরায়েলের দাবি অনুযায়ী তাদের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও পরিত্যাগ করতে হবে। হতে পারে ইরানকে ব্যাপকভাবে নিরস্ত্রীকরণের জন্যও চাপ দেওয়া হতে পারে।
অনেকেই ধারণা করছেন যে, খামেনির মৃত্যুর জের ধরে একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের সূচনা ঘটতে যাচ্ছে। পরিস্থিতি যদি সেদিকেই যায়, তাহলে ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে এতদিন ধরে দানা বেঁধে থাকা সরকারবিরোধী বিক্ষোভ তীব্রতর হতে পারে, তারা এর জন্য সরকারের বর্তমান কাঠামোকে দায়ী করতে পারে।
বিষয়টি নিশ্চয়ই এড়িয়ে যেতে চাইবে না বর্তমান নেতৃত্ব। এর সাথে রয়েছে দেশটির পশ্চিমে কুর্দি অধ্যুষিত, পাকিস্তান সীমান্তের কাছে সুন্নি অধ্যুষিত এবং ইরানের ভেতরে দীর্ঘ সময় ধরে ঘাপটি মেরে বসে থাকা পিপলস মোজাহেদিন অর্গানাইজেশন (পিএমওআই)-এর মতো আরও ক্ষুদ্র কিছু গোষ্ঠীর নতুন করে সংঘাতে জড়িয়ে যাওয়ার মতো সম্ভাবনা, যা সরকারকে দেশের ভেতরে আরও বেকায়দায় ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক আইন এবং নিয়ম কানুন উপেক্ষা করে পরিচালিত একটি হামলার প্রভাব যদি সুদূরপ্রসারীও হয়, দুঃখজনক হলেও সত্য, এর জন্য দায়ী রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রদ্বয়ের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ার বর্তমান বৈশ্বিক কাঠামোর ভেতর নেই।
জাতিসংঘ সনদের ২(৪), যেখানে ইরানের মতো একটি দেশের আভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব এবং রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ ঘটেছে, এর বিপরীতে আন্তর্জাতিক আইন বেশ অসহায়, যার সাম্প্রতিক নমুনা আমরা দেখেছি ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে এবং অতীতে ইরাক, আফগানিস্তানসহ আরও অনেক ক্ষেত্রে।
ড. ফরিদুল আলম : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়