প্রত্যাশার অভিবাসন : নির্বাচিত সরকারের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়ন

বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মী বা অভিবাসী শ্রমিককে যতই রেমিট্যান্স যোদ্ধা আর দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি বলা হোক না কেন, সামাজিক স্তর বিন্যাসে, নীতি নির্ধারণে এবং সংস্কারমুখী কার্যকরী পদক্ষেপে প্রবাসের এই খেটে খাওয়া নারী-পুরুষ যথাযথ গুরুত্ব পায় না।
শ্রম অভিবাসন খাতে আন্তঃমন্ত্রণালয় দায়িত্ব আছে, কিন্তু কার্যত দেখা যায় সিংহভাগ দায়িত্ব প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওপরেই ছেড়ে রাখা হয়েছে। আবার রাজস্ব বাজেটে এই মন্ত্রণালয়ের জন্য অর্থ বরাদ্দ যুগ যুগ ধরে অন্য মন্ত্রণালয়ের চেয়ে অনেক কম, সেই বরাদ্দও আবার সার্বিক ব্যয় হয় না।
যুগোপযোগী আইন ও নীতি কাঠামো আছে, কিন্তু তার বাস্তবায়ন খুব ধীর ও ক্ষীণ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এসবের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে বেশকিছু সংস্কার প্রস্তাব এই সময়ে একত্রে সন্নিবেশিত হয়েছে এবং প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সেই প্রসঙ্গে করণীয় সম্পর্কে পরে বলছি।
মোদ্দা কথা হলো, শ্রম অভিবাসন খাতকে নিয়মতান্ত্রিক, আধুনিক, কার্যকরী, অধিকারভিত্তিক এবং অংশগ্রহণ/অংশীদার মূলক করতে কী করতে হবে, সরকারের ভেতরে ও বাইরে অনেকেই জানেন, কিন্তু হয়ে উঠছে না। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার গঠনের সাথে সাথেই বিগত সময়ের মতো আবারও এই খাতের উন্নয়নের জন্য অনেকেই আশায় বুক বাঁধছি। শুধু কথায় নয়, কাজেই তার প্রমাণ মিলবে।
আশার কথা যে নতুন সরকার তাদের রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে শ্রম অভিবাসন খাতে করণীয় নিয়ে বেশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইশতেহারের ২৪ ও ২৫ পৃষ্ঠায় ১৯টি পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা আছে। ইশতেহারের পররাষ্ট্র নীতি ও শিক্ষা খাতসহ আরও কিছু খাত রয়েছে, যা শ্রম অভিবাসন সংস্কার ও অগ্রগতির সাথে সম্পর্কিত।
এভাবে বিস্তারিতভাবে নির্বাচনী ইশতেহারে শ্রম অভিবাসন সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি এবং প্রতিশ্রুতিদাতা রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে—এই ঘটনা বাংলাদেশে বিরল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবের অংশ হিসেবে শ্রম অভিবাসন খাতে সর্বজন প্রস্তাবিত এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গৃহীত সংস্কার প্রস্তাব—এই ঘটনাও বাংলাদেশে বিরল। সেই সংস্কার সুপারিশ নিয়েও সরকার কাজ করতে পারে। কাজেই বর্তমান সময়ে রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শ্রম অভিবাসন খাতে দীর্ঘদিনের প্রয়োজনীয়তা পূরণের একটি বড় প্রত্যাশা ও সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শ্রম অভিবাসন খাতে সংস্কার সাধন, সমস্যার সমাধান ও জটিলতা নিরসনের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবসম্মত কার্যপ্রণালী থাকা দরকার। সংশ্লিষ্টদের কাছে অধিকাংশ করণীয় সম্পর্কে ধারণা অনেক বছর ধরে বিদ্যমান, তবে কী প্রক্রিয়ায় সফল হওয়া যাবে, সে ব্যাপারে মত ও পথের পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক।
অবশ্য অনেক সংস্কার আছে যা অন্য দেশে কার্যকরী ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত, কাজেই বাংলাদেশে কার্যকরী হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। এ ব্যাপারে সরকারের রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে কী করতে হবে সেটি বলা আছে, কীভাবে করতে হবে সেটি অন্যান্য বিষয়ের মতোই ব্যাখ্যা করা নেই। সেই বাস্তবমুখী পদক্ষেপ ও পরিকল্পনার দায়িত্ব স্বাভাবিকভাবেই পড়বে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট অনুবিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নও করবে সরকার।
যখন সেই বাস্তবায়ন সময়োচিত হবে এবং সরাসরি তার সুফল দৃশ্যমান/অনুভূত হবে, তখন রাজনৈতিক সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশে সরকারের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি পাবে। আবার জটিল সমস্যার সরলীকরণ এবং সরল সমাধানমূলক বক্তব্য কার্যকরী পরিবর্তনের প্রতি আস্থা হ্রাস করাটা স্বাভাবিক।
সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নবনিযুক্ত মাননীয় প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের সাথে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে মতবিনিময় করেছেন। অতীতে এই মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিরা বেশিরভাগ সময় সাংবাদিকদের এড়িয়ে গেছেন। এখন যদি সাংবাদিক বান্ধব হতে পারেন, তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পাশাপাশি বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতাও বাড়বে।
তবে প্রতিমন্ত্রী আগামী তিন মাসের মধ্যে যে দুই–একটি বন্ধ শ্রমবাজার চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন, কয়েকটি দেশের ক্ষেত্রে অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করে তা কার্যকর করার প্রস্তুতির কথা বলেছেন এবং প্রতারণায় জড়িত রিক্রুটিং এজেন্সির নিবন্ধন স্থগিত করার কথা বলেছেন—এই তিনটির প্রত্যেকটি জটিল এবং কোনোটিই তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে সমাধানযোগ্য নয়।
অভিবাসন ব্যয়ের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, সততা ও তদারকির অভাবে অনেক বছর ধরেই বাংলাদেশের অভিবাসন ব্যয় বিশ্বে সর্বাধিক। যুক্তিসঙ্গত ব্যয় সরকারিভাবে নির্ধারণ করলেই হবে না, তা নিশ্চিত করতে হলে দেশে গ্রাম থেকে প্রবাসের কর্মস্থল পর্যন্ত ধাপে ধাপে অবৈধ অর্থ প্রদানের পথ বন্ধ করতে হবে...
তিনটি বিষয়ই জরুরি এ কথা ঠিক, তবে দীর্ঘদিনের চলমান সমস্যা হিসেবে বহুমুখী তৎপরতা দরকার, যার ফলাফল আসতে পারে ধীরে। তিনটি বিষয়কে বিস্তারিত বললে স্পষ্ট হতে পারে।
যে শ্রমবাজারগুলো বন্ধ, তা দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। সেসব দেশের সাথে শ্রম অভিবাসন সংক্রান্ত কোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নেই। কোনো কোনো দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক আছে কিন্তু সেগুলো অনেক পুরোনো। কোনো কোনো দেশে ব্যক্তি ও রিক্রুটমেন্ট ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে অভিবাসন প্রক্রিয়া সীমিত আকারে চলে অনেকটা অটো পাইলটের মতো।
সরকারি অনুমোদনে এইসব অভিবাসন হলেও, চুক্তি না থাকার কারণে সরকারি নজরদারি ও জবাবদিহিতা শিথিল। আবার চুক্তি বা নজরদারি না থাকলেও এইসব দেশের জন্য অভিবাসন ব্যয় থেকে শুরু করে যেকোনো অনিয়মের জন্য রিক্রুটিং এজেন্ট বা তাদের স্থানীয় প্রতিনিধিদের ওপর পুরো দোষ চাপিয়ে দেওয়া সহজ হলেও এটি আংশিকভাবে সরকারের দায় এড়ানো।
সরকার বলতে এখানে শুধু একটি মন্ত্রণালয় নয়, সার্বিকভাবে বোঝানো হয়েছে—যেখানে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা একটি বড় সমস্যা।
নির্দিষ্ট বন্ধ শ্রম বাজার খুলতে হলে সেইসব দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও চুক্তির খসড়া প্রস্তুত একটি পর্যায়, দুই দেশের সরকার এবং রিক্রুটিং এজেন্সিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সেই খসড়া চুক্তি নিয়ে অভিবাসীদের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন অংশীজনদের সাথে পরামর্শ একটি পর্যায়, চুক্তি বাস্তবায়ন ও তদারকির প্রক্রিয়া নির্ধারণ এবং অভিবাসন কূটনীতি প্রশিক্ষিত যথাযথ কর্মকর্তা নিয়োগ/বৃদ্ধি আরেকটি পর্যায়। এই পদক্ষেপগুলো স্বল্পমেয়াদি নয়, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য এবং তা করাও দরকার। এজন্য আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় অতীব জরুরি।
অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণও অনেক দিনের জটিল সমস্যা। অতীতে সরকার যে অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করেছে, তা বাস্তবসম্মত ছিল না। আবার অভিবাসন ব্যয়ের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, সততা ও তদারকির অভাবে অনেক বছর ধরেই বাংলাদেশের অভিবাসন ব্যয় বিশ্বে সর্বাধিক। যুক্তিসঙ্গত ব্যয় সরকারিভাবে নির্ধারণ করলেই হবে না, তা নিশ্চিত করতে হলে দেশে গ্রাম থেকে প্রবাসের কর্মস্থল পর্যন্ত ধাপে ধাপে অবৈধ অর্থ প্রদানের পথ বন্ধ করতে হবে, সব খরচের সত্যিকার রশিদ প্রদর্শন, অভিবাসন অনুমোদনের পূর্বশর্ত হতে হবে।
কোনো কোনো দেশে নিয়োগকর্তা অভিবাসন ব্যয় বহন করেন এবং যুক্তিসঙ্গতভাবে মাসিক বা কিস্তিতে অভিবাসীর খরচের অংশ কেটে রাখেন। সেই ধরনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হলেও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি এবং রিক্রুটিং এজেন্সিদের সাথে নিয়োগকর্তার চুক্তিতে স্বচ্ছতা আনতে হবে এবং আনা সম্ভব। তবে সময় সাপেক্ষ।
একইভাবে, প্রতারণায় জড়িত রিক্রুটিং এজেন্সির নিবন্ধন স্থগিত করার মধ্য দিয়ে ন্যায়সঙ্গত অভিবাসন সহজে এবং দ্রুত নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। প্রথমত তদন্ত করা দরকার বিগত দুই সরকারের আমল মিলিয়ে যে কয়েক হাজার রিক্রুটিং এজেন্সির সরকারি নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে, তা সৎভাবে অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্নকারী রিক্রুটিং এজেন্সিদেরকেই দেওয়া হয়েছে কি না।
আরও পড়ুন
নিবন্ধন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হলে প্রতারক রিক্রুটিং এজেন্সি নিবন্ধনই না পাওয়ার কথা। আর যদি নিবন্ধন কারও কারও ক্ষেত্রে স্থগিত করাও হয়, নিশ্চিত করতে হবে যে অনিয়মিত অভিবাসন হ্রাস পাবে। কিন্তু রিক্রুটিং এজেন্সির নিবন্ধন স্থগিত এমনকি বাতিল করলেও গ্রাম পর্যায়ের এবং প্রবাসের সাব এজেন্ট বা দালালের অনিয়ম, দুই দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য দুর্নীতি থেমে যাবে না।
অনিয়মের চাকা বিভিন্ন শক্তি সচল রাখতে তৎপর হওয়াতে এই খাতে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে গেছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন, বিভাগীয় তদন্ত, গবেষণা ও সুপারিশ—বিগত দুই সরকারের আমলেই অনেক হয়েছে। তাই শুধু রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ যুক্তিসঙ্গত হলেও, তা দিয়ে নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসন নিশ্চিত হবে না। প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন বা সিস্টেমিক চেঞ্জ ধাপে ধাপে কয়েক বছরে সম্ভব—তিন বা ছয় মাসে নয়।
এ কথা যুক্তিসঙ্গত যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ছয় মাসের মধ্যে তার মন্ত্রী পরিষদের পারফরম্যান্সের অগ্রগতি দেখতে চান। গণমাধ্যমেই প্রকাশিত এই প্রত্যাশা। কয়েক মাসে শ্রম অভিবাসন খাতেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আগামী পাঁচ বছরের সম্ভাব্য অগ্রগতির ব্যাপারে আশান্বিত করবে। যে তিনটি বিষয়ে অগ্রাধিকার সম্প্রতি দেয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কয়েক মাসে ফল প্রাপ্তির আশা ক্ষীণ। অন্যদিকে আরও অনেক কিছুই আছে যা তিন থেকে ছয় মাসে সম্ভব এবং শ্রম অভিবাসন খাতে সরকারের সংস্কার অগ্রগতির প্রতি আস্থা বৃদ্ধি করবে।
প্রথমেই বলা যেতে পারে এখনই ধাপে ধাপে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কাজ শুরু করা উচিত। প্রধানমন্ত্রীকে সাধুবাদ যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জন্য সমন্বিত দায়িত্ব একজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর হাতে অর্পণ করেছেন। দুটি মন্ত্রণালয়ের টার্গেট জনগোষ্ঠী অনেকটাই পৃথক হলেও কর্মক্ষেত্রে কিছু সামঞ্জস্য ও সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা আছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে কমিশনের প্রস্তাবিত শ্রমিকের সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ বিষয়ক অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ, সেই সাথে ওই অধিদপ্তরে অভিবাসী শ্রমিকের সামাজিক সুরক্ষা বিষয়ক ইউনিট/সেল প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ গ্রহণের সুপারিশ আছে। ফেরত আসা অভিবাসী কর্মীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা এই সেল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুগম হবে, কাজেই এ ব্যাপারে তৎপরতা দ্রুত শুরু হতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শ্রম সংস্কার কমিশন ও নারী কমিশনের প্রতিবেদন, খণ্ডকালীন সময়ের জন্য গঠিত শ্রম অভিবাসন টাস্ক ফোর্সের প্রতিবেদন এবং বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে শ্রম অভিবাসন সংক্রান্ত অঙ্গিকার—চারটি প্রতিবেদন/দলিলে এই খাতের যাবতীয় প্রধান সংস্কার বিধৃত আছে। তার যদি পঞ্চাশ ভাগও পাঁচ বছরে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে পঁচিশ বছরের মধ্যে শ্রম অভিবাসন খাতে সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি সাধিত হয়েছে বলে দাবি করা যাবে বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
দ্বিতীয়ত শ্রম অভিবাসী অধ্যুষিত সুনির্দিষ্ট দেশের বাংলাদেশ মিশনে আইন সহায়তা এবং দ্রুত বিভিন্ন সেবা প্রদান বহু বছরের দাবি এবং সবসময় এজন্য লোকবল সঙ্কটের কথা বলা হয়ে আসছে। আশার কথা যে এবারের নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে বিদেশি মিশন থেকে অভিবাসী কর্মীদের আইনগত ও অন্যান্য সেবাদানের জন্য লোকবল বৃদ্ধি এবং সেল গঠনের অঙ্গিকার করা হয়েছে (পৃষ্ঠা ২৪)।
শ্রম বাজার সম্প্রসারণের জন্য একটি মার্কেট রিসার্চ ইন্সটিটিউট গঠনেরও প্রতিশ্রুতি আছে (পৃষ্ঠা ২৪)। এইসব ব্যাপারে আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জন প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাথে আশু আলোচনা শুরু করলে কয়েক মাসে কার্যকরী প্রাথমিক পদক্ষেপ দৃশ্যমান হবে এবং সরকার প্রশংসিত হবে।
তৃতীয় যে পদক্ষেপ আশু শুরু করা যায় তা হলো, নির্বাচনী ইশতেহারে প্রস্তাবিত প্রবাসী কল্যাণ ফাউন্ডেশন, ওয়ান স্টপ প্রবাসী সাপোর্ট সেন্টার এবং প্রবাসী কার্ড চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ। যেমনটি বলা আছে, এসবের মাধ্যমে চাকরির শর্ত ও তথ্য, বিভিন্ন পেমেন্ট, রেমিট্যান্স পাঠানো, সামাজিক সুরক্ষা প্রাপ্তি সহজ হবে।
এইসবের প্রস্তুতি পর্ব প্রথম ছয় মাসে সম্ভব এবং পরীক্ষামূলকভাবে আংশিক চালু করা গেলে প্রবাসে কর্মরত এবং ফেরত আসা কর্মীরা সরকারের প্রতি আস্থাশীল হয়ে উঠবে। এই আস্থা দীর্ঘদিনের সেবা-দৈন্যতার কারণে কমতে কমতে তলানিতে এসে ঠেকেছে। বিদেশ মিশনে এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অভিবাসী-বান্ধব সেবার পরিধি এবং মান বৃদ্ধি শুরু হলে সবার আগে অভিবাসী কর্মীরা তার সুফল ভোগ করবেন এবং সরকারের প্রতি আস্থা রাখা শুরু করবেন।
চতুর্থ যে পদক্ষেপ নীতি নির্ধারণ, বাস্তবায়নকে ও তদারকি বেগবান করার মাধ্যমে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা শক্তিশালী করতে পারে তা হচ্ছে, শ্রম অভিবাসন জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি এবং জাতীয় শ্রম অভিবাসন ফোরাম পুনর্গঠন এবং নিয়মিতভাবে সক্রিয়করণ। দীর্ঘদিন এই কমিটি/ফোরাম নিষ্ক্রিয় এবং এ ব্যাপারে করণীয় প্রস্তাব সম্পর্কে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ওয়াকিবহাল।
অভিবাসন সংক্রান্ত একাধিক আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটিও নিষ্ক্রিয়, যার নেতিবাচক প্রভাব কেন্দ্র থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে বিদ্যমান। এইসব কমিটিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং দপ্তরের সরকারি প্রতিনিধি ছাড়াও ক্ষেত্র বিশেষে অভিবাসী সংগঠন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি সম্পৃক্ত করার যুক্তিসঙ্গত প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কাছে আছে এবং চার থেকে পাঁচ মাসে এগুলো পুনর্গঠন করে সচল এবং কার্যকরী করা সম্ভব।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শ্রম সংস্কার কমিশন ও নারী কমিশনের প্রতিবেদন, খণ্ডকালীন সময়ের জন্য গঠিত শ্রম অভিবাসন টাস্ক ফোর্সের প্রতিবেদন এবং বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে শ্রম অভিবাসন সংক্রান্ত অঙ্গিকার—চারটি প্রতিবেদন/দলিলে এই খাতের যাবতীয় প্রধান সংস্কার বিধৃত আছে। তার যদি পঞ্চাশ ভাগও পাঁচ বছরে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে পঁচিশ বছরের মধ্যে শ্রম অভিবাসন খাতে সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি সাধিত হয়েছে বলে দাবি করা যাবে বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
অভিবাসন খাতে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ সরকারের ভেতরে-বাইরে সর্বত্র আছেন। সঙ্কট এবং সমাধান নিয়ে তাদের স্পষ্ট ধারণা আছে। রাজনৈতিক নেতা তথা মন্ত্রী এবং সরকারি কর্মকর্তারা সবসময় এইসব মানুষদের কাছে পাবেন। যেমন চলছে চলুক বা বিজনেস অ্যাজ ইউসুয়াল থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে শ্রম অভিবাসন খাতে যুগান্তকারী পরিবর্তনের ছাপ বর্তমান সরকার রেখে যেতে পারবে এবং বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসীরা চির কৃতজ্ঞ থাকবে।
আসিফ মুনীর : অভিবাসন বিশেষজ্ঞ