উৎসবের সামাজিক সম্পর্ক

বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়ের দুটি বড় উৎসব—একটি ঈদুল ফিতর, অন্যটি ঈদুল আযহা। গোটা বিশ্বের মুসলমান সম্প্রদায় উৎসব দুটি একযোগে পালন করে থাকে। বিশ্বের মুসলমান সম্প্রদায়ের মতো, বাঙালি মুসলমানেরও ধর্মীয়-সাম্য ও সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতির সাংস্কৃতিক বড় জাগরণ—ঈদ উৎসব।
বিজ্ঞাপন
সব ধরনের ক্লেদ-কলুষতা-ভেদাভেদ ভুলে সমাজের আপামর ধনী-গরিব ঈদ উৎসবে খোলা আকাশের নিচে এক কাতারে সামিল হন। ঈদের নামাজ আদায় করে সবাই আনন্দ উদযাপনে মেতে ওঠে।
যে যার সাধ্যমতো এই দিনটি আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপন করে থাকেন। সব ধরনের হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি ভুলে মানুষে-মানুষে আনন্দের বন্যা বয়ে যায় ঈদ উৎসবে। তবে ঈদের আনন্দ যেমন অসীম, ঠিক তেমনি তার অন্তর্গত তাৎপর্য ও ভাবাদর্শ অনেক গভীর।
ধর্মীয় পরিভাষায়—ঈদ আরবি শব্দ। যার অর্থ ‘আনন্দ’ বা ‘খুশি’ কিংবা ‘যা বারবার ফিরে আসে’। অন্যদিকে ঈদকে ‘ইয়াউমুল জায়েজ’ অর্থাৎ ‘পুরস্কারের দিবস’ হিসেবেও পরিগণিত করা হয়। কেন? কারণ আত্মিক আর বাহ্যিক সংযম সাধনের ভেতর দিয়ে ব্যক্তি পরিশুদ্ধ হয়ে ওঠে। যিনি পরিশুদ্ধ হয়ে ওঠেন, তিনি সেই পুরস্কার লাভ করেন।
বিজ্ঞাপন
ঈদ হলো, সেই সুশৃঙ্খল জীবনাচরণের আত্মিক, নৈতিক, সামাজিক পরিশুদ্ধির সামষ্টিক কল্যাণের পথ, যা মানুষকে শত্রুতা আর বৈরিতার পথ থেকে সম্প্রীতি আর সৌহার্দ্যের সেতু বন্ধনে আবদ্ধ হতে আহ্বান করে। ঐক্যের পথ সৃষ্টি করে। যাতে মানুষ সেই পরিশুদ্ধতার পথে সামিল হয়।
সাংস্কৃতিভাবে যা পারিবারিক ও সামাজিক জীবনেও পারস্পরিক সম্প্রীতি-সৌহার্দ্যের নির্মল প্রতীক। ভাবগত দিক থেকে, এটি ‘সীমাবদ্ধ ব্যক্তি-মানুষ’কে ‘সামাজিক মানুষে রূপায়ন’ করে। যা একে অপরের প্রতি দায়বদ্ধ করে তোলে।
ঈদ উৎসবের প্রধান উপাদান ‘সামষ্টিক সামাজিকতা’। ব্যক্তি একা একা সমাজ হয় না। সমাজ হতে হলে পরিবার থেকে পাড়া-প্রতিবেশী লাগে। ফলে উৎসব ব্যক্তির সীমাবদ্ধতাকে সামষ্টিক হতে শেখায়। ব্যক্তির আচরণগত পরিশুদ্ধির এই শিক্ষা তাকে বস্তুগত বাতাবরণের বাইরে অপরের প্রতি সহনশীল ও মানবিক করে তোলে।
বিজ্ঞাপন
যে যার সাধ্যমতো এই দিনটি আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপন করে থাকেন। সব ধরনের হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি ভুলে মানুষে-মানুষে আনন্দের বন্যা বয়ে যায় ঈদ উৎসবে।
অন্যদিকে উৎসবের দিনক্ষণের ভিন্ন মাহাত্ম্য আছে। যেমন—আরবি ‘ঈদুল ফিতর’ ভাবের অর্থ ‘আনন্দের সহিত উপবাস ভাঙা’। অভুক্তের মুখে ভুক্ত দান। যা মূলত আনন্দ ভাগের সঙ্গে বস্তুগত সম্পর্কের সামাজিক ভিত্তি সৃষ্টি করে।
নবীজি মুহাম্মদের শাসন কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—‘শ্রেণিভেদ থেকে মানুষকে মুক্তি দান।’ দরিদ্র আর সুবিধা বঞ্চিতসহ সবার কাছে ঈদের উৎসবকে সর্বজনীন করে তোলা। আর্থিক দিক থেকে ফিতরা, যাকাত, দান-খয়রাতের মাধ্যমে উৎসবকে সাধারণের সামর্থ্যে নিয়ে আসা। এটি সামাজিক সম্পর্কে সমতা ও ভারসাম্যের নির্মাণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
উৎসবের চেতনাগত দিক—মানুষকে জীবনমুখী করে তোলা। মানে ইহকালীক ব্যক্তি মানুষের অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দান। উৎসবের সম্মিলনের ভেতর দিয়ে মানুষ অপরের জীবনকে জানে এবং বোঝে। অপরের প্রতি মানবিক ও সহমর্মী হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন
বস্তুত মানব জীবনে সবচেয়ে বড় সাফল্য ধন-সম্পদ নয়, বরং শান্তি খুঁজে পাওয়া। উৎসব জীবনের সেই অর্গল খুলে দেয়। কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ খুব সুন্দর উপমা দিয়ে কথাগুলো বলেছেন।
যেমন—‘আজ ভুলে যা তোর দোস্ত দুশমন, হাত মেলাও হাতে’, ‘যারা জীবন ভরে রাখছে রোজা, নিত্য উপবাসী / সেই গরীব ইয়াতীম মিসকিনে দে যা কিছু মুফিদ’ ইত্যাদি।
জীবন মানে দায়। নিজের প্রতি যেমন, ঠিক তেমনি অপরের প্রতিও। তাই হাতে হাত মেলালে জীবন আরও প্রাণবন্ত আর সজীব হয়ে ওঠে। উৎসব সেই সজীবতাকে আমলে নেয়। উৎসব তখনই আনন্দময় হয়ে ওঠে, জীবন যেখানে সজীবতার স্পর্শ পায়। অপরের প্রতি দায়বোধে মানবিক হয়।
যেকোনো উৎসব হলো বিদ্যমান কাঠামোর আপামর মানুষের সম্পর্ক উৎপাদনের ভিত্তি। ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে রাষ্ট্র, রাষ্ট্র থেকে দেশ—সবকিছুর ভেতর নতুন সম্পর্কের রূপান্তর ঘটে। এটা নিছক মানুষের সঙ্গে মানুষের বস্তুগত সম্পর্কের রূপান্তর নয়, আবেগ-অনুভূতি থেকে সম্প্রতি ও ঐক্যের বড় সামাজিক সংহতি সৃষ্টি করে।
উৎসব তখনই আনন্দময় হয়ে ওঠে, জীবন যেখানে সজীবতার স্পর্শ পায়। অপরের প্রতি দায়বোধে মানবিক হয়।
এখানে সবচেয়ে বড় রূপান্তর ঘটে—উৎসবের মাধ্যমে মিলেমিশে আনন্দ উৎযাপনের ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক বার্তা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। যা পুরাতনের সঙ্গে নতুনের সম্পর্ক বিন্যাসের মেলবন্ধন রচনা।
বিদ্যমান সমাজে উৎসব হলো সামাজিক স্থিতিশীলতার মাপকাঠি, আর উৎসব পালন হলো স্থিতিকে সাংস্কৃতিক সম্পর্কের গতি বা অগ্রগতির পথে নিয়ে যাওয়া। এমন নয় যে সমাজ বা রাষ্ট্র স্থবির! কিন্তু বিদ্যমান কাঠামোর ভেতর উৎসব মানুষকে মানুষের কাছাকাছি আসার সুযোগ করে দেয়। সামাজিক দূরত্ব ঘোচায়।
যা বিদ্যমান সমাজে সম্প্রীতির সম্পর্ককে ভবিষ্যৎমুখী করে। ঈদ আমাদের সেই সম্প্রতির সেতু রচনা করে দেয়। আমরা যেন সব ভেদাভেদ ভুলে মানুষে-মানুষে ভালোবাসা ও সম্প্রতির পথকে আরও প্রশস্ত করি। যেন শান্তির সংহতি বজায় রাখি—সেটাই প্রত্যাশা।
সাখাওয়াত টিপু : কবি ও প্রাবন্ধিক; পরিচালক, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র