নারী দিবস পালন জরুরি, কাঠামোগত পরিবর্তন তারচেয়ে বেশি জরুরি, কেন?

বিশ্বজুড়ে ৮ মার্চ ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ পালিত হয়। মূলত নারীর অধিকার আদায়ের লড়াইকে স্বীকৃতি দিতে এবং সচেতনতা তৈরি করতে এই দিনটি নির্ধারণ করা হয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতা ও কাজের ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে নারী কতটা ভালো থাকতে পারে, এমন একটি পরিকল্পনা করা হয়। সেইভাবে নির্বাচিত করা হয় দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয়।
তবে এর মানে এই না যে, বছরের বাকি দিন নারীর নয়, বাকি দিনগুলোও নারীর। প্রতিদিনকার জীবনে নারীর ভূমিকা কতখানি এটা বোঝার জন্য শুধু আমাদের মা বা স্ত্রীর, এককথায় বলা ভালো, বাসার গৃহিণীর দৈনন্দিন কাজগুলো নিয়ে ভাবলেই বুঝতে পারবো বাকি দিনগুলোও কীভাবে নারীর।
তাই সারা বছরের কর্মব্যস্ত দিনের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট দিন রাখা হয়, যেন আমরা পেছন ফিরে তাকিয়ে পরিবারে, সমাজে ও দেশে নারীর অবদানকে স্মরণ করতে পারি।
অনেকেই মনে করি নারীর জন্য বিশেষ একটা দিন কেন পালন করা হয়? বলা যায় ৮ মার্চ হলো একটি ‘রিমাইন্ডার’ বা মনে করিয়ে দেওয়ার দিন। কিন্তু লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সমাজ গড়া, যেখানে আলাদা করে কোনো দিবসের প্রয়োজন পড়বে না। প্রতিটি দিনই হবে নারী-পুরুষ সবার জন্য সমান।
একজন গৃহিণী সকাল থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত ৩৬৫ দিনই তার পরিবারের জন্য কাজ করেন। সন্তান জন্মের পর থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত তার সার্বিক দেখাশোনা, খাওয়ানো, পড়াশোনা, সেবা-যত্ন ও নিরাপত্তা রক্ষার দিকটি মূলত মা দেখেন। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের রোগে-শোকে মা/গৃহিণীই পাশে থাকেন।
অনেকের ধারণা শুধু গৃহিণী যারা, তারা সংসার করা ছাড়া আর কিছু করেন না, স্বামীর আয়ে বসে খান। এই ধারণা তৈরি করেছে এই পিতৃতান্ত্রিক সমাজ, আর সেই ধারণার ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র নারীকে কোণঠাসা করেছে। আর তাই অর্থনীতিতে নারীর অবদান এখনো যথার্থ দৃষ্টি পাচ্ছে না।
নারী তার সময়ের একটা বড় অংশ বাজারকেন্দ্রিক কাজের চেয়ে বাজারবহির্ভূত কাজে ব্যস্ত থাকেন। বিনামূল্যের গৃহস্থালি কাজগুলোই অ-অর্থনৈতিক কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নারী তার সময়ের একটা বড় অংশ বাজারকেন্দ্রিক কাজের চেয়ে বাজারবহির্ভূত কাজে ব্যস্ত থাকেন। বিনামূল্যের গৃহস্থালি কাজগুলোই অ-অর্থনৈতিক কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই অস্বীকৃত এবং অদৃশ্য কাজগুলো শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রান্না, শিশুযত্ন, বয়স্ক মানুষের যত্ন নয়, এর সাথে আছে কৃষিকাজ, গবাদিপশুর দেখাশোনা ও বীজ সংরক্ষণ।
নারীরা বাইরে এসে কাজ করছেন। কিন্তু তাই বলে কি সংসারের কাজ কমেছে তাদের? বরং দুটি দায়িত্বই তাদের বহন করতে হচ্ছে সমানতালে। এই সংসার চালাচ্ছেন যিনি, তারা মধ্যে খুব সামান্য সংখ্যক নারী নিজের মতো করে, নিজের ইচ্ছায় চলতে ও কথা বলতে পারেন।
শরীর চালনার মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি তারা গ্রহণ করতে পারছেন কিনা, এটাও অগোচরে থেকে যায়। আমরা কি জানি যে দেশের ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী ১ কোটি ৭০ লাখ নারী অপুষ্টির শিকার। তাদের একটি অংশ রীতিমতো অপুষ্ট এবং ওজন প্রয়োজনের তুলনায় কম। (আইসিডিডিআরবি)।
সেই কারণেই একটি দিবস নির্ধারণ করা হয়েছে, যেদিন সমাজে বিদ্যমান বৈষম্যগুলো নিয়ে জোরালোভাবে কথা বলতে হবে। অবশ্য নারীর সম্মান, অধিকার এবং নিরাপত্তার বিষয়টি কোনো নির্দিষ্ট দিনের জন্য সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। নারী দিবস পালন করা সার্থক হবে তখনই, যখন এই দিবসের চেতনাকে আমরা প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত করতে পারবো।
আরও পড়ুন
একদিন ফুল দেওয়া, বেগুনি শাড়ি পরে মিছিল করা বা সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভালো বিজ্ঞাপন বানিয়ে উইশ করার চেয়ে, প্রতিদিন পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে, সমাজে ও রাজনীতিতে নারীর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তাকে একজন মানুষ হিসেবে যথাযথ সম্মান দেওয়া বেশি জরুরি।
শুধু মুখে বলা নয়, ঘরের কাজে সমবণ্টন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর ভূমিকাকে স্বীকার করতে হবে। অর্থনীতিবিদরা দেখিয়েছেন দেশে ৪৩ শতাংশের বেশি নারী পুরোপুরিভাবে গৃহস্থালি কাজের সাথে যুক্ত, অথচ পুরুষের সংখ্যা ১ শতাংশেরও কম। দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনে (জিডিপি) নারীর অবদান ২০ শতাংশ। তবে নারীর এই গৃহস্থালি কাজকে জাতীয় আয় পরিমাপের পদ্ধতিতে (এসএনএ) যোগ করা গেলে জিডিপিতে নারীর অবদান দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশ।
পরিবারে সার্বিক দায়িত্বপালন, শিশুর যত্ন, বয়স্ক মানুষের যত্ন, সন্তানের পড়াশোনা ইত্যাদি বিষয়ে বিচার বিশ্লেষণকে সুচারু করতে পারলে জিডিপিতে নারীর অ-অর্থনৈতিক কাজগুলো মূল্যায়িত হবে।
এখন বৈশ্বিক এজেন্ডা হচ্ছে, এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যার মাধ্যমে নীতি বা পদ্ধতির পরিবর্তন ঘটিয়ে নারীর অর্থনৈতিক কাজকে উৎসাহিত করা যায়। সেইসাথে এমন সুযোগ সৃষ্টি করা যেন নারী পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাজে যোগ দিয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন।
নারীর কর্মঘণ্টার বৈজ্ঞানিক হিসাব করতে পারলে পরিবারে ও সমাজে নারীর অবস্থান অধস্তন থাকবে না। এজন্য অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যেন গৃহস্থালি কাজে এবং সেবামূলক কাজে নারীর দায়িত্ব সহজ করা যায়।
পাশাপাশি নারীর জন্য বিকল্প সুবিধাদির ব্যবস্থা করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, সমান বেতন এবং সুযোগ-সুবিধাসহ উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একদিন ফুল দেওয়া, বেগুনি শাড়ি পরে মিছিল করা বা সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভালো বিজ্ঞাপন বানিয়ে উইশ করার চেয়ে, প্রতিদিন পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে, সমাজে ও রাজনীতিতে নারীর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তাকে একজন মানুষ হিসেবে যথাযথ সম্মান দেওয়া বেশি জরুরি।
আমরা চাই নারী যেন তার গৃহস্থালি ও সেবামূলক কাজের জন্য সম্মানিত হন, প্রতিদিন। সংসারের সব কাজ করেও, তাকে যেন মাথা নত করে থাকতে না হয়। কোনো সন্তান যেন মনে না করে তার মা কিছু করে না। স্বামীসহ সংসারের আর কোনো সদস্য যেন বলতে না পারে ‘তুমি সারাদিন করো কী?’
একজন মানুষের বিশেষ করে অধস্তন অবস্থানে থাকা নারীর স্বপ্ন পূরণের সুযোগ প্রতিদিন থাকা উচিত। লোক দেখানো সংস্কৃতির অংশ হিসেবে আমাদের দেশে অনেক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি নারী দিবস পালন করে। একদিনের জন্য নারীকে মঞ্চে বসিয়ে সম্মান জানানো সহজ, কিন্তু সারা বছর ধরে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো বা কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করাটা কঠিন। তাই এই একদিনের আয়োজন যখন বছরব্যাপী পালিত হবে নানাভাবে, সেদিনই নারীর মুক্তি মিলবে।
বাংলাদেশের আইনে নারীর অনেক অধিকার থাকলেও পারিবারিক ও সামাজিকভাবে তার প্রয়োগ খুব সীমিত। ঘরে বা বাইরে নারীর মতামতকে এখনো অনেক ক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্তরের মনে করা হয়। এই যে মানসিকতার দেয়াল, এটা একদিনের অনুষ্ঠানে ভাঙা সম্ভব নয়, চাই সবখানে প্রতিদিনের চর্চা।
একজন সাধারণ নারী যখন পরিবারে, গণপরিবহনে, বাজারে, পার্কে, অনুষ্ঠান স্থলে ও কর্মক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হন, তখন ৮ মার্চ নারী দিবসের অনুষ্ঠান তার কাছে প্রহসন মনে হয়। তাই দিবস পালনের চেয়ে কাঠামোগত পরিবর্তন বেশি জরুরি।
নারীকে শুধু মা, বোন, স্ত্রী বা প্রেমিকা হিসেবে নয়, একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে সম্মান করার চর্চাটা শৈশব থেকেই পরিবারে শুরু হওয়া দরকার।
শাহানা হুদা রঞ্জনা : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