উৎসবের স্মৃতি, স্মৃতির উৎসব

উৎসব শব্দটির মধ্যেই জীবনের অদ্ভুত অনুরণন রয়েছে বা বলা যায়, এই শব্দটির মধ্যে রয়েছে স্মৃতিমেধ, স্মৃতিমেদুরতা বা স্মৃতিসৌধ। উৎসব হলো সত্তার এক অনুকূলবেদনীয় অবস্থা।
বিজ্ঞাপন
উৎসবের অর্থ যা সুখ প্রসব করে, অর্থাৎ উৎসবে সুখের জন্ম হয়, শুধু জন্মেই তা সীমাবদ্ধ থাকে না, সুখ জীবনকে লীলায়িত করে রাখে এবং সুখ হলো যা অস্তিত্বসহায়ক। তাই বলা যায়, উৎসব হলো এক উৎসর্গ, এক নিবেদন, যা অন্যের প্রতি যায় এবং নিজের দিকে আসে।
এই নিবেদন সর্বজনীন। উৎসব তাই একাধারে ধর্ম ও সংস্কৃতির শরীর এবং আত্মা। আবার সংস্কৃতি হলো জীবনের বাতাবরণ, তার সামগ্রিক রূপ, বা জীবনের পূর্ণতা। তাই উৎসবমাত্রই বিনোদন বা নিছক আনন্দ-উদযাপন নয়, উৎসব মহামিলনের একটি জাগতিক রূপ যা শুধু ইহজাগতিক মাহাত্ম্যেই আবদ্ধ থাকে না, পরজাগতিক মাহাত্ম্যকেও তা প্রতিষ্ঠিত করে।
বিখ্যাত কবি অক্তাবিও পাজ-এর কথায়, a festival is an exploration; a release from the ordinary order of time, উৎসব হলো এক বিস্ফোরণ, সময়ের আটপৌরে নিয়ম থেকে মুক্তি।
বিজ্ঞাপন
আমাদের দেশ উৎসবমুখরিত একটি দেশ, আমাদের সংস্কৃতি উৎসবময় এক সংস্কৃতি, আর আমরা এক-একজন উৎসবপ্রাণ মানুষ। আমাদের নিছক জাগতিক উৎস থেকে উদযাপিত উৎসবগুলোয়ও অতিজাগতিক ছোঁয়া থাকে আবার ধর্মকে কেন্দ্র করে উদযাপিত উৎসবগুলোয়ও জাগতিকতার আবহ ও আনন্দ থাকে।
ধর্মভিত্তিক উৎসবগুলো মানবকেন্দ্রিক ও মানববান্ধব হয়ে ওঠে তাই এসব উৎসবে নিছক আনন্দ প্রাপ্তির বাইরেও একটি মহাজীবনের আবাহনের সুর বেজে থাকে। এর অনুপম বৈশিষ্ট্য হলো অন্তর্ভুক্তিময় অবস্থান যা নানা ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়ের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণে একটি ‘সিনফোনিয়া’র রূপ ধারণ করে। এই রূপটিতে বাহ্যিকতার কোনো স্থান নেই, বরং একটি অন্তর্ঘন নৈকট্যের সুর সবাইকে আবাহন ও আহ্বান করে চলে।
আমাদের দেশ উৎসবমুখরিত একটি দেশ, আমাদের সংস্কৃতি উৎসবময় এক সংস্কৃতি, আর আমরা এক-একজন উৎসবপ্রাণ মানুষ। আমাদের নিছক জাগতিক উৎস থেকে উদযাপিত উৎসবগুলোয়ও অতিজাগতিক ছোঁয়া থাকে আবার ধর্মকে কেন্দ্র করে উদযাপিত উৎসবগুলোয়ও জাগতিকতার আবহ ও আনন্দ থাকে।
বিজ্ঞাপন
ছোটবেলা থেকেই আমরা দুটি প্রধান ধর্মীয় উৎসবের ভেতর দিয়ে বড় হয়েছি—একটি ঈদ ও অপরটি শারদীয় দুর্গাপূজা। এছাড়াও অসংখ্য উৎসবে মুখর ছিল আমাদের জীবন। তবে এ দুটি উৎসব আমাদের সর্বজনীন উৎসব। এ দুটি উৎসবই আমাদের সমষ্টিগত চেতনাকে শক্তিশালী করে অবশেষে যৌথ নিশ্চেতনেরও অংশ হয়ে গেছে।
এ দুটি উৎসবই আমাদের ভেতর অনৈচ্ছিক স্মৃতির জন্ম দিয়ে রেখেছে যাকে রোমন্থন করে চলি আমরা সারাটি জীবন। বলা দরকার, এ দুটি উৎসবই সামাজিক ঐক্য এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়কে বিনির্মাণ করে দিয়েছে বাঙালির। আমরা ধর্মীয় পরিচয়ে ভিন্ন হতে পারি কিন্তু ধর্মীয় উৎসবই আবার আমাদের মধ্যে অন্য একত্বের সূচনা করেছে।একে কেন্দ্র করে সামাজিক, ও সাংস্কৃতিক যে ক্রিয়মাণতা দেখা দেয় তাতে ধর্মনির্বিশেষে আমরা সবাই অংশগ্রহণ করে থাকি।
আরও পড়ুন
আমাদের ঈদ বা পূজা শুধু ধর্মাচার নয়, এটি একটি নৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি। বাংলাদেশে আপামর বাঙালি প্রতিটি উৎসবেই এক গভীর সামষ্টিক আবেগকে অনুভব করে। উৎসব দূরত্বকে ঘোচায়। একটি সাংস্কৃতিক ভাষার জন্ম দেয় আমাদের মধ্যে। আমাদের সব ধরনের উৎসবই তাই কল্যাণবান্ধব। কিন্তু এই যে পারস্পরিকতা, এটা শুধু এমনি এমনি হয়নি, এর ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতও আছে।
