শিক্ষার্থী ভর্তির উত্তম ব্যবস্থা লটারি নাকি পরীক্ষা?

পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য প্রতিটি প্রাণীকে অবিরাম লড়াই ও নানা পরীক্ষার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। এ পরীক্ষায় যোগ্যরা টিকে আর আধিপত্য বিস্তার করে। হেরে যাওয়া কিংবা পিছিয়ে পড়ারা কোণঠাসা হয় এবং এক সময় বিচ্ছিন্ন পর্যন্ত হয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
এটাই জগতের নিষ্ঠুর নিয়ম। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে প্রাণীজগতের শিশুরা একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এ প্রতিযোগিতা থেকে রেহাই পায়। ডিম ফুটে বের হওয়ার সাথে সাথে একটি পাখি ছানাকে অন্য পাখিদের সাথে লড়াই করে পোকা সংগ্রহ করতে হয় না।
মা পাখি মুখে করে এনে খাবার দেয়। শক্র পাখি বা পরিবেশের বিরূপতা থেকে তাকে ডানা দিয়ে আগলে রাখে। হিংস্র প্রাণী বাঘ সিংহের ছানাদের ক্ষেত্রেও এটি ঘটে।
শুরুতেই বাঘ বা সিংহের শাবককে লড়াই করে অন্য প্রাণী হত্যা করে খাবার সংগ্রহ করতে হয় না। মা-বাঘ বা সিংহ দুধ দিয়ে তাকে পরিপুষ্ট করে তোলে তারপর ক্রীড়াচ্ছলে তাকে শিকার করতে, লড়াই করতে শেখায়।
বিজ্ঞাপন
তারপর উপযুক্ত হলেই কেবল লড়াইয়ের মাঠে ছাড়ে। হাঁসের একটি প্রজাতি আছে যারা তাদের বাচ্চাদের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত প্রশিক্ষণ প্রদান করে তারপর যোগ্য বাচ্চাদের প্রকৃতিতে লড়াই করার জন্য ছেড়ে দেয় আর অযোগ্যগুলো ঠুকরে হত্যা করে।
মুরগির ক্ষেত্রেও আমরা প্রায় অনুরূপ আচরণ করতে দেখি। খুঁটে খাওয়ার প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পরও কোনো মুরগির বাচ্চা মায়ের কাছে ফিরে এলে তাকে ঠুকরে তাড়িয়ে দেয়।
মানুষের ক্ষেত্রটি আরেকটু মানবিক। সে কমপক্ষে আঠারো বছর বয়স পর্যন্ত তার বাচ্চাটিকে শিশু হিসেবে গণ্য করে। এ সময় সে তাকে পুরোটাই দেখে শুনে আগলে রাখে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করে।
বিজ্ঞাপন
পারতপক্ষে সমাজের টিকে থাকার লড়াইয়ে সরাসরি প্রেরণ করে না। প্রতিযোগিতার পরিবেশকে অহিংস রাখার চেষ্টা করে। এরমধ্যে প্রাক শৈশবকালকে একদমই প্রতিযোগিতা ও লড়াই থেকে দূরে রাখে। অধিকার বঞ্চিত শিশুদের কথা আলাদা।
বিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রবেশের একদম শুরুর ধাপের কোমলমতি শিশুদের প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষার লিপ্ত করা তাদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করতে পারে।
সাধারণত এক থেকে আট বছর সময় পর্যন্ত শিশুরা প্রাক শৈশবকাল অতিক্রম করে। এর একটা বড় সময় শিশু মাতৃদুগ্ধ পান করে। বাকি সময়টুকুও সে মূলত পারিবারিক বা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতর থাকে বা নিরাপত্তার ভেতর রাখা হয়। সভ্য দুনিয়ার এটাই নিয়ম। এ সময়ে যেকোনো ধরনের পরীক্ষা বা প্রতিযোগিতা লড়াই শিশুর মনে নানা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে। এটা তার পুরোটাই আনন্দের ভেতর দিয়ে শেখার সময়।
শিক্ষায়তনে পরীক্ষার প্রধান দুটো উদ্দেশ্য থাকে। প্রথমত শিশুর শিখন অভিজ্ঞতা যাচাই আর দ্বিতীয়ত সে অনুসারে তাকে নিরাময় প্রদান। বলা যায় দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি পূরণ করাই পরীক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় যেখানে তাকে বাদ পড়তে হতে পারে তাতে দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি পূরণের কোনো সুযোগ থাকে না।
আরও পড়ুন
আর পরীক্ষা গ্রহণের প্রথম উদ্দেশ্য পূরণের পূর্বশর্ত হচ্ছে আগে শিখন অভিজ্ঞতা প্রদান করা। শিখন অভিজ্ঞতা প্রদান না করে শিখন অভিজ্ঞতা যাচাই করা অযৌক্তিক।
এখন পরীক্ষাটি যদি এমন হয় যে তাকে বিদ্যায়তনিক নয় পারিবারিক শিখন অভিজ্ঞতার পরীক্ষা গ্রহণ করা হবে তাহলে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রধান শর্ত দাঁড়াবে তাদের একই সুবিধা বা শিখন পরিবেশ থেকে আসতে হবে। রাষ্ট্র যদি এ রকম কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে তাহলে এ সম শিখন সুবিধার প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে দেখা দেবে।
সভ্য দুনিয়ার অধিকাংশ দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষায় শিশুদের ভর্তি বা প্রান্তিক পরীক্ষা সাধারণত নেওয়া হয় না। আমাদের দেশেও প্রাথমিকের ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করে লটারির মাধ্যমে ভর্তি পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল।
একই সাথে কয়েক বছর ধরে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শ্রেণিভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। এতে প্রথাগত পরীক্ষা পদ্ধতিতে অভ্যস্ত অভিভাবক সমাজে এক ধরনের অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। পাশাপাশি তৈরি হয়েছিল গাইড ও ভর্তি কোচিং ব্যবসায়ীদের চাপ।
সম্প্রতি সরকার প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতির বদলে ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এতে শিক্ষাবিদ মহলে পুনরায় নানা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রথম বক্তব্য হচ্ছে, বিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রবেশের একদম শুরুর ধাপের কোমলমতি শিশুদের প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষার লিপ্ত করা তাদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করতে পারে। প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়া শিশুর মধ্যে মানসিক চাপ ও হীনমন্যতা তৈরির প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া এতে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বঞ্চিত থাকার আশংকাই বেশি।
ভর্তি পরীক্ষার ফলে শিক্ষাব্যয় বৃদ্ধি পাবে। গাইড ও কোচিং ব্যবসা বাড়বে। অভিভাবকদের গাইড ও কোচিং ব্যবসার পেছনে অর্থ ব্যয় করতে হবে। তাতে শিশুদের গাইড নির্ভরতা বাড়বে। প্রকৃত মেধার বিকাশ হবে না।
শিক্ষিত পরিবারের শিশুরা আগে থেকেই পারিবারিক পরিবেশের কারণে এগিয়ে থাকে। এ ব্যবস্থায় তারাই আবার এগিয়ে থাকবে। বঞ্চিত পরিবারের বঞ্চনা আরও বাড়বে। এতে সমাজে বৈষম্য ও বিভাজন আরও তীব্র হবে।
আর সবচেয়ে বড় কথা রাষ্ট্র যেহেতু পরীক্ষা গ্রহণের আগে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে পারেনি সে ক্ষেত্রে অসমান সুবিধাপ্রাপ্ত শিশুদের একই ধরনের পরীক্ষার মুখোমুখি করতে পারে না।
ভর্তি পরীক্ষার ফলে শিক্ষাব্যয় বৃদ্ধি পাবে। গাইড ও কোচিং ব্যবসা বাড়বে। অভিভাবকদের গাইড ও কোচিং ব্যবসার পেছনে অর্থ ব্যয় করতে হবে। তাতে শিশুদের গাইড নির্ভরতা বাড়বে। প্রকৃত মেধার বিকাশ হবে না।
প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর থেকে অধিকাংশ শিক্ষাবিদ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন জানিয়েছে। দেশ ও শিক্ষার স্বার্থে এ আবেদন বিবেচনায় নেওয়াই সরকারের সমীচীন হবে।
ড. শোয়াইব জিবরান : কবি ও শিক্ষাবিদ; সাবেক পরামর্শক, শিক্ষা বিভাগ, জাতিসংঘ শিশু তহবিল