শহুরে খাবারে লুকানো বিষ, বাড়ছে ডায়াবেটিস-হৃদরোগ ঝুঁকি

আধুনিক নগরজীবনে আমাদের খাদ্যাভ্যাস এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে, যা আমাদের অজান্তেই এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বর্তমানে শহরে আমরা যা খাচ্ছি, তা কেবল আমাদের ক্ষুধা নিবারণ করছে না, বরং শরীরে এমন সব বিষক্রিয়া ঘটাচ্ছে যা তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান নয়।
বিজ্ঞাপন
সাধারণত আমরা খাবারজনিত অসুস্থতা বলতে পচা বা বাসি খাবার খেয়ে পেট খারাপ হওয়াকে বুঝি, কিন্তু সমসাময়িক নগর জীবনের প্রকৃত বিপদ হলো খাবারের ভেতরে থাকা ‘অদৃশ্য’ রাসায়নিক দূষণ। এই রাসায়নিক দূষণ এখন সরাসরি অসংক্রামক ব্যাধি বা এনসিডি (NCDs)-এর সাথে যুক্ত হচ্ছে, যা মূলত হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং কিডনি জটিলতার মতো দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (২০২৫)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এই দীর্ঘস্থায়ী রোগগুলো এখন বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং শহুরে খাদ্য সরবরাহে বিদ্যমান বিষাক্ত রাসায়নিকগুলো এই সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলছে।
ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোয় ভারী ধাতুর বিষক্রিয়া বর্তমানে অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কলকারখানা বা পুরোনো পাইপলাইন থেকে সিসা, পারদ এবং আর্সেনিকের মতো ক্ষতিকর ধাতুগুলো প্রায়শই মাটি এবং পানিতে মিশে যাচ্ছে, যা শাকসবজি চাষে ব্যবহৃত হচ্ছে। যখন আমরা এই দূষিত পরিবেশে উৎপাদিত শাকসবজি গ্রহণ করি, তখন এই ভারী ধাতুগুলো আমাদের শরীরে দীর্ঘ সময় ধরে জমতে থাকে। শেঠি (২০২৪)-এর গবেষণায় দেখা গেছে যে, অতি সামান্য পরিমাণে এই টক্সিন বা বিষাক্ত উপাদান গ্রহণ করলেও তা আমাদের কিডনির ক্ষতি করতে পারে এবং রক্তচাপ বাড়িয়ে দিতে পারে। এটি একটি ‘ধীরগতির’ স্বাস্থ্য সংকট তৈরি করছে, যেখানে মানুষ উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছে কেবল অতিরিক্ত লবণ বা চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার কারণে নয়, বরং তাদের প্রতিদিনের খাবারে লুকিয়ে থাকা এই অদৃশ্য দূষণের কারণে।
শহুরে খাবারের এই সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো কীটনাশকের অত্যধিক ব্যবহার। লাখ লাখ নগরবাসীর খাদ্যের চাহিদা মেটাতে কৃষকরা প্রায়শই পোকা মারার জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী রাসায়নিক ব্যবহার করেন। যদি এই সবজি বা ফলগুলো খাওয়ার আগে সঠিকভাবে ধোয়া না হয়, তবে কীটনাশকগুলো খাবারের গায়ে থেকে যায়। এই রাসায়নিকগুলো শরীরে ‘হরমোন ডিসরাপ্টর’ বা হরমোন বিঘ্নকারী হিসেবে কাজ করে, যা শরীরের প্রাকৃতিক সংকেতগুলোকে বিভ্রান্ত করে দেয়।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি কিছু গবেষণায় উঠে এসেছে যে, এই কীটনাশকগুলো শরীরের চিনি বিপাক প্রক্রিয়া বা সুগার প্রসেসিং সিস্টেমে ব্যাঘাত ঘটিয়ে মানুষকে স্থূলতা এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে (গ্লোভার ২০২২)। ব্যস্ত শহুরে জীবনের দ্রুত গতির কারণে অনেক মানুষ সস্তায় ফুটপাতের খাবার বা অনিয়ন্ত্রিত বাজারের পণ্যের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়, যা মূলত নিম্ন আয়ের মানুষকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তারা কেবল পুষ্টিকর খাবারের অভাবেরই সম্মুখীন হচ্ছে না, বরং এমন ‘বিষাক্ত’ খাবার গ্রহণ করছে যা তাদের জীবনভর চিকিৎসা ব্যয়ের জালে আটকে দিচ্ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এখন খাদ্যের ক্যালরি গণনার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন খাবারের উৎস এবং এর বিশুদ্ধতার ওপর। শহরগুলোয় নিরাপদ পানি পরীক্ষা এবং খাদ্য উৎপাদন ও বিক্রির ক্ষেত্রে কঠোর নিয়মকানুন প্রয়োগ করা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক মোড় নিয়েছে। দেশের শহরগুলোর দ্রুত বৃদ্ধি মানুষের খাওয়ার ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে; মানুষ এখন ঘরে তৈরি খাবারের চেয়ে প্রক্রিয়াজাত এবং রাস্তায় কেনা খাবারের দিকে বেশি ঝুঁকছে। এই পরিবর্তন শহুরে জীবনকে সহজ করলেও ডাইনিং টেবিলে এক ‘নীরব ঘাতক’ নিয়ে এসেছে। আধুনিক শহুরে খাবার এখন ক্ষতিকারক রাসায়নিক, ভারী ধাতু এবং শিল্প কারখানার রং দ্বারা দূষিত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে শরীরে ভয়াবহ প্রদাহ সৃষ্টি করে।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোয় হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং কিডনি বিকল হওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ার পেছনে এই দূষিত খাদ্য ব্যবস্থাকেই দায়ী করা হচ্ছে। একটি প্রতিবেদনের অনুযায়ী, বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটি (BFSA) কর্তৃক পরীক্ষিত ১,৭১৩টি খাদ্য নমুনার মধ্যে ৫৭১টি (৩৩.৩ শতাংশ) ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভেজাল, দূষণ বা নিম্নমানের পুষ্টিগুণের কারণে অনিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই নমুনাগুলোয় এমন সব রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে যা মানুষের শরীরে প্রবেশের কোনো সুযোগই থাকা উচিত নয় (দ্য ডেইলি স্টার, ২০২৬)।
দূষিত খাদ্য এবং দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার এই যোগসূত্রটি মূলত হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং শরীরের ভেতরের দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহের মাধ্যমে ঘটে। অনেক শহুরে বাসিন্দা নিম্নমানের প্লাস্টিকে মোড়ানো খাবার গ্রহণ করেন বা প্লাস্টিক কন্টেইনারে গরম খাবার খান, যা উচ্চ তাপমাত্রায় ‘বিপিএ’ (BPA)-এর মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক নির্গত করে (ডি পাউলা এবং আলভেস, ২০২৪)।
একই সাথে শিল্পাঞ্চলের কাছাকাছি উৎপাদিত সবজিগুলো দূষিত মাটি ও পানি থেকে সিসা এবং ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু শোষণ করে নেয়। যখন এই টক্সিনগুলো বছরের পর বছর শরীরে জমতে থাকে, তখন তারা ধমনী এবং কিডনির কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত করে, ফলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব হয়ে পড়ে। যেহেতু এই রোগগুলো খুব ধীরে ধীরে শরীরে দানা বাঁধে, তাই অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকাই এই ধ্বংসের মূল কারণ। এই বিশাল স্বাস্থ্য বিপর্যয় রুখতে হলে কেবল ব্যক্তিগত সচেতনতা যথেষ্ট নয়; খাদ্য উৎপাদন, প্যাকেজিং এবং বিপণনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
খামার থেকে শুরু করে খাওয়ার প্লেট পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খাবারের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা না গেলে, আধুনিক শহুরে জীবন শেষ পর্যন্ত আজীবন অসুস্থতা এবং অকাল মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াবে। সুস্থ থাকার সংজ্ঞা এখন আর শুধু ব্যায়াম বা ডায়েটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং আমরা যা খাচ্ছি তা রাসায়নিকমুক্ত কি না তা নিশ্চিত করাই এখন সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ।
তথ্যঋণ:
১। World Health Organization. (2025). Noncommunicable diseases. https://www.who.int/news-room/fact-sheets/detail/noncommunicable-diseases
২। Shetty, B. R., Jagadeesha, P. B., & Salmataj, S. A. (2025). Heavy metal contamination and its impact on the food chain: exposure, bioaccumulation, and risk assessment. CyTA - Journal of Food, 23(1). https://doi.org/10.1080/19476337.2024.2438726
৩। Glover, F., Steenland, K., Eisenberg, M. L., Belladelli, F., Mulloy, E., Del Giudice, F., & Caudle, W. M. (2022). The association between organophosphate insecticides, blood pressure dysregulation, and metabolic syndrome among US Adults: NHANES 2015-2016. Hygiene and Environmental Health Advances, 4, 100035.
৪। Staff Correspondent. (2026, February 3). 33% food samples tested unsafe in FY 2024–25. The Daily Star. https://www.thedailystar.net/news/bangladesh/news/33-food-samples-tested-unsafe-fy-2024-25-4097006
৫। de Paula, L. C. P., & Alves, C. (2024). Food packaging and endocrine disruptors. Jornal de pediatria, 100 Suppl 1(Suppl 1), S40–S47. https://doi.org/10.1016/j.jped.2023.09.010
মিনহাজুল ইসলাম : হেলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসার, এমিনেন্স এসোসিয়েটস ফর সোশাল ডেভেলপমেন্ট, এসোসিয়েট, বাংলাদেশ আরবান হেলথ নেটওয়ার্ক