এ উপমহাদেশে রাজাবাদশাগণ এক মিথোজীবী উদযাপনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। মোঘল আমলে আমরা দেখি ধর্মভিত্তিক উৎসবে সব ধর্মাবলম্বীর অংশগ্রহণ, এমনকি সম্রাটও অংশগ্রহণ করতেন এসব অনুষ্ঠানে। আকবরনামা বা তুজক-ই-জাহাঙ্গিরি পড়লেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু বাংলায় প্রচলিত ছিল উৎসবের এক লোকায়ত ধারা যা ধর্মভিত্তিক উৎসবকেও সর্বজনীন করে তুলত।
এখানকার গান-বাজনা-হাওয়া-বাতাস যেন এক ইহজাগতিক মিলনের আবহকে ধারণ করে রাখত। ধর্মীয় কাহিনির উপস্থাপন হতো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে, আবার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আবাহনও হতো ধর্মীয় বন্দনার মাধ্যমে। হিন্দু ও মুসলমানের ধর্মীয় উৎসব তাই আবদ্ধ থাকেনি শুধু ধর্মাচারে, তা বাঙালিকে একটি বৃহত্ত্বের দিকে নিয়ে গেছে।
একটি বিষয় উল্লেখ করা যায়, আমাদের দেশে একটি স্লোগান উচ্চারিত হতে দেখা গেছে—‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার।’ এটি একটি চমৎকার সামাজিক মিলনের ব্যাখ্যা সত্ত্বেও অনেকেই এটাকে ব্যঙ্গ করতে লাগল আর সংশোধন করে বলতে লাগল, ‘ধর্ম যার উৎসবও তার’।
‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’, এ কথাটির মধ্যে ধর্মের সাংস্কৃতিক দিগন্তের কথাটাই বলা হয়েছে যেখানে সর্বমানবের বিচরণ এবং একাত্ম হওয়া সম্ভব। উৎসব নিছক আনন্দ-বিনোদন নয়, আচার তো নয়ই, এটি মানব জীবনের উচ্চতর চেতনার দিকে যাওয়ার একটি সাধনা।
সব ধর্মেরই দুটি দিক রয়েছে, একটি তার আচারিক দিক, আর অন্যটি তার সাংস্কৃতিক দিক। আচারিক দিকটা স্বতন্ত্র ও ধর্মরীতি নির্ভর, ধর্মানুসারীদের ছাড়া অন্যদের সেখানে থাকার সুযোগ নেই।
এর দার্শনিক ভিত্তি হলো—মানুষকে দিনানুদৈনিক ক্লান্তি থেকে মুক্ত করে আত্মার দিকে ফেরানো—ঋত (মহাজাগতিক) ও প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যবিধান করে ব্যক্তিকে সমাজের সঙ্গে যুক্ত করা, এবং বিকশিত করা। সব ধর্মেরই দুটি দিক রয়েছে, একটি তার আচারিক দিক, আর অন্যটি তার সাংস্কৃতিক দিক।
আচারিক দিকটা স্বতন্ত্র ও ধর্মরীতি নির্ভর, ধর্মানুসারীদের ছাড়া অন্যদের সেখানে থাকার সুযোগ নেই। কিন্তু সাংস্কৃতিক দিকটা উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক, যেখানে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের আমন্ত্রণ ও অধিকার থাকে। এটা আন্তর্ধর্মীয় মিলনেরও জায়গা। সুতরাং আমরা যদি কোনো একটি ধর্মের ধর্মীয় উৎসব থেকে অন্য ধর্মাবলম্বীদের আলাদা করে রাখি তাহলে একটি বিচ্ছিন্নতাকে সামাজিকভাবে স্বীকার করে নিলাম যা ধর্মের জায়গা এবং সামাজিক জায়গা থেকে অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। তাই ধর্মীয় কারণে উৎসব থেকে বারিত করার সুযোগ নেই। পাবলো নেরুদা যেমন বলেছেন, তুমি সব ফুল কেটে ফেলতে পারো কিন্তু বসন্তের আগমনকে ঠেকিয়ে রাখতে পারো না।
আমার জীবন এক উৎসব, আমি তাই মনে করি। আমার জীবনে উৎসব হলো বাসন্তিক ফুলে ফুলে সজ্জিত যেন একটি স্মৃতির মান্দার। যা কিছু স্মৃতি হয়ে যায় তা আসলে জীবনই হয়ে যায়, অন্য রূপে। তাই এখন যখন উৎসবে যাওয়া হয় কম তখনো আমি উৎসবেই থাকি, ভাবি, যে উদযাপিত উৎসব আমার জীবনে স্মৃতিমেধ সৃষ্টি করে গেছে তার আলো তো এখন স্মৃতির জীবন গড়ে আমার ভেতর রং ছড়াচ্ছে, বিভা ছড়াচ্ছে!
কুমার চক্রবর্তী : কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক